অভ্যন্তরীণ আকাশপথ খোলার দ্বিতীয় দিনেও যাত্রীর অভাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সব ফ্লাইটই বাতিল করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কোনো ফ্লাইট ছাড়তে পারেনি সংস্থাটি। মাত্র তিনজন যাত্রী চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য ঢাকার এ বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ফিরিয়ে দিয়ে বলা হয়, যাত্রী নেই, তাই সব ফ্লাইট বাতিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিমানের বিপণন কৌশল খুবই খারাপ। সংস্থাটির কোনো জাবাবদিহিতা নেই বললেই চলে। দুর্নীতির ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারছে না সংস্থাটি। টিকিট থাকার পরও তারা বলে টিকিট নেই। তাছাড়া অন্য এয়ারলাইনসের তুলনায় বিমানের টিকিটের দামও বেশি। মূলত এসব কারণে সংস্থাটি যাত্রী টানতে পারছে না। যাত্রী সংকটের এমন দশায় রীতিমতো বিস্মিত বিমানের কর্তারা। গত ১ জুন থেকে চালু হয়েছে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট। প্রথম দিনও যাত্রীর অভাবে চারটি ফ্লাইট বাতিল করে বিমান। এদিকে অন্য দুটি বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা ও নভোএয়ারের ফ্লাইট যথারীতি পরিচালিত হলেও গতকাল দুটি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মার্কেটিং পলিসিতে বেসরকারি এয়ারলাইনসের তুলনায় বিমান বরাবরই পিছিয়ে। অন্যদিকে বিপণন কৌশলে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে ইউএস-বাংলা ও নভোএয়ার। কভিড-১৯ মহামারীর সময় বিবেচনা করে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ওয়ানওয়ের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করেছে ন্যূনতম ১,৯৯৯ টাকা। ইউএস-বাংলায় সবচেয়ে কম ভাড়ায় সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রীসেবা দিচ্ছে। যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও বিমানের চেয়ে বেশি নিরাপদ ব্যবস্থা নিয়েছে ইউএস-বাংলা। যাত্রীদের ভাষ্যমতে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে নতুন নিয়মে যে ভাড়া তা ইউএস-বাংলার ভাড়ার চেয়ে বেশি। মূলত এ কারণেই বিমানের যাত্রী মিলছে। সবাই ছুটছে ইউএস-বাংলা আর নভোএয়ারে। করোনাকালের অবস্থা বুঝে ভাড়া নিয়ে যাত্রী টানার কৌশল নিয়েছে ইউএস-বাংলা।
কেন যাত্রী মিলছে না জানতে চাইলে বিমানের কোনো কর্মকর্তা মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না। তবে পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, হতে পারে ভাড়া একটা ফ্যাক্টর। এমনিতেই ভাড়া বেশি, তার ওপর আবারও ভাড়া বাড়াতে চেয়েছিল বিমান। একজন বোর্ড মেম্বার হিসেবে তাতে দ্বিমত করে ভাড়া না বাড়ানোর যুক্তি তুলে ধরেছি। অন্যদিকে বিমানের তুলনায় বেসরকারি এয়ারলাইনসের ভাড়া কম ধরা হয়েছে।
এ সম্পর্কে গতকাল দুপুরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জেনারেল ম্যানেজার তাহেরা খন্দকার বলেন, যাত্রী সংকটের কারণে বিমান বাংলাদেশ ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। সোমবারও আমাদের কিছু ফ্লাইট বাতিল করা হয়। কারণ যাত্রী ছিল না। তবে আমরা আশা করছি, আগামীকাল (আজ বুধবার) থেকে আমাদের ফ্লাইট চলবে। তিনি বলেন, আজ (গতকাল) চট্টগ্রাম রুটে দুটি, সিলেটে দুটি ও সৈয়দপুরে দুটি ফ্লাইট ছিল। কিন্তু যাত্রী না থাকায় কোনো রুটে বিমান যায়নি। মূলত যাত্রীর অভাবে আগের রাতেই ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয় যাতে যাত্রীরা বিমানবন্দরে এসে ভোগান্তির শিকার না হয়।
এ সম্পর্কে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আড়াই মাস পর চালু হওয়ার প্রথম দিন সোমবার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাত্রীরা তেমন আগ্রহ দেখাল না। অন্যান্য গণপরিবহনের চেয়ে তুলনামূলক বেশি সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেও কাক্সিক্ষত যাত্রী পায়নি তিনটি বিমান সংস্থা। এর মধ্যে প্রথম দিন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ছেড়ে গেছে মাত্র চারজন যাত্রী নিয়ে। আর গতকাল অবস্থা আরও শোচনীয়। এদিন সব ফ্লাইট যাত্রীর অভাবে বাতিল করা হয়েছে। তবে অন্য দুই বিমান সংস্থা নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের কোনো ফ্লাইট বাতিল হয়নি। অবশ্য তাদের যাত্রীর চাপ কম ছিল। এছাড়া কার্যক্রম বন্ধ থাকায় উড়তে পারেনি রিজেন্ট এয়ারওয়েজ।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক কর্মকর্তা বলেন, প্রথম দিন তিনটি রুটে (ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, সৈয়দপুর) ২৪টির মধ্যে পাঁচটি বাতিল হওয়ায় ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে মোট ১৯টি। ১৫ জুন পর্যন্ত তিনটি রুটে ২৪টি ফ্লাইটের মধ্যে ইউএস-বাংলা চট্টগ্রামে ছয়টি, সৈয়দপুরে তিনটি ও সিলেটে একটি করে ফ্লাইট চলবে। নভোএয়ারের প্রতিদিন চট্টগ্রামে তিনটি, সৈয়দপুরে তিনটি ও সিলেটে একটি করে ফ্লাইট রয়েছে। অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রতিদিন চট্টগ্রামে দুটি, সিলেটে দুটি ও সৈয়দপুরে তিনটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করার কথা ছিল।
জানা গেছে, গতকাল ইউএস-বাংলা ও নভোএয়ারের দুটো বাসে সব ফ্লাইট যথাসময়ে অপারেট করা হয়েছে। ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রামের মোট ছয়টি ফ্লাইটের মধ্যে চারটি শিডিউল অনুযায়ী ফ্লাই করেছে। দুটি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট ও সৈয়দপুরের লোড ফ্যাক্টর মোটামুটি ভালোই ছিল। চট্টগ্রামে কিছুটা কম ছিল। তবে দিন দিন এটা বাড়বে। নভোএয়ারও সবকটি ফ্লাইট যথারীতি ঢাকা ছেড়ে গেছে। ফিরেছেও নিয়মিত।