করোনাভাইরাসের ক্রমবর্ধমান সংক্রমণের মধ্যে সাধারণ ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে সমাজে নানা তর্ক-বিতর্ক চলছে। সকল তর্ক-বিতর্কের মূল কথা, সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অর্থনীতির চাকা সচল করতে হবে, অফিস-ব্যবসাও চালু করতে হবে। নাগরিকরা চান, সে উদ্যোগগুলো যেন জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে। সীমিত পরিসরে বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচলের অনুমতির পর অফিসগামীদের সুবিধা যেমন বাড়বে, তেমনি সতর্কতা অবলম্বন না করতে পারলে গণপরিবহন ব্যাপক সংক্রমণের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এক্ষেত্রে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের কার্যালয়ে (বিআরটিএ) অনুষ্ঠিত সড়ক পরিবহন ও লঞ্চ মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে সংক্রমণ ঝুঁকি কমাতে সিটি সার্ভিস ও দূরপাল্লার বাসের ৫০ শতাংশ আসন ফাঁকা রেখে গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া ১ জুন থেকে চলাচল শুরু করতে যাওয়া বাসের ভাড়া ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করে বিআরটিএ। অনেকে মনে করেন, যাত্রীদের ওপর না চাপিয়ে তেলের দাম কমানো এবং চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য হ্রাসের উদ্যোগ নিলে করোনা-দুর্যোগে সাধারণ আয়ের মানুষেরা বাড়তি ভাড়ার চাপ থেকে রেহাই পেতে পারতেন।
মার্চের শেষের দিকে করোনা পরিস্থিতিতে সহায়তা করার জন্য আটজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি কমিটি করে সরকার। তারা রেল, নৌ ও সড়ক পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে পৃথক নির্দেশনা দিয়েছেন। এগুলোর মূল কথা হচ্ছে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, মাস্ক, গ্লাভস ও জীবাণুনাশক মজুদ রাখা। তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র রাখা এবং যাত্রীদের মেপে দেখা। প্রয়োজনে অস্থায়ী কোয়ারেন্টাইন করার জন্য জায়গা চিহ্নিত করতে হবে। গণপরিবহনে বায়ু চলাচল স্বাভাবিক রাখা, যাত্রীদের অপেক্ষার স্থান জীবাণুমুক্ত রাখা এবং বাস, লঞ্চ, ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার আগে আসন-কেবিন ও মেঝে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। পরিবহন শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির লগ সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া গণপরিবহনে ওঠা ও নামার সময় সারি মানার পরামর্শ এসেছে। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের। তাদের কথা কেউ না মানলে বা তারা দায়িত্বে অবহেলা করলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্দেশনার বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং লোক নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন আছে। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগের কথা জানা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বাসশ্রমিকদের পরিষ্কার ধারণা নেই। তাদের জীবাণুনাশক সরঞ্জাম, মাস্ক, গ্লাভস, স্যানিটাইজার দেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে শ্রমিকদের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় গণপরিবহন চালু করার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে। রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ রুটে বাসগুলো চলে ‘চুক্তিভিত্তিক’। তার ওপর সড়কে চাঁদা, সেতু ও সড়কের টোল, চালক-শ্রমিকদের থাকা-খাওয়া খরচ, বেতন ইত্যাদির জন্য তাদের অধিক যাত্রী তুলতে হয় এবং অধিক ট্রিপ দিতে হয়। তার জন্য শ্রমিকরা নামে ভয়ংকর প্রতিযোগিতায়। দীর্ঘ দুই মাস লকডাউনের কারণে তারা আছেন চরম আর্থিক সংকট ও কষ্টে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি বা মানুষের জীবনের চেয়ে তারা রোজগার বাড়ানোর দিকেই মনোযোগ বেশি দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। এহেন পরিস্থিতিতে নিয়ম-কানুনের কথা বলা, স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলা তাদের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য হবে না। সেটা প্রতিপালন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সরকার বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা দিলেও পরিবহন শ্রমিকরা কোনো ধরনের প্রণোদনা পাননি। তাই এ খাতে জড়িত ৭০ লাখ শ্রমিক আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে রয়েছেন। পরিবহন শ্রমিক নেতারা বলছেন যে গাড়ি চলবে সীমিত পরিসরে। যদি ২০ বা ৩০ শতাংশ গাড়ি চলে, তাহলে আরও ৭০ শতাংশ শ্রমিকের কী হবে? এত গাড়ির মধ্যে কোনটা চলবে, কোনটা চলবে না এ নিয়ে তো শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই এ সংক্রান্ত নীতিমালা হওয়া জরুরি। এটা সম্ভব না হলে গণপরিবহন চালু করা নিয়ে এ সেক্টরে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য টার্মিনাল ও বিভিন্ন রুটের চালক ও শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনা করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য চালক, শ্রমিকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা জরুরি। গাড়ির চালক-শ্রমিকদের মানসম্মত মাস্ক, গ্লাভস ও স্যানিটাইজার দিতে হবে। যাত্রীদের সবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ, লক্কড়-ঝক্কড় গণপরিবহন যেন রাস্তায় না নামতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। গাড়ির আসনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে না পারলে সামাজিক দূরত্ব বিশেষ কাজে আসবে না। এ অবস্থায় কঠোর নজরদারি ছাড়া গণপরিবহন চালু থাকলে সেটি বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এ বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্টদের মনোযোগ জরুরি।