আক্রান্তে বিশ্বে ২০তম

তৃতীয় মাসে শনাক্ত ও মৃত্যু বেড়েছে ৪ গুণ

দেশে করোনাকালের তিন মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল শুক্রবার। তিন মাস শেষে সরকারি হিসাবে দেশে মোট করোনা শনাক্ত হওয়া রোগী ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যু ৮০০ পেরিয়েছে। একই সময়ে আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১২ হাজারের বেশি মানুষ। গতকাল দেশে করোনা শনাক্তের ৯০তম দিনে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২ হাজার ৮২৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা এযাবৎ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। একই সময়ের মধ্যে মারা গেছে আরও ৩০ জন। গত তিন মাসের শনাক্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দ্বিতীয় মাসের তুলনায় তৃতীয় মাসে শনাক্ত বেড়েছে ৪ গুণের বেশি এবং মৃত্যুও বেড়েছে প্রায় ৪ গুণের কাছাকাছি। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর প্রথম এক মাসে মোট শনাক্ত হয়েছে ১২৩ জন। দ্বিতীয় মাসে শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৫৯৬ জন এবং তৃতীয় মাসে ৪৮ হাজার ৬৭২ জন। অর্থাৎ মোট রোগীর ৮০ শতাংশের বেশি শনাক্ত হয়েছে তৃতীয় মাসে। অন্যদিকে প্রথম মাসে মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের, দ্বিতীয় মাসে ১৭৪ জনের এবং তৃতীয় মাসে মৃত্যু হয়েছে ৬২৫ জনের। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৭৭ শতাংশ হয়েছে তৃতীয় মাসে। শনাক্ত ও মৃত্যু কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে তৃতীয় মাসে সুস্থ হওয়ার সংখ্যাও কয়েক গুণ বেড়েছে। মোট সুস্থের ৮৯ শতাংশই হয়েছে এ মাসে।

এদিকে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের মধ্য দিয়ে গতকাল বাংলাদেশ বিশে^ শীর্ষ আক্রান্ত ২০ দেশের তালিকায় প্রবেশ করেছে। এদিন ২০তম অবস্থানে আসার মাধ্যমে করোনায় মৃত্যুতে অষ্টম স্থানে থাকা বেলজিয়ামকে আক্রান্তের দিক থেকে পেছনে ফেলল বাংলাদেশ।

গতকাল নিয়মিত বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত) নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১৪ হাজার ৬৪৫টি। পরীক্ষা করা হয়েছে এযাবৎ সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৮৮টি। এসব পরীক্ষায় নতুন করে ২ হাজার ৮২৮ জন কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। এদিন শনাক্তের হার ছিল ২০ দশমিক ০৭ শতাংশ। একই সময়ের মধ্যে করোনায় মারা গেছে আরও ৩০ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৬৪৩ জন।

তিনি জানান, গতকাল কিশোরগঞ্জের শহীদ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ নতুন করে নমুনা পরীক্ষা শুরু করেছে। তবে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে কারিগরি ত্রুটির কারণে এদিন পরীক্ষা হয়নি। ফলে এদিন ৫০টি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এসব ল্যাবে এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে মোট ৩ লাখ ৭২ হাজার ৪৬৫টি। এসব পরীক্ষায় মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ৬০ হাজার ৩৯১ জন। তাদের মধ্যে মারা গেছে ৮১১ জন ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১২ হাজার ৮০৪ জন। এ পর্যন্ত শনাক্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও সুস্থতার হার ২১ দশমিক ২০ শতাংশ।

সর্বশেষ মৃত ৩০ জনের বিষয়ে বলা হয়, তাদের মধ্যে পুরুষ ২৩ জন ও মহিলা ৭ জন। তাদের ১২ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ১১ জন ঢাকা, ৩ জন সিলেট, ২ জন রাজশাহী এবং বরিশাল ও রংপুর বিভাগে ১ জন করে। তাদের ১৭ জন হাসপাতালে এবং ১৩ জন বাড়িতে মারা গেছে। তাদের বয়স ৩১-৪০ বছরের ৩ জন, ৪১-৫০ বছরের ৭ জন, ৫১-৬০ বছরের ১১ জন, ৬১-৭০ বছরের ৬ জন, ৭১-৮০ বছরের ২ জন এবং ৮১-৯০ বছরের ১ জন।

বুলেটিনে আরও বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে ৩৬৫ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে আছে মোট ৬ হাজার ৯৪৬ জন। একই সময়ে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে আরও ২ হাজার ২৪৫ জন। বর্তমানে সারা দেশে কোয়ারেন্টাইনে আছে মোট ৫৭ হাজার ৩১৯ জন। স্বাস্থ্য বাতায়ন-১৬২৬৩, ৩৩৩ ও আইইডিসিআরের হটলাইনে ২৪ ঘণ্টায় করোনা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিষয়ক কল এসেছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৪০৭টি। স্থল, সমুদ্র ও বিমানপথে ২৪ ঘণ্টায় দেশে প্রবেশ করেছেন ১ হাজার ৭১১ জন, তাদের প্রত্যেককে স্ক্রিনিং করা হয়েছে।

আক্রান্তদের ৫৫ শতাংশ তরুণ ও যুবক : এদিন বুলেটিনে আইইডিসিআর থেকে প্রাপ্ত ৪ জুন পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ও মৃতদের বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। তবে দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য আইইডিসিআরের ওয়েবসাইট থেকে গতকাল ৫ জুন পর্যন্ত সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরা হলো। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৭১ ও মহিলা ২৯ শতাংশ। বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশের বয়স ২১-৩০ বছর। এরপরই আছে ৩১-৪০ বছরের ২৭ শতাংশ রোগী; ১৭ শতাংশ ৪১-৫০ বছরের, ১১ শতাংশ ৫১-৬০ বছরের; ষাটোর্ধ্ব এবং ১১-২০ বছরের রোগী আছেন ৭ শতাংশ করে এবং সর্বনিম্ন ৩ শতাংশ রোগী আছে ১-১০ বছরের। অর্থাৎ আক্রান্তদের ৫৫ শতাংশই ২১-৪০ বছরের তরুণ ও যুবক।

মৃতদের প্রায় ৬৯ শতাংশ পঞ্চাশোর্ধ্ব : এ পর্যন্ত মৃতদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বয়স্কদের তুলনায় তরুণ-যুবকদের মৃত্যুহার অনেক কম। মৃতদের মধ্যে সর্বোচ্চ রয়েছেন ষাটোর্ধ্ব বয়সের ৩৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ৫১-৬০ বছরের ২৯ দশমিক ৬২ শতাংশ, ৪১-৫০ বছরের ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ৩১-৪০ বছরের ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২১-৩০ বছরের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, ১১-২০ বছরের ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও ১-১০ বছরের মারা গেছে শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ। অর্থাৎ মৃতদের মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশই পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের।

বেসরকারি ২৫ প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষার অনুমোদন : ডা. নাসিমা জানান, এ পর্যন্ত ২৫টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে করোনার নমুনা পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদিও সবগুলো এখনো পরীক্ষা শুরু করেনি। যারা পরীক্ষা শুরু করেছে, তাদের মধ্যে আছে এভারকেয়ার (সাবেক অ্যাপোলো) হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, ল্যাবএইড হাসপাতাল, প্রাভা হেলথ, বায়োমেড ডায়াগনস্টিক, ডিএমএফআর মলিকুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ও ডিএনএ সলিউশন লিমিটেড। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী কভিড-১৯ পিসিআর ল্যাব বেসরকারি হলেও সরকারি কিট দিয়ে পরীক্ষা করছে। এ ছাড়া আইসিডিডিআর-বি সরকারি ও বেসরকারি উভয়ভাবেই নমুনা পরীক্ষা করছে এবং আইদেশি নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান সরকারিভাবে নমুনা পরীক্ষা করছে।