পাহাড়ের কোলে প্রান্তিক মানুষের জীবনের গল্প

১. গ্রামে ফিরেছি ঈদের এক সপ্তাহ আগে। এখনো গ্রামেই আছি। মেঘালয়ের কোলঘেঁষে গারো পাহাড়ের পাদদেশে আমাদের গ্রাম আসকিপাড়া। গারো ভাষায় হয়েছে গ্রামের নাম। আচিক ভাষায় ‘আসকি’ মানে আকাশের তারা। এই জ্যৈষ্ঠ মাসে ছবির মতো সবুজ একটি গ্রাম আসকিপাড়া। এখানে আকাশে মেঘ আর রোদ খেলা করে। উত্তরে মেঘালয়ের পাহাড় কয়েক ধাপে ঢেউ খেলানো। ওদিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। গত কয়েকদিন ধরে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে। তাই বৃষ্টির পরে আকাশ হয় ঝকঝকে নীল। সঙ্গে কিছু মেঘ উড়ে যায়। আমাদের বাড়ির আঙিনায় নানারকম গাছ। বিশেষ একটি গাছ আছে। নাম মহুয়া। রাতে বাদুড়সহ নানা পাখি ফল খেতে আসে। এখানে প্রকৃতি ও মানুষ একাকার, পরিপূরক। চারপাশে কত পাখি ডাকে। এই মুহূর্তে আমি লিখছি আর কোকিল ডাকছে ভিটায় গাছে বসে। একটু দূরে ‘বউ কথা কও’ পাখি ডেকে চলেছে। গাছে গাছে কত ফল, আম, জাম, কাঁঠাল, জামরুল কত কী। গতকাল বিকালে ঝকঝকে নীলাকাশ ছিল আর তখন আকাশে উড়ে যাচ্ছিল উড়োজাহাজ। পরিষ্কার নীলাকাশে উড়োজাহাজ উড়ে চলার ধোঁয়া উড়ছিল। বহুদিন পর এমন দৃশ্য দেখলাম আমাদের গ্রামে। সম্ভবত কলকাতা থেকে গৌহাটি যাচ্ছিল বিমানটি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বললাম, ঐ আকাশে তাকিয়ে দেখ। ঢাকা শহরে বায়ূদূষণের ফলে এমন দৃশ্য এখন কল্পনাও করা যায় না। আমাদের পাহাড়ের কোলের গ্রামে বাতাস বিশুদ্ধ চারদিকে। নিঃশ্বাস নিলে এই পার্থক্য বোঝা যায় যারা আমরা ঢাকায় থাকি। গ্রামের পশ্চিম পাশে ছোট পাহাড়ি নদী। আরও একটু দূরে পশ্চিমে বেশ বড় নদী বুগাই। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। এই অঞ্চলে গারোদের বেশ কয়েকটি বড় গ্রাম রয়েছে। গ্রামে করোনা ভাইরাসের খবর নেই। কেউ আক্রান্ত হয়েছে বলে সংবাদ নেই। আশপাশের গ্রামের অনেকে শহর থেকে গ্রামে ফিরেছে বিশেষ করে ঈদ উদযাপন করতে। গ্রামে ফেরা অনেকে আবার শহরে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছে। গ্রামের অনেকে বিভিন্ন গার্মেন্টস কোম্পানিতে কাজ করে। অনেকেই ইনফরমাল কাজে জড়িত, যেমন বিউটি পার্লার, ড্রাইভার, নিরাপত্তাকর্মী, বাসাবাড়ির কাজ ইত্যাদি। ওদের চাকরিতে ফেরা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। সকালে এক গারো কৃষক এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে বর্র্গা চাষের জন্য জমি বুঝে নিতে এবং সঙ্গে বিছন (বীজ ধান) নিতে। যাকোব মৃ তার নাম। বললেন, তার ঘরে খাবারের লোক ছিল ৩ জন। এখন করোনায় শহরের আত্মীয়-স্বজন গ্রামে ফেরার কারণে খাবার লোক ১০ জন। ৭ জনই শহর থেকে চলে এসেছে গ্রামে। বললাম, তারা কোথা থেকে এসেছে। তার সঙ্গে আসা এক যুবককে দেখিয়ে বললেন, এও তো চলে এসেছে। তার নাম হিসরুন রিছিল। সে কাজ করত কিশোরগঞ্জে। রোড তৈরির কাজ। কোম্পানির নাম ‘ইনস্পেক্টর ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’। হিসরুন গ্রামে চলে এসেছে ২৮ এপ্রিল। সে মার্চ ও এপ্রিল মাসের পুরো বেতন পেয়েছে। সে কোম্পানিতে ফোন করেছিল। কোম্পানি বলেছে এখন কাজে আসার দরকার নেই। হিসরুন জানে না আগামীতে কী হবে ওর কাজের ভবিষ্যৎ। যাকোবের শ্যালিকা কাজ করত ঢাকায় একটি বিউটি পার্লারে। সেও চলে এসেছে গ্রামের বাড়িতে। কেননা পার্লার বন্ধ এবং এই গারো নারী জানে না তাদের পার্লার কবে খুলবে, আদৌ খুলবে কি না। আর যদি খোলেও, কাস্টমার পার্লারে আসবে কি না করোনার ভয়ে? সব মিলিয়ে পার্লারের কাজে নেমে এসেছে গভীর এক অনিশ্চয়তা।

২. সকালে কিছুক্ষণ পর দেখলাম আমাদের উঠানে বসে আছেন দুই বাঙালি কৃষক। একজন জামগড়া গ্রামের বশির, আরেকজন জখমকুড়া গ্রামের জামির। জামির কয়েক বছর ধরে আমাদের জমি বর্গাচাষ করেন। ‘রঞ্জিত’ নামের ধান প্রজাতি আছে আমি জানতাম না। আজ ওদের কাছে জানলাম। ধানের বিছন নিতে এসেছেন তারা। আমন ধান লাগাবেন। ওদের সঙ্গে গ্রামের খবরাখবর নিয়ে কথা বললাম। বললেন, গ্রামে করোনা নিয়ে তেমন আতঙ্ক নেই। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতি নিয়ে। জামির বললেন, আমি শসা চাষ করেছিলাম দুই কাঠা জমিতে। ৫৫ মণ শসা বিক্রি করেছি। মণপ্রতি ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা বিক্রি করেছি। কেজি পড়েছে ৬ থেকে ৭ টাকা। করোনা না থাকলে শসা মণপ্রতি ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারতেন। গত বছর মণপ্রতি শসা ১,৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। গ্রামে কৃষি ফসলের দাম এভাবে নেমে গেল এবার। জামির বললেন, এরকম হলে কৃষক বাঁচবে কীভাবে? আমি বললাম, ঢাকায় তো শসা ৪০/৫০ টাকা কেজি ছিল। তারা ঢাকার কথা শুনে হাসেন। এই সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ নানাভাবে বৈষম্য ও বঞ্চনা শিকার। গ্রামগুলোতে এখনো বিদ্যুৎ নেই। সরকারি দলের লোকেরা প্রায় অর্ধযুগ আগে বিদ্যুতের কথা বলে জনগণের কাছ থেকে টাকা তোলে। বিদ্যুৎ আর আসেনি। তবে খাম্বা লেগেছে কয়েকটি গ্রামে। তাও প্রায় ৬ মাসের বেশি হয়ে গেল। এই খাম্বা আসার সময়ও দলের লোকেরা গ্রামবাসীর কাছে টাকা চেয়েছিল। আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি বলেছিলাম কাউকে টাকা না দিতে।

এবার জামির ও বশিরের সঙ্গে ধান প্রসঙ্গে কথা বললাম। আমি জানতাম কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পান না। ধানচাষে একরপ্রতি যে খরচ হয়, ধানের মূল্য তার তুলনায় কম। আমরা হিসাব কিতাবে নামলাম। আমাদের হালুয়াঘাট এলাকায় ধানচাষ করতে প্রতি একরে খরচ হয় আনুমানিক ১৯/২০ হাজার টাকা। যেমন, জমি তৈরিতে ট্রাক্টর খরচ ৩,০০০ টাকা, চারা রোপণ খরচ ৪,০০০ টাকা, আগাছা বাছাই ২,০০০ টাকা কমপক্ষে। জামির বললেন, নিজেই পরিবারের লোকজনসহ দুই তিনজন কামলা নিয়ে কাজ করি। এতে মজুরি একটু কম লাগে। সার টিএসপি ও ইউরিয়া মিলে ৩,০০০ টাকা। জমিতে অন্তত দু’বার বিষ দিতে হয় ১,০০০ টাকা। ধান কাটার পর ‘বোমা’ মেশিন দিয়ে মাড়াতে লাগে ১,০০০ টাকা। এই হলো হিসাব। যদি ধান ভালো হয়, তবে একরপ্রতি ৫০ মণ ধান পাওয়া যায়। এই হিসাবে ধানের দাম যদি ৫০০ বা ৬০০ টাকা মণ হয়, কৃষকের কাছে থাকে না তেমন কিছু। জামির ও বশির বললেন, কৃষক ধান চাষ করে কারণ আর কী করবে, সে জানে না। আমি বললাম, অন্তত খোরাকি চলে এই ধান চাষে, এটি সান্ত¡না। তারা একমত হলেন। আমি বললাম, সরকার যে গত বছর মণপ্রতি ১,০৪০ টাকা দরে ধান কিনেছিল, তাতে কি কৃষক উপকৃত হয়েছিল? তারা বললেন, সেই টাকা তো দালালরা আগেই খেয়ে ফেলে। দালালদের নামে চেক ইস্যু হয় যাদের ধানচাষের সঙ্গে কোনো সম্পৃত্ততা নেই, প্রকৃত কৃষকের কাছে সরকারের প্রণোদনার সেই দাম পৌঁছায় না। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে পারে।

বশিরকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, আমাদের এলাকা থেকেও  অনেকে মধ্যপ্রাচ্যে ও মালয়েশিয়ায় কাজ করেন। তারা এই করোনাকালে কেউ ফেরেননি। তবে শুনেছেন ওমানে যে কয়জন আছেন, তাদের লকডাউনে রাখা হয়েছে জাহাজে। যোগাযোগ আছে। এই প্রবাসী কর্মীরা মাসে পনেরো হাজার টাকার মতো দেশে পাঠাতেন। এখন তারা জানেন না কী আছে তাদের ভবিষ্যতে।

৩. এই কৃষকের দল চলে যাওয়ার পর আমাদের পাশের গ্রামের দুই গারো নারী আমার কাছে এলেন। তাদের একজন ঢাকার গুলশানে ‘ওমেন্স ওয়ার্ল্ড’ বিউটি পার্লারে, অন্যজন গুলশানেই ‘লা শিয়া’ বিউটি পার্লারে কাজ করেন। তাদের কাছে জানলাম গুলশানের ওমেন্স বিউটি পার্লারে ১৯ জন নারী কাজ করেন, যাদের ১৭ জনই গারো নারী। অন্যদিকে লা শিয়া বিউটি পার্লারের মালিক ইন্দোনেশিয়ান। মালিক চলে গেছেন। কবে ফিরবেন, ভবিষ্যতে পার্লার খুলবেন কি না, ওরা জানেন না। এই মেয়েরা ঢাকার ভাড়া বাসা ছেড়ে দিয়ে অনিশ্চিত সময়ের জন্য গ্রামে চলে এসেছেন। এই দুই নারীর একজনের বড় বোনও ঢাকায় কাজ করতেন ফিলিপিনো মালিকের হাউজে। এই নারীও গ্রামে ফিরে এসেছেন। অন্য এক বোন অনার্স পড়ার পর এলাকায় টিউশনি করে দিন চালাচ্ছিলেন  আর ভালো কোনো চাকরির সন্ধান করছিলেন। এখন ওরা সবাই করোনার কারণে গ্রামে ফিরে এসেছেন। ওদের পরিবারের মূল রোজগার ছিল ঢাকা শহরের কাজ। এখন সব বন্ধ অনির্দিষ্টকালের জন্য। এই বিউটি পার্লারের কর্মী দুই গারো নারীর সঙ্গে কথা বলে জানলাম, ওদের চেয়ে আরও বড় বড় পার্লার যেমন পারসোনা, ফারজানা শাকিলস্-এ শত শত গারো মেয়ে কাজ করে। সব এখন বন্ধ গত দুই মাস ধরে।

৪. এই করোনার সময় রাষ্ট্রের অনেক প্রণোদনার খবর আমরা পাই। বড় বড় ব্যবসার জন্য বড় বড় প্রণোদনা। কিন্তু পাহাড়ের কোলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ওই বাঙালি কৃষকদের মতো, বিউটি পার্লারে কর্মরত ওই গারো নারীদের মতো যারা এই করোনাকালে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি, তাদের জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী? এই প্রান্তিক মানুষেরাও তো ভ্যাট-ট্যাক্স দেন। তাদেরও রয়েছে পূর্ণ নাগরিক অধিকার। মানুষের মতো করে মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে বাঁচবার অধিকার। একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রে ওদের কথাই তো সবার আগে ভাবতে হবে। তাই ওদের টার্গেট করেই একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ঘোষণা করা হোক।