শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাওয়ার পর গত কয়েক বছরে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছিল। যদিও দেশটির স্থানীয় গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তারা এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। তবে করোনা পরিস্থিতিতে এবার জোরেশোরে বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পোশাক পণ্যে শুল্ক আরোপের দাবি তুলেছে দেশটির ক্লদিং ম্যানুফেকচারিং অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (সিএমএআই)।
সম্প্রতি দেশটির বস্ত্রমন্ত্রী স্মৃতি ইরানির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ দাবি তোলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ হয়ে চীনের কাপড় প্রবেশ করছে ভারতের বাজারে।
ভারতের ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী শুল্ক আরোপ হলে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন পোশাক রপ্তানিকারকরা। অবশ্য তারা বলছেন, সাফটার (দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) অধীনে করা চুক্তি অনুযায়ী এই ধরনের শুল্ক আরোপ একতরফাভাবে করা সম্ভব নয়। দেশের বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিটিএমএ জানিয়েছে, বাংলাদেশ যে পরিমাণ পোশাক ভারতের বাজারে রপ্তানি করে, তার ১৪ গুণ বেশি বস্ত্রসামগ্রী ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়। সুতরাং ভারতের ব্যবসায়ীদের এ দাবি যৌক্তিক নয়। অন্যদিকে ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানিতে ডাম্পিংয়ের (উৎপাদন মূল্যের চাইতে কম মূল্য) চেষ্টার কথাও বলছে বিটিএমএ। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ভারতসহ অন্যান্য দেশের সুতা আমদানিতে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপের দাবি জানানো হয়েছে। এই দাবিতে সম্প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট তিন মন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বিটিএমএ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভারত সরকার করোনা পরিস্থিতিতে বেশকিছু আমদানি পণ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কভিড ইম্পোর্ট ডিউটি আরোপের বিষয়টি ভাবছে বলে সেখানকার স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সিএমএআই-এর পক্ষ থেকে এ তালিকায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্যকে এক বছরের জন্য অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, এতে দেশটির ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন। কেননা করোনা পরিস্থিতির কারণে তাদের স্থানীয় বাজারে বিক্রি কমে গেছে ৪০ শতাংশ।
পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অনেক ভালো। শুল্ক আরোপের মুখে পড়লে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সাফটার (দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) অধীনে করা চুক্তি অনুযায়ী এই ধরনের শুল্ক আরোপ একতরফাভাবে করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সরকারের উচিত হবে তারা যাতে কোনোভাবেই এটি বাস্তবায়ন করতে না পারে সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
গত কয়েক বছর আগে ভারত বাংলাদেশে তৈরি পোশাকসহ বেশকিছু পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়। এই সুবিধা কার্যকর হওয়ার পর দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। সিএমআইএ’র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের আমদানিকৃত পোশাকের এক-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশ থেকে যায়।
অবশ্য বিটিএমএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০১৭-১৮ ও ১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতের বাজারে রপ্তানি করেছে প্রায় ৫৭ কোটি ডলারের পোশাক পণ্য। কিন্তু একই সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে প্রায় ৭৭৪ কোটি ডলারের সুতা ও বস্ত্রসামগ্রী। অর্থাৎ দেশটিতে রপ্তানির চাইতে আমদানি ১৪ গুণ বেশি।
এ পরিস্থিতিতে গতকাল সরকারের সরকারের তিন মন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে বিটিএমএ’র পক্ষ থেকে যে কোনো দেশ থেকে সুতা আমদানিতে ট্যারিফ ভ্যালু ঠিক করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ এবং আমদানি পর্যায়ে দেশের সব শুল্ক স্টেশনে সুতা ও কাপড়ের মূল্য সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করার দাবিও জানানো হয়।