আমার বাসার আশপাশে প্রায়ই দেখি খাবার সরবরাহকারী অনলাইন প্রতিষ্ঠানের লোক খাবার ডেলিভারি দিয়ে যাচ্ছে। যারা ডেলিভারি করে তাদের অধিকাংশই কিশোর, বাইকেলে চড়ে ডেলিভারি দেয়। তাদের হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক থাকে না। কোনোরকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা নেই। এইরকম চিত্র প্রায় প্রতিদিনই দেখছি। যারা খাবার পৌঁছে দিচ্ছে কিংবা অনলাইন হোম সার্ভিস দিচ্ছে, তাদের কর্মীদের খুব একটা সচেতনতা আছে বলে মনে হয় না।
করোনাভাইরাসের পরিণতি কী ভয়াবহ আমরা নিজেরাই এখন বুঝতে পারছি। আস্তে আস্তে কেড়ে নিচ্ছে নিজেদের প্রাণ-সর্বস্ব। খুবই মর্মন্তুদ একটি সময় পার করছি আমরা। সময়টা খুব অসহায়ত্বের। আমাদের অভাগা জীবন এখন। কেউ কাউকে সান্ত¡না দেওয়ার জায়গাটুকুও পাচ্ছি না। যারা প্রিয় মানুষগুলো হারাচ্ছে, তাদের কষ্ট প্রতিদিন বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে। এতটা শোক, এতটা বেদনা আজ আমাদের। যারা স্বজন হারায়, যারা সন্তান হারায়, যারা পিতা হারায়, যারা স্বামী হারায়, যারা ভাই হারায়, তারা বুঝে কষ্টগুলো কেমন! ঘটনার ওপরে ঘটনার প্রলেপ পড়তে পড়তে কত ঘটনাই তো ক্রমশ ফিকে হয়ে যায়। এসবও কি কেউ মনে রাখবেন আজীবন?
দুই.
করোনাভাইরাস রোগ প্রতিরোধে অন্যতম প্রধান পন্থা হচ্ছে, সচেতন থাকা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। এসব মেনে চলার ব্যাপার-স্যাপারগুলো নিজের কাছে। এটা কারোর ওপর কেউ নির্ভর হওয়ার বিষয় নয়। টেলিভিশনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিনই কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, তা দেখানো হচ্ছে, বলা হচ্ছে। এগুলো আমাদের মানতে হবে। নাহলে রেহাই নেই। কারও কারও ক্ষেত্রে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেনে চলা কঠিন, কারও কারও ঠান্ডা পানি ছাড়া কঠিন। তবুও ছাড়তে হবে। আপনার জীবনপ্রণালী পরিবর্তন করতে হবে। করোনা অন্তত এ মেসেজটা আমাদের দিয়ে যাচ্ছে। এত বছর ধরে ডা. দেবী শেঠির মতোন হাইপ্রোফাইল চিকিৎসকরা যে মেসেজগুলো দিয়েও আমাদের মতো আলাভোলা বাঙালিদের পরিবর্তন করাতে পারেননি।
জীবনবিতৃষ্ণা অথবা চিরাচরিত দুঃখবিলাসী থেকে অনেকে বলে থাকেন, মরে গেলে মরে গেলাম, কী আর হবে! মরণ আসলে কেউ কি ঠেকাতে পারবে। এ জাতীয় কথাবার্তাগুলো আমার কাছে মনে হয় খুবই সস্তা টাইপের। এ সমস্ত কথা বলে আপনার মূল্যবান সময়গুলো অকালে ঠেলে দিচ্ছেন। মরে যাওয়া তো বিষয় না, এই যুগে মৃত্যুর চাইতে সহজ কাজ নেই। কিন্তু ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু আমাদের কারোর কাম্য নয়। এ মৃত্যুর যন্ত্রণা হয়তো অনুভব করতে পারছি না, যারা আক্রান্ত অবস্থা থেকে সুস্থ হয়েছেন, তাদের কথা জানুন। কীভাবে তারা করোনাবিজয়ী হয়ে উঠছেন। বড় বড় টাকাওয়ালারা এখন হাপিত্যেশ করছেন, একটা আইসিইউ বেডের জন্য। কিন্তু তারা আইসিইউ বেড পাচ্ছেন না। একটা ভেন্টিলেশন তারা পাচ্ছেন না। যখন এত এত টাকা দিয়েও জীবন বাঁচাতে পারছেন না, তখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কী অবস্থা হবে, একবার ভেবে দেখুন।
এটা এমন একটা রোগ, সংক্রমণের প্রকোপ এতটা বেশি যে, আপনি আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার আশপাশে অন্যদেরও হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মনে রাখা দরকার ট্রান্সমিশন হচ্ছে এখন খুব বেশি। খুব দ্রুতই হচ্ছে। কভিড-১৯ এখন আমাদের চেনা-জানা, আশপাশ মানুষগুলোর মধ্যে চলে আসছে। কেউ ফিরছেন, কেউ ফিরছেন না। যারা ফিরছেন না, তাদের ক্ষেত্রে দাফন করতেও কোথাও কোথাও বাধাও দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটছে এখন। নিজেদের ভেতরেই।
তিন.
দেশে প্রতিদিনই করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এরমধ্যে গণহারে সরকার সব কিছু খুলে দিয়েছে। গার্মেন্টস, দোকানপাট তো আগে থেকেই খুলে দিয়েছে। সব কিছু খুলে দেওয়া মানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া নয়। মহামারী নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটা অনেক শিক্ষিত মানুষও বুঝতে চান না। ওই প্রসঙ্গে আর গেলাম না। এখন অব্যবস্থাপনাও অনিয়ন্ত্রিত। জীবন বাঁচাতে নয়, জীবিকা রক্ষা এবং অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর জন্য সরকারকে বেশি চিন্তিত মনে হচ্ছে। সাধারণ জনগণের জীবনের মূল্য কোনো সময় ছিল না। আজও নেই। সীমিত আকারে সবকিছু মেইনটেইন করার কথা বলা হচ্ছে। সীমিত আকারে গণপরিবহন চালুর কথা বলছে। অথচ সীমিত আকারের মডেলটা কী আমরা জানি না। আমরা বুঝছি এখন কী হতে চলেছে। তবু সরকার সিদ্ধান্ত নিল। শাসক কি কখনো শাসিতদের কাতারে নিজেকে আবিষ্কার করে? অতএব রাষ্ট্র আপনার দায়িত্ব নেবে না। নিজের সুরক্ষার দায়িত্বটা নিজেকে নিতে হবে।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর