বাড়ছে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা

টানা ৫ বছর ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা বাড়েনি। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সৃষ্ট অচলাবস্থায় মানুষের আয় কমে গেছে। বেড়েছে কর্মহীন মানুষের সংখ্যাও। গত ৫ বছর সার্বিক মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হবে। বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির আয়ের আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত। এটি বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হবে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু করোনার কারণে নয়, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হচ্ছে। আরও আগে থেকেই এ সীমা বাড়াতে পেশাজীবী, ব্যবসায়ী সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল দাবি জানিয়ে আসছিল। এর আগে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানায়, আগামী অর্থবছরে মাথাপিছু সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখা উচিত। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে কভিড-১৯ রোগের নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবেচনা করে এনবিআরের প্রতি এ আহ্বান জানান সিপিডির বিশেষজ্ঞরা। তবে এনবিআরের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে করদাতাদের বড় একটি অংশ করজালের বাইরে চলে যাবে। এতে আদায়ও কমবে। এজন্য এনবিআর করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পক্ষে ছিল না। কিন্তু আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান বাজেট থেকে ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হবে।

এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে করা হচ্ছে বলে এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তারা বলেন, করোনাকালে মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কষ্ট লাঘব হবে বলে মনে করছেন তিনি।

তবে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, টানা ৫ বছর ব্যক্তিশ্রেণির আয়ের করমুক্ত সীমা বাড়েনি। এ সময় মূল্যস্ফীতি কম হয়নি। এমনিতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। করোনা না থাকলেও এবার বাজেটে তার সীমা বাড়ানোর চিন্তা ছিল। কারণ আদায়কৃত মোট আয়করের ৫৭-৬০ শতাংশ উৎসে কর হিসেবে আদায় করা হয়। বাকি বৃহৎ অংশ অগ্রিম কর ও প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের কাছ থেকে আদায় হয়। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কাছ থেকে যে পরিমাণ কর আদায় করা হয়, তা একেবারেই সামান্য।

এর আগে সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছিল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ছিল দুই লাখ ২০ হাজার টাকা। এটিকে বাড়িয়ে তখন আড়াই লাখ টাকা করা হয়। এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২ লাখ টাকা ও ২০১৩-১৪ তে ছিল ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। অবশ্য ২০১৫-১৬ অর্থবছরের পর প্রতি অর্থবছর গড়ে ৫ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি থাকলেও শুধু এনবিআরের অনাগ্রহের কারণে এ আয়সীমা বাড়ানো হয়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বছর শেষে সার্বিক মূল্যস্ফীতির গড় দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশে। চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা। এর বেশি বার্ষিক আয় থাকলে এলাকাভেদে ন্যূনতম ৩-৫ হাজার টাকা আয়কর দেওয়ার বিধান আছে। নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ৩ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী করদাতারা ৪ লাখ টাকা ও গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতাদের আয় ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত।

বর্তমানে এলাকাভেদে ন্যূনতম করহারে পার্থক্য আছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জন্য ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা, অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪ হাজার টাকা এবং জেলা শহরের করদাতাদের ৩ হাজার টাকা কর দিতে হয়। অন্যদিকে আয় অনুযায়ী কর নির্ধারিত আছে। আড়াই লাখ টাকার পরবর্তী ৪ লাখ টাকার জন্য ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখের জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৬ লাখের জন্য ২০ শতাংশ, পরবর্তী ৩০ লাখের জন্য ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর নির্ধারিত আছে।