ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশ গিয়ে লাশ হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। নতুন নয় দেশের বাইরে গিয়ে জিম্মি হয়ে দেশ থেকে পাঠানো টাকায় মুক্ত হওয়ার ঘটনাও। তবে লিবিয়ার মিজদাহ শহরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার ২৬ বাংলাদেশির ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি। অপহৃত হয়ে মুক্তিপণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তাদের। অপহরণের পর থেকে হত্যাকাণ্ডের আগের দিন পর্যন্ত অনেকের পরিবারের কাছে ভয়েস ক্লিপ পাঠিয়ে তাগাদা দেওয়া হয়েছে মুক্তিপণ পাঠানোর জন্য। অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীর স্বজনরা মুক্তিপণের টাকা পাঠানোর জন্য ১ জুন পর্যন্ত সময়ও নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
লিবিয়ায় নিহতদের মধ্যে যশোরের রাকিবুল, ফরিদপুরের কামরুল, গোপালগঞ্জের সুজন মৃধার মতো কয়েকজনের পরিবার দেশ রূপান্তরকে শুনিয়েছেন অপহরণের পর অপহরণকারীদের সঙ্গে তাদের দেনদরবারের ঘটনা।
ভিটেমাটি বেচে টাকা জোগাড় করেছিল
রাকিবুলের পরিবার
বাড়ির ভিটা ও জমি বিক্রি করে মুক্তিপণের ১০ লাখ টাকা দিতে চেয়েও ছেলেকে রক্ষা করতে না পেরে শোকে মুহ্যমান যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শংকরপুর ইউনিয়নের খাটিয়াবাড়িয়া গ্রামের ইসরাফিল হোসেন ও মহিরুন নেসার ছেলে রাকিবুল ইসলাম (২০)। তাদের চার সন্তানের মধ্যে রাকিবুল ছোট। যশোর সরকারি সিটি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে লিবিয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছাড়ে রাকিবুল।
ইসরাফিল জানান, তিনি মাদারীপুরে স-মিলে কাজ করেন। পরিবারের অবস্থার উন্নতির জন্য বিদেশ যেতে চায় রাকিবুল। তিনি তাকে পড়ালেখা শেষ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ছেলে তার আগেই বিদেশ চলে যায়। কয়েক দিন আগেই ফোন আসে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। টাকা না দিলে হত্যা করা হবে। ইসরাফিল বলেন, সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য এক পর্যায়ে বাড়ির ভিটা ও জমি বিক্রি করে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তার পরিবার। এ জন্য ১ জুন পর্যন্ত সময়ও নেওয়া হয়।
নিহত রাকিবুলের বড় ভাই সোহেল রানার সঙ্গে মুক্তিপণের টাকার জন্য যোগাযোগ করত পাচারকারী চক্র। তিনি জানান, টাকার দাবিতে তার সঙ্গে যারা কথা বলেছে তারা বাঙালি। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি লিবিয়ার ত্রিপোলির উদ্দেশে বাড়ি ছাড়ে রাকিবুল। গত ১৭ মে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান সোহেল রানা। তিনি আরও জানান, ১৮ মে তার মোবাইল ফোনে ইমো অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে বলা হয়, তার ভাইকে পেতে হলে ১২ হাজার ডলার পৌঁছে দিতে হবে দুবাইতে। না হলে তাকে মেরে ফেলা হবে। তারা লিবিয়া অবস্থানরত তাদের চাচাতো ভাই ফিরোজের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দুবাইতে পৌঁছে দিতে চাইলে রাজি হয়নি অপহরণকারীরা। প্রতিদিন সকাল ও বিকালে ফোন দেওয়া হতো এবং রাকিবুলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়া হতো। রাকিবুল তাদের বলত, আমার জীবন ভিক্ষা দে, তোরা টাকা ম্যানেজ করে দে। ২৮ মে একটি ফোন থেকে রাকিব জানায়, তাদের মেরে ফেলা হচ্ছে। এরপর তারা জানতে পারেন রাকিবসহ ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার কথা।
১০ লাখ টাকা দিতে রাজি ছিল
ফরিদপুরের কামরুলের স্বজনরা
লিবিয়ায় গুলিতে বাংলাদেশিদের মধ্যে ২৬ জন নিহতের মধ্যে রয়েছেন ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লভদী ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামের কবির শেখের ছেলে মো. কামরুল ইসলাম শেখ। একটু সচ্ছলতার আশায় তার দরিদ্র পিতা তাকে জমি বিক্রি করে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিল। কিন্তু মানব পাচারকারী চক্রের দাবি মতো চাঁদার টাকা না দেওয়ায় অন্যদের সঙ্গে তাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।
আলমপুর গ্রামের কবির শেখের ছেলে নিহত কামরুল ইসলামের স্ত্রী ও দুই বছরের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে।
কামরুলের বাবা কবির শেখ বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসেদপুর উপজেলার গোয়ালা গ্রামের জনৈক আব্দুর রবের মাধ্যমে সাড়ে চার লাখ টাকার বিনিময়ে কামরুলকে বিদেশ পাঠায় তার পরিবার। এরপর সে ভারত ও দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছে। তিনি বলেন, সংসারে অভাব অনটন লেগে থাকত। একটু সুখের আশায় দালালের কথামতো সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ও জমি বিক্রি করে সাড়ে চার লাখ টাকা জোগাড় করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম।
নিহতের বড় ভাই ফারুক শেখ জানান, লিবিয়ায় পৌঁছার পর দালাল চক্র তাকে অন্যদের সঙ্গে একটি শহরে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। এরপর মোবাইল ফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কামরুলকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে পাচারকারী চক্রটি। নইলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় তারা। ভাইয়ের জীবনের কথা ভেবে তারা ধারকর্জ করে টাকা দিতে রাজিও হয়েছিলেন বলে জানান তিনি। কিন্তু সেই টাকা পাঠানোর আগেই মিজদা শহরে কামরুলসহ ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করার খবর পেলেন তারা।
সময় চেয়েছিলেন গোপালগঞ্জের
সুজনের বাবাও
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার গোহালা ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা গ্রামের কৃষক কাবুল মৃধার ছেলে সুজন মৃধা। গত জানুয়ারি মাসে পরিবারের অভাব মেটাতে লিবিয়া পাড়ি জমান। সুজনের বাবা একই ইউনিয়নের যাত্রাবাড়ী গ্রামের রব মোড়লের মাধ্যমে ছেলেকে লিবিয়া পাঠান। আর জন্য দালালকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা দেন। ৩৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাকে কোনো কাজ দেয়নি দালাল চক্র।
সুজনের বাবা কবুল মৃধা জানান, ২৬ মে মানব পাচারকারীরা সুজনের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ভয়েস কল পাঠাতে বলে দেশে। ওই ভয়েস কলে সুজনকে মারপিট করার ভয়েস পাঠানো হয়। তখন সুজনের বাবা তাদের কাছে ১ জুন পর্যন্ত সময় চান। কিন্তু তার আগেই ওরা সুজনকে গুলি করে হত্যা করে।
একই উপজেলার সুন্দরদী গ্রামের মো. কালাম শেখের ছেলে ওমর শেখ (২২) গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লিবিয়ার ত্রিপোলি হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। কাঠুরে বাবা পরিবারে একটু সচ্ছলতার জন্য ছেলেকে ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে একই গ্রামের দালাল লিয়াকত মোল্লার মাধ্যমে ছেলেকে লিবিয়া পাঠান। তার কাছেও চাওয়া হয় মুক্তিপণের টাকা।