মুম্বাইয়ে ডাব্বাওয়ালাদের বিস্ময়কর ১৩০ বছর

ব্যস্ত শহর মুম্বাইয়ের রাস্তায় প্রতিদিনই ধবধবে সাদা পোশাক পরা কিছু মানুষকে লাঞ্চবক্স নিয়ে হেঁটে অথবা সাইকেলে করে ছুটতে দেখা যায়। এই দৃশ্য মুম্বাইয়ের মানুষের কাছে ১৩০ বছর ধরে পরিচিত। এই মানুষগুলোকে সবাই চেনে ‘ডাব্বাওয়ালা’ হিসেবে। কোনো ধরনের প্রযুক্তি ছাড়াই প্রায় দেড়শ বছরের কাছাকাছি সময় ধরে এ ব্যবসা টিকে আছে। বিবিসি অবলম্বনে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

লাঞ্চবক্সের গল্প

গত ২৯ এপ্রিল-২০২০ না ফেরার দেশে চলে গেছেন বলিউডের অন্যতম পরিচিত মুখ ইরফান খান। প্রিয় অভিনেতাকে হারানোর ব্যথায় কাতর ছিল বলিউড, হলিউড ও ঢালিউডও। তার অভিনীত প্রতিটি সিনেমা আলোচিত, তবে অনেক বেশি আলোচনা হয়েছে ‘লাঞ্চবক্স’ সিনেমাটি নিয়ে। ইলা ও সাজান ফার্নান্দেজ (ইরফান খান) নামের দুটি চরিত্র নিয়েই এই পুরো সিনেমার মূল গল্প। মুম্বাইয়ের ডাব্বাওয়ালা ইলার বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে যান তার স্বামীর জন্য, কিন্তু ভুলবশত সেটি চলে যায় ইরফান খানের হাতে। ভুল করেই দুজন অচেনা মানুষ একে অন্যের বন্ধু হয়ে ওঠেন। লেখাটির মূল বিষয় ইরফান খান বা ইলা নন। তাদের দুজনের যার মাধ্যমে পরিচয়, লেখাটি সেই ডাব্বাওয়ালাদের নিয়ে। মুম্বাইয়ে ‘ডাব্বাওয়ালা’ খুব পরিচিত একটি শব্দ। ব্যস্ত এই শহরে এদের নাম শোনেনি বা রাস্তায় হুট করে এদের দেখা মেলেনি, এমন ঘটনা খুব কম। প্রতিদিন সকালে মুম্বাইয়ে নিজ এলাকা থেকে সাইকেল চালিয়ে প্রতিজন ডাব্বাওয়ালা ৩০ জন গ্রাহকের বাড়ি থেকে খাবার সংগ্রহ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চলে আসেন নির্দিষ্ট কোনো একটি অফিস বা রেলস্টেশনের সামনে। রাস্তার ট্রাফিক, ঝড়, বৃষ্টি সব পাড়ি দিয়ে তাদের ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় খাবার নিয়ে উপস্থিত থাকতে হয়। এক হাত থেকে সংগ্রহ করা খাবার সঠিক মালিকের কাছে পৌঁছানোর জন্য কয়েক হাত ঘোরে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হচ্ছে অনেক হাতবদল হলেও হাজার হাজার লাঞ্চবক্স প্রাপকের হাতে পৌঁছাতে ভুল হয় না একদম! বর্তমান যুগ টেকনোলজির। প্রযুক্তির নানা ব্যবহার চারদিকে। এখন খেতে চাইলে উবার ইটস বা অন্যান্য অ্যাপে সহজেই অর্ডার করা যায়। কিন্তু তাই বলে প্রতিদিনের অফিসের লাঞ্চে নিশ্চয়ই আপনার প্রথম পছন্দ এই অ্যাপগুলোতে অর্ডার দেওয়া লাঞ্চের খাবার হবে না। দুপুরবেলা মা অথবা স্ত্রীর হাতের রান্না ছাড়া খাবার খেলে যেন খাবারের অপূর্ণতা রয়ে যায়। কিন্তু খুব সকালে কাকডাকা ভোরে বাস, ট্রেনের ভিড় ঠেলে অফিসে পৌঁছানোই যেখানে দুরূহ, যেখানে সকালের খাবার খাওয়াই ঠিকমতো হয়ে ওঠে না, সেখানে দুপুরে বাসার তৈরি খাবার খাওয়ার এমন আশা করাটা একটু বেশি চাওয়া বৈ কি! এ সমস্যার সমাধানে ১৩০ বছর আগে শুরু হয়েছিল ‘ডাব্বাওয়ালা’র যাত্রা। মুম্বাইয়ের ব্যস্ততম শহরে এখনো তাদের দেখা মেলে। খাবার পৌঁছে দেওয়ার পুরো এই পদ্ধতিটি আজকের এই প্রযুক্তির যুগেও চলছে কোনো ধরনের প্রযুক্তির সহযোগিতা ছাড়াই।

যেভাবে কাজ চলে

ডাব্বাওয়ালার কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন ৫০০০ মানুষ। প্রতিদিন ভারতে দুই লাখেরও বেশি ডাব্বা (টিফিন বক্স) আনা-নেওয়া করা হয়। এই খাবার সময়মতো অফিসে পৌঁছানোর কাজগুলো যে মানুষরা করেন, তারা বেশির ভাগই অশিক্ষিত। কেউ কেউ হয়তো অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। শুধু একটা চেইন মেনে এই কাজ সবাই মিলে করছেন আজ ১৩০ বছর ধরে। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ নয়। সকাল ১০টার ভেতর বাড়িতে মা অথবা স্ত্রীরা খাবার বানিয়ে বক্সে ভরে রাখেন। এরপরই শুরু হয় ডাব্বাওয়ালাদের কাজ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা টিফিন বক্স নিয়ে আসেন। আধা ঘণ্টার ভেতর সব বক্স সাইকেলের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক পার হয়ে তারা রওনা হন কাছের রেলস্টেশনে। প্রতিটি বক্সে আলাদা আলাদা চিহ্ন আর রং লাগানো থাকে। যেটি দেখলে বোঝা যায় কোন বক্স কোন এলাকায়, কোন অফিসে আর কার কাছে যাচ্ছে। যে এলাকায় এই খাবার যাবে সেখানকার ট্রেনে বক্সগুলো উঠিয়ে দেওয়া হয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সেখানে উপস্থিত ডাব্বাওয়ালারা বক্সগুলো সংগ্রহ করে নেন। এত বড় একটি কাজে কখনো কারও দেরি হয় না। সময় পার হওয়ার পর খাবার পৌঁছেছে এমন ঘটনা ডাব্বাওয়ালার হিসাবের খাতায় খুব কম। শুধু খাবার পৌঁছানো নয়, খালি বক্সগুলো বাড়িতে সময়মতো ফিরেও আসে ঠিক একইভাবে।

এত বড় কাজে কখনো কি ভুল হয় না ডাব্বাওয়ালাদের? অবশ্যই হয়! তবে সে সংখ্যা আনুপাতিক হারে খুবই কম। হিসাবে প্রতি মাসে হয়তো একটা ভুল হয়। অর্থাৎ একজনের সঙ্গে অন্যজনের টিফিনবক্সের বদল হয়ে যায়। কাজটা এত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় দেখে যে কেউ বিস্মিত হবেন। বিস্ময়ের চূড়ান্ত মাত্রা সঙ্গে নিয়েই ডাব্বাওয়ালাদের কাজ নিজ চোখে দেখতে তাদের নিয়ে গবেষণা করেছিল হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল। ২০১০ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল তাদের দক্ষতাকে ‘সিক্স সিগমা’ রেটিং দেয়। এর অর্থ হচ্ছে প্রতি এক মিলিয়ন আদান-প্রদানে তাদের ভুলের সংখ্যা ৩ দশমিক ৪-এরও কম। প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ গ্রাহককে খাবার পৌঁছে দেওয়া এই সার্ভিসে খাবার পৌঁছানোতে দেরি অথবা বক্স হারানোর সংখ্যা বছরে সব মিলিয়ে মাত্র ৪০০। ফেডএক্সে তাদের নিয়ে একটি রিপোর্টও করা হয়। বিশ্বখ্যাত ডেলিভারি কোম্পানি আমাজন পর্যন্ত ডাব্বাওয়ালাদের কাজ সম্পর্কে জানতে ছুটে এসেছিল মুম্বাইয়ে। তাদের সঙ্গে একটা পুরো দিন কাটিয়েছেন বিখ্যাত ব্যবসায়ী রিচার্ড ব্রানসনও।

ডাব্বাওয়ালার হাতে একবার খাবার তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন বাড়ির মানুষও। তারা জানেন, যেভাবেই হোক দুপুরবেলা সময়মতো অফিসের টেবিলে খাবার পৌঁছে যাবে। ডাব্বাওয়ালা নিয়ে বিশ্বস্ততার জায়গা এখানেই। ইভেন্ট অর্গানাইজার হিসেবে নিজে কাজ করছেন রাশমিকা শাহ। স্বামী মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জে কর্মরত। তার খাবার সময়মতো পৌঁছে দেন ডাব্বাওয়ালা শিবাজী সাওয়ান্ত। রাশমিকা বলেন, ‘আমরা অ্যাপস পছন্দ করি না। এ কাজের জন্য আমরা যাকে নিয়োগ দিয়েছি তাকে আমরা অনেক দিন ধরে চিনি। আমরা জানি সে তার কাজ নিখুঁতভাবেই করবে।’ মুম্বাই ডাব্বাওয়ালার কো-অর্ডিনেটর সুবোধ সাঙ্গাল বলেন, ‘অনেকে ভাবে আমরা হয়তো অফিসে শুধু বড় কর্মকর্তাদের খাবার পৌঁছে দিই। সত্যিটা হচ্ছে, একজন সিকিউরিটি গার্ড থেকে শুরু করে সিইও পর্যন্ত সবাই আমাদের গ্রাহক।’

‘এই কাজে সবচেয়ে বেশি লক্ষ রাখতে হয় সময়ের দিকে। লাঞ্চের সব বক্স দুপুর ১টার মধ্যে অবশ্যই সব ক্লায়েন্টের হাতে পৌঁছাতে হয়। যদি কোনো একটি জায়গায় সময়মতো ডেলিভারি না হয়, তাহলে পুরো শহরে ডেলিভারি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়ে যাবে। রাস্তার মানুষ, ট্রাফিক কোনো কিছুই ডাব্বাওয়ালাদের জন্য বাধা নয়। লোকে ডাব্বাওয়ালাদের দেখলে তাদের জন্য রাস্তা ছেড়ে দেয়’Ñ বলছিলেন সাঙ্গাল। এখানে সময়ের সঙ্গে সবাইকে চলতে হয়। ডেলিভারি ১টার মধ্যে হলেও ডাব্বাওয়ালাকে ১২টা থেকেই খেয়াল রাখতে হয়। যেন কোনো ধরনের ভুল না হয়। প্রতি এলাকাতেই কয়েকজন করে ডাব্বাওয়ালা উপস্থিত থাকে সব সময়। যদি কোনো কারণে একজনের দেরি হয়, তাহলে যেন অন্যজন ডেলিভারি দিতে পারে। এত বাঁধাধরা সময়ের মধ্যে কাজ করেও ডাব্বাওয়ালারা কখনো ক্লান্ত হন না। সব সময় তাদের মুখে হাসি লেগে থাকে। ডাব্বা গোছাতে গোছাতে নিজেদের ভেতর গল্প, খুনসুটি সব সময় চলতেই থাকে। যতই সময় কাছে আসতে থাকে তত তাদের মধ্যে কাজের তাড়া বাড়তে থাকে। ঠিক ১২টা ৪৫ মিনিটে অফিস ভবনের এক কর্নারে সাইকেল রেখে দ্রুত চিৎকার করতে করতে ওপরে উঠে যাবে একেকজন ডাব্বাওয়ালা। প্রতি ডাব্বাওয়ালাই সে সময় চিন্তিত থাকে। সবার অফিসে যে লিফট থাকে এমন নয়। হেঁটে ছয়-সাত বা তার চেয়েও ওপরতলার অফিসেও খাবার পৌঁছে দেন তারা। যাদের ভাগ্য কিছুটা সু-প্রসন্ন তারা হয়তো লিফটের দেখা পান। ঠিক একইভাবে বিকেলে লাঞ্চবক্স ফিরিয়ে আনার সময় এভাবেই তাদের যেতে হয়।

এত মানুষের কাজ সুশৃঙ্খলভাবে করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাঙ্গাল বলেন, ‘তাদের এই কাজের হিসাব রাখা সত্যিই বেশ কঠিন। মাঝেমধ্যে এক গ্রুপের সঙ্গে কথা বলতে বলতে যদি অন্য গ্রুপে চলে যাই, ফিরে এসে দেখি আগেরজন চলে গেছে। গ্রাহককে সেবা দেওয়ার জন্য তাদের নিজেদের সময় খুব বাধা। যদি সকালে কোনো বাড়িতে দু-তিন দিনের বেশি দিন খাবার দিতে দেরি হয়, তবে সেখানের খাবার আর নেওয়া হয় না।’ প্রতি ডাব্বাওয়ালার বক্স সংগ্রহ করার একটি নির্দিষ্ট এলাকা আছে। কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠেই তারা খালি পায়ে অথবা সাইকেল চালিয়ে ৩০টি ডাব্বা সংগ্রহ করেন। স্থানীয় অফিসে অথবা রেলওয়ে স্টেশনে নির্দিষ্ট এলাকা অনুযায়ী কোড দেখে এগুলো আলাদা করা হয়। পুরো শহর থেকে আসা ডাব্বাগুলো নিজ নিজ এলাকায় চলে যায়। এরপর সেখানে গিয়ে আরও একবার ভাগ হয়ে যায় বিভিন্ন অফিস, বিজনেস সেন্টার, স্কুল-কলেজ, কোর্ট, ব্যাংকে যাওয়ার জন্য। সাইকেলে অথবা হেঁটে ডাব্বাওয়ালারা চলে যান। প্রতি বক্সের গায়ে সাংকেতিক কিছু চিহ্ন দেওয়া থাকে যেগুলো বুঝতে পারেন শুধু ডাব্বাওয়ালারাই। এত বড় একটি কাজে কখনো কারও দেরি হয় না।

এই যে মাসজুড়ে অফিসে বসেই বাসার তৈরি খাবারের স্বাদ পাওয়াÑ এর জন্য খরচ কি তাহলে খুব বেশি? একদম নয়! মাস জুড়ে জনপ্রতি হয়তো সর্বোচ্চ ৫০০-৮০০ টাকা খরচ হয়। তাও দূরত্ব বুঝে। হিসাব করতে গেলে বলতে হয়, একবেলা স্যান্ডউইচ খাওয়ার তুলনায় এক মাস বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসা সহজ! ডাব্বাওয়ালাদের প্রতি মাসে আয় ১২০০০ টাকার মতো। এই বেতন একজন অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষের জন্য বেশ অনেক টাকাই বলতে হবে। তবে অর্থের পাশাপাশি তাদের সম্মান অনেক জরুরি। মুম্বাই শহরে ডাব্বাওয়ালাদের আলাদা সম্মান আছে। বিভিন্ন সংস্থা থেকে তাদের সন্তানরা বৃত্তিও পায়। এখানে সমবায় হিসেবে এ কাজের জন্য সবাই সমান অংশীদার। কাউকে সালাম দিয়ে স্যার বলে ডাকা বা আলাদা সম্মান দিয়ে স্যার বলে ডাকার নিয়ম নেই। এই কাজের প্রতি তাদের ভক্তির আরও একটি কারণ আছে। বেশির ভাগ ডাব্বাওয়ালাই ‘ভাকারি সম্প্রদায়’ থেকে আসা, যারা হিন্দুদের ভগবান ভিথালার পূজা করে। ভিথালার শিক্ষা হচ্ছে, খাবার দেওয়া হচ্ছে সবচেয়ে মহৎ দান। ডাব্বাওয়ালারা বিশ্বাস করেন, নিজেদের রুটি রোজগারের জন্য তারা আত্মিকভাবে এ কাজ করেই মহৎ সেবা করে যাচ্ছেন। ডাব্বাওয়ালা হতে হলে তাদের কিছু জিনিস নিজ উদ্যোগে গুছিয়ে নিতে হয়। যেমন দুটি সাইকেল, টিফিনবক্স নেওয়ার জন্য একটি কাঠের ক্রেট, সাদা কুর্তা-পাজামা ও সাদা গান্ধী টুপি।

কীভাবে শুরু হয়েছিল

ডাব্বাওয়ালার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৯০ সালে, মহাদেব হাভাজি বাচ্চে নামে একজন পারসি ব্যাংকারের হাত ধরে। সে সময় নিছক প্রয়োজনীয়তা থেকেই গড়ে উঠেছিল এই সার্ভিস। প্রচুর অভিবাসী যখন বিভিন্ন সম্প্রদায় থেকে বিশাল এই শহরে এসে কাজে নিযুক্ত হলেন, তখন ফাস্ট ফুডের দোকান বা অফিস ক্যান্টিনও সেভাবে চালু ছিল না। সকালে বাড়ি থেকে খাবার খেয়ে বের হয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল-সন্ধ্যা অবধি না খেয়েই থাকতে হতো অনেককে। দুপুরে অফিসে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় দিন দিন অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবে কাজেও ব্যাঘাত ঘটছিল।

এদিকে গ্রাম থেকে কৃষিকাজ করা অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষরাও কাজের সন্ধানে ঘুরছিল। কেউ কেউ হয়তো ব্রিটিশ বাড়িগুলোতে কাজ পেত, কিন্তু শারীরিক পরিশ্রমের তুলনার যা পেত তার মূল্য ছিল খুবই কম। খাবার না আনতে পারা এবং কাজ খুঁজে না পাওয়া এই দুই দলকে একত্র করেন মহাদেব। সারা দিনে হাজারো কাজের ভিড়ে মানুষের নির্ভাবনায় তৃপ্তিভরে খাবারের জন্য ১০০ জন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন ‘ডাব্বাওয়ালা’র। তারা সবাই বাড়ি থেকে খাবার এনে অফিসে অফিসে পৌঁছে দিতেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ডাব্বাওয়ালাকে। সেদিনের সেই ১০০ ডাব্বাওয়ালার সংখ্যা আজ পাঁচ হাজারেরও বেশি। পৌঁছানো খাবারের সংখ্যা দুই লাখের বেশি। ১৯৩০ সালে অনানুষ্ঠানিকভাবে মহাদেব এই ডাব্বাওয়ালাদের একত্রীকরণের চেষ্টা করেন। পরে ১৯৫৬ সালে ‘নূতন মুম্বাই টিফিন বক্স সাপ্লায়ারস ট্রাস্ট’ নামে একটি চ্যারিটেবল ট্রাস্ট হিসেবে মর্যাদা পায়। ১৯৬৮ সালে নথিভুক্ত হয় ‘মুম্বাই টিফিন বক্স সাপ্লায়ারস অ্যাসোসিয়েশন’।

স্টার্ট-আপগুলো কি ডাব্বাওয়ালার জন্য হুমকি হতে পারে?

১৩০ বছর ধরে নিরলসভাবে একটা প্রতিষ্ঠান চলে আসছে। সে সময় হয়তো প্রযুক্তির ছোঁয়া এতটা ছিল না। কিন্তু বর্তমান যুগ ভিন্ন। অ্যাপ নিয়ে আসছে নতুন নতুন অনেক কোম্পানি। ডাব্বাওয়ালারা কি পারবেন তাদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জে টিকে থাকতে? আমেরিকার একটি স্টার্ট-আপ কোম্পানির পার্টনার পঙ্কজ জেইনের মতে, ‘ভারতে এ মুহূর্তে প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা খাবার ডেলিভারি নিয়ে নতুন অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে এদের জন্য সেগুলো খুব বড় কোনো হুমকি হবে না। এই সেক্টরটি এখনো চলছে। যদিও বেশ কিছু কোম্পানি যে এমন কিছু করার চেষ্টা করেনি, সেটা অস্বীকার করলে ভুল হবে। চাকচিক্যযুক্ত অ্যাপ আর প্রচুর ডিসকাউন্ট দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে মার্কেটে শেয়ার বাড়ানোর জন্য, ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য। কেউ টিকে গেছে, বেশির ভাগই টিকেনি। আমার মতে, তাদের এই ডাব্বাওয়ালাদের কাছ থেকে ব্যবসার কারিগরি শিখে নেওয়া উচিত। সম্ভবত ডাব্বাওয়ালাদের মতো ফুড ডেলিভারি দ্রুত কোনো অ্যাপে চলেও আসতে পারে।’ ব্যাঙ্গালুরুর ফুড ডেলিভারি কোম্পানি রানারের প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও মোহিত কুমার বলেন, খাবার ডেলিভারি করতে গিয়ে আমরা বুঝেছি গুগল ম্যাপে প্রতিটি রাস্তার, প্রতিটি গলির সন্ধান সঠিকভাবে পাওয়া যায় না। কিন্তু যারা যে এলাকায় অনেক বছর ধরে আছেন, তারা সবকিছু নির্ভুলভাবে চেনেন। এদিক দিয়ে ডাব্বাওয়ালা সফল।’ রানার চেষ্টা করছে ব্যাংঙ্গালুরুর বড় অফিসগুলোতে এই লাঞ্চ সার্ভিস চালু করতে। কুমারের মতে, ডাব্বাওয়ালাদের এখন কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত। স্থানীয়দের জ্ঞান, ম্যাপ প্রযুক্তি তাদের গ্রাহকদের কাছে আরও দ্রুত পৌঁছাতে সাহায্য করবে। কুমার মুম্বাইয়ে তাদের সার্ভিস লঞ্চ করার আগে ডাব্বাওয়ালার সঙ্গে অংশীদারে যাওয়া যায় কি না তা নিয়ে ভাবছেন।

ডাব্বাওয়ালা এ মুহূর্তে প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করবে কি নাÑ তা নিয়ে দ্বিধা প্রকাশ করেন ম্যানেজমেন্ট টপিকের মোটিভেশনাল স্পিকার পাবন আগারওয়াল। তিনি ডাব্বাওয়ালা নেটওয়ার্কের ওপর পিএইচডি করেছেন এবং বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কীভাবে প্রতিষ্ঠানের উন্নতি করা যায়, তা নিয়ে বক্তব্য দেন। আগারওয়াল বলেন, ‘অনেক ডাব্বাওয়ালার বয়স ৫০-এর ওপরে এবং তাদের কোনো অবসরের বয়স নেই। আমার ধারণা এটি আরও কিছুদিন সময় নেবে। তাদের এই কম প্রযুক্তির বিষয়টিই আসলে তাদের শক্তি। অন্যান্য ডিজিটাল স্টার্ট-আপের চেয়ে তাদের সার্ভিস একদম আলাদা। আপনি অনলাইনে ঘরে বানানো খাবারের অর্ডার দেন না। আর মুম্বাইয়ের ব্যস্ততম সড়কে গাড়ি বা মোটরসাইকেলের চেয়ে সাইকেল, ট্রেন আগে চলে। মোটরসাইকেলে থাকলে ট্রাফিকের অনেক নিয়ম মানতে হয়। সেদিক থেকে তারা বেশ স্বাধীন।’

ডাব্বাওয়ালারা নতুন প্রযুক্তিকে ভয় পায় না। সাঙ্গালও বলেন, ব্যবসায় পরিবর্তন আনার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। এ ছাড়া তিনিও বিশ্বাস করেন, আত্মিক যোগাযোগের ওপর ডাব্বাওয়ালাদের অগাধ বিশ্বাস সব সময় নতুন দিশা দেখাবেই। নতুন কোম্পানি হয়তো তাদের কাস্টমারকে নতুন অফার দিতে পারে কিন্তু এটা শুধু মার্কেট ধরার জন্য। ডাব্বাওয়ালারা মার্কেট ধরে রাখা বোঝে না, তারা শুধু বোঝে গ্রাহককে খাবার দেওয়া মানে ভগবানের সেবা করা।