স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দেশে করোনাভাইরাসে মোট সংক্রমিতের প্রায় অর্ধেকই শনাক্ত হয়েছে শেষ দুই সপ্তাহে। এ থেকে বোঝা যায়, সংক্রমণ দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। সবশেষ একদিনে ১২ হাজার ৫১০টি নমুনা পরীক্ষা করে ২ হাজার ৬৯৫ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্যানুসারে দেশে পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমিত শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ১৪০ জনে। আর করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৪৬ জনে। সরকারি তথ্যানুসারে এখন দেশের মোট ৫০টি ল্যাবে কভিড-১৯ পরীক্ষা হচ্ছে। সম্প্রতি দেশে ল্যাব ও পরীক্ষার সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে বলে শনাক্তের সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, জনসংখ্যার অনুপাতে পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়ানো না গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে যাবে। একই সঙ্গে বাড়ানো জরুরি করোনা রোগীদের চিকিৎসা ও চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও। আশার কথা হলো, দেরিতে হলেও এসব সুবিধা বৃদ্ধিতে সরকারের প্রচেষ্টা এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশের সব জেলা হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ স্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, এর অন্যতম।
দেশে প্রথম কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছিল গত ৮ মার্চ। এর পরপরই দেশে আইসিইউ-এর তীব্র সংকটের বিষয়টি আলোচনায় আসে। কেননা করোনাভাইরাস থেকে কডিভ-১৯ রোগে আক্রান্তদের প্রায় দশ শতাংশেরই তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে আইসিইউ ও কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্র বা ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জনস্বাস্থ্যবিদরা শুরু থেকেই এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। বলা বাহুল্য দেশের সরকারি-বেসরকারি বেশিরভাগ হাসপাতালেই প্রয়োজনের তুলনায় আইসিইউ শয্যার সংকট রয়েছে। সরকারি হিসাবে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১,১৬৯টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৪৩২টি (ঢাকায় ৩২২, ঢাকার বাইরে ১১০) আর বেসরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৭৩৭টি (ঢাকা মহানগরীতে ৪৯৪, ঢাকা জেলায় ২৬৭, অন্যান্য জেলায় ২৪৩)। অবশ্য এপ্রিলের মাঝামাঝি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশে স্বয়ংসম্পূর্ণ বা পরিপূর্ণ আইসিইউ ইউনিট রয়েছে মাত্র ১১২টি। মহামারীকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই বক্তব্য থেকে অনুমান করা যায় শতকরা ৯০ ভাগ আইসিইউ-ই আসলে যথোপযুক্ত মানের যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন নয়। অথচ দেশে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে নানা ছুঁতোয় আইসিইউ-তে রোগী রেখে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের এক গবেষণার বরাত দিয়ে সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যম বিবিসি জানায়, জনসংখ্যার অনুপাতে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। নেপালে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য আইসিইউ আছে ২.৮টি, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় ২.৩টি, পাকিস্তানে ১.৫টি, মিয়ানমারে ১.১টি আর বাংলাদেশে আছে দশমিক ৭টি। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য একটি আইসিইউ-ও নেই। দেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর এই পরিস্থিতি কারোরই অজানা নয়। ছয় বছর আগে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন হচ্ছে বলে সংসদে জানিয়েছিলেন। কিন্তু অর্ধযুগেও তার কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি ‘একনেক’-এর সভায় প্রধানমন্ত্রী করোনা মহামারী মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় দুটি প্রকল্পের অনুমোদন দেন। এর মধ্যে একটি প্রকল্পের আওতায় দেশের সব জেলা হাসপাতালে অন্তত একটি করে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
করোনা মহামারীর বৈশ্বিক এবং জাতীয় পরিস্থিতি থেকে এটা স্পষ্ট যে, সামনে আরও কঠিন সময় পাড়ি দিতে হবে আমাদের। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, আগামী দিনগুলোতে সারা দেশেই সংক্রমণ আরও ব্যাপক হারে বাড়তে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সব জেলা হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের নির্দেশ অবশ্যই একটি জরুরি উদ্যোগ। এখন এসব আইসিইউ স্থাপনের কাজ যাতে যথাযথ মান ও সব সুযোগসুবিধা বজায় রেখে দ্রুত শেষ করা যায় সে বিষয়টিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে খেয়াল রাখা দরকার এই মুহূর্তে আশা জাগালেও জাতীয় প্রয়োজনের তুলনায় এই উদ্যোগ খুবই অকিঞ্চিৎকর। আমরা যেন ভুলে না যাই, সরকারি তথ্যানুসারেই দেশে প্রতি ১ হাজার ১৫৯ জন ব্যক্তির জন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মাত্র ১টি শয্যা রয়েছে। আর প্রতি ৩ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন মাত্র ১ জন। সে হিসাবে চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশে চিকিৎসক ঘাটতি প্রায় ৭০ শতাংশ। করোনা মহামারী দেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর এসব দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন এসব দুর্বলতা দূর করতে আসন্ন বাজেটে অবশ্যই স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ প্রয়োজন অনুসারে বাড়ানো উচিত।