করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এ সময়ে দেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এ খাতের কর্মহীন কর্মীদের পাশে না দাঁড়ানোয় সমালোচনা হচ্ছিল। এ অবস্থায় ইইউ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) এক চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ১০ লাখ কর্মহীন শ্রমিককে মাসে ৩ হাজার টাকা করে তিন মাস মজুরি দেবে। এ ক্ষেত্রে ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরো বরাদ্দ দিতে চিঠিতে বলেছে ইইউ। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৬ কোটি টাকা (প্রতি ইউরো ৯৭ টাকা হিসাবে)। এখন এর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলে ইআরডি সূত্রে জানা গেছে।
গত ২০ মে ইইউর বাংলাদেশ মিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইইউ কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশকে ৩৩ কোটি ৪০ লাখ ইউরো সমপরিমাণ সহায়তা দেবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ব্যয় হবে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ইউরো আর ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরো ব্যয় হবে পোশাক শ্রমিকদের জন্য। এই ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর মধ্যে ২ কোটি ইউরো জার্মান সরকারের অনুদানও যুক্ত রয়েছে।
এ বিষয়ে ইআরডি সূত্রে জানা যায়, জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশল (এনএসএসএস) কর্মসূচিতে ১৩ কোটি ইউরো সমপরিমাণ অর্থ অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইইউ। গত এপ্রিলে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এখন গার্মেন্টস শ্রমিকদের ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরো দেওয়ার প্রস্তাব করেছে ইইউ। এনএসএসএসের জন্য স্বাক্ষরিত তহবিল থেকে এ তহবিল আসবে। কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের কারণে কারখানার কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় যেসব শ্রমিক চাকরি হারাবে, ইতিমধ্যে চাকরিচ্যুত হয়েছে অথবা লে-অফ বা বেতন পাচ্ছে না এমন মোট ১০ লাখ শ্রমিক এ অনুদানের আওতায় আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনুদানের আওতায় একজন শ্রমিক জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাসের জন্য তিন হাজার করে টাকা পাবেন। শ্রমিকদের মধ্যে যারা কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে চাকরি হারিয়েছেন, অন্য কারখানায় যোগ দেননি এবং বেকার রয়েছেন তারা নগদ এ সহায়তার জন্য যোগ্য হবেন। ১০ লাখ শ্রমিকের প্রত্যেককে মাসে ৩ হাজার টাকা করে তিন মাস দিতে ব্যয় হবে ৯০০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে ইআরডির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার এবং ইইউর মধ্যে চলমান এনএসএসএস কর্মসূচি থেকে ইইউ তিন মাস ধরে পোশাক শ্রমিকদের অনুদান হিসেবে ১১৩ মিলিয়ন ইউরো সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছে।’
অন্যদিকে ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ও ইউরোপ শাখার প্রধান গৌরাঙ্গ চন্দ্র মোহন্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটির বিষয়ে আলোচনা চলছে, এখনো নেগুসিয়েশন সম্পন্ন হয়নি। আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। চুক্তিটি হওয়ার পর আমরা তহবিল এবং পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করতে সক্ষম হবো।’
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পোশাকশ্রমিকদের বেতন পরিশোধে প্রধানমন্ত্রী ৫ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ প্রণোদনা দিয়েছেন। এজন্য বেতনহীন শ্রমিকের সংখ্যা বেশি থাকার কথা নয়। কিন্তু বেশকিছু গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া অনেকেই ছাঁটাই হয়েছে বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় ইইউর সহায়তার বিষয়টি নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে, শিগগিরই এর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে অনুদান দিচ্ছে ইইউ। এটা অবশ্যই ভালো সংবাদ। এখন ইআরডি যত দ্রুত তাদের নেগুসিয়েশন সম্পন্ন করবে, তত দ্রুত এ টাকা পাবে শ্রমিকরা।
জানা গেছে, ইইউ বিষয়টি নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ এবং বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সঙ্গে আলোচনা করেছে। অনুদানের অর্থ মোবাইল আর্থিক পরিষেবার (এমএফএস) মাধ্যমে শ্রমিকদের দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, নগদ সহায়তা বিতরণ জুন থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল, তবে আমলাতান্ত্রিক অসুবিধার কারণে এটি এখন অনিশ্চিত। তবে এটি জুলাই থেকে শুরু হতে পারে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, শ্রমিকরা আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এজন্য চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য পদ্ধতি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তবে বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাকরিচ্যুতদের মজুরি দেওয়ার এ প্রক্রিয়া ছয় মাস পর্যন্ত বাড়তে পারে। প্রথম পর্যায়ে ইইউ ৩০ লাখ শ্রমিককে তিন মাসের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা দিতে সম্মত হয়েছিল। যারা করোনার কারণে চাকরি হারিয়ে এখন বেকার আছে, তারাই শুধু নগদ সহায়তা পাবে বলে আলোচনা হয়েছিল। এখন প্রাথমিকভাবে যদি ১০ লাখ শ্রমিকের জন্য তিন মাসের মজুরিও হয়, সেটি ভালো।