গোপালগঞ্জে পুলিশের পিটুনিতে মৃত্যুর রফা ৫ লাখ টাকায়!

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শামীম হাসানের হাঁটুর আঘাতে মেরুদণ্ড ভেঙে নিখিল তালুকদার (৩২) নামের এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ রফা হয়েছে পাঁচ লাখ টাকায়। গতকাল শনিবার কোটালীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সালিশে এর মীমাংসা করা হয়। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, নিখিল হত্যার যে অভিযোগ উঠেছে, তা তদন্তে তিন সদস্যের বিভাগীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ওই সালিশে উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ বিশ্বাস, সাবেক উপজেলার চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার, রামশীল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খোকন বালা ও কোটালীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ লুৎফর রহমানসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

নিহত নিখিলের পরিবার ও সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিখিলের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী ইতি তালুকদার ও ছোট ভাই মন্টু তালুকদারকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই ঘটনা মীমাংসা করা হয়।

নিহত নিখিলের ভাই শংকর তালুকদার বলেন, যে যাওয়ার সে তো চলেই গেছে, তাই পরিবারের কথা ভেবে যাতে পরিবারের লোকগুলো ভালো থাকতে পারে সেজন্য মীমাংসার মধ্যে যাওয়া। আমাদের হাতে দুই লাখ টাকা দিয়েছে, বাকি তিন লাখ আগামী পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে দেবে। পরিবারের দুই জনকে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কোটালীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ লুৎফর রহমান বলেন, আজ (গতকাল) উপজলায় নিখিলের স্মরণে শোকসভার আয়োজন করা হয়েছিল। নিখিল হত্যার যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিতে রয়েছেন পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত আসলাম খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর ও কোটালীপাড়া সার্কেল) মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ও আমিনুল ইসলাম।

তদন্ত কমিটির সদস্য আসলাম খান বলেন, এই অভিযোগের ঘটনা মীমাংসা হওয়ার বিষয়ে আমি জানি না। আমাদের বিভাগীয় তদন্ত টিম গঠন হয়েছে, যদি সে (শামীম) দোষী হয়, তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।

রামশীল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খোকন বালা বলেন, আমি ওই সভায় উপস্থিত ছিলাম। সভায় সিদ্ধান্ত হয় নিহত নিখিলের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী ও ছোট ভাইকে চাকরি দেওয়া হবে। এ সময় উপজেলার চেয়ারম্যান (সাবেক ও বর্তমান), পৌর মেয়র (সাবেক ও বর্তমান) উপস্থিত ছিলেন। আমি লোকমুখে নিখিলের নিহতের ব্যাপারে যে কথা শুনেছি, সেটা যদি সত্য হয় তাহলে ওই পুলিশের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। তা না হলে আইনের শাসন থাকে না। 

কোটালীপাড়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যার মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, অসহায় পরিবারের দিকে তাকিয়ে আমরা মীমাংসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তার পরিবারের হাতে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন লাখ টাকা কয়েকদিনের মধ্যে দেওয়া হবে। এছাড়া তাদের পরিবারে দুই সদস্যের চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।

এদিকে এই সালিশের বিষয়ে জানতে কোটালীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল বিশ্বাসকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

গত ২ জুন (মঙ্গলবার) বিকেলে রামশীল বাজারের ব্রিজের পূর্ব-পাশে পেশায় কৃষক নিখিলসহ এলাকার চারজন লোক বসে তাস খেলছিল। ওই সময় কোটালীপাড়া থানার এএসআই শামীম হাসান একজন ভ্যানচালক ও একজন যুবককে নিয়ে সেখানে যান। আড়াল থেকে তিনি মুঠোফোনে তাস খেলার দৃশ্য ধারণ করেন। তা দেখে খেলা রেখে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে নিখিল ও অন্যরা। এ সময় অন্য তিন জন পালাতে পারলেও নিখিলকে ধরে মারপিট করতে থাকেন শামীম। এ সময় হাঁটু দিয়ে পিঠে আঘাত করলে নিখিলের মেরুদণ্ড তিন খ- হয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। আহত অবস্থায় স্বজনরা নিখিলকে প্রথমে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরে তাকে চিকিৎসক ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে পাঠালে সেখানে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় গত শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।