জোনভিত্তিক লকডাউনের সুপারিশ এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে। রেড, ইয়েলো ও গ্রিন এই তিন জোনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম এবং এটি বাস্তবায়নের সুপারিশসহ প্রস্তাবনা গতকাল রবিবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে। করোনা সংক্রমণ বেশি এমন এলাকার প্রশাসনকে লকডাউনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে।
জনপ্রশাসন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই গতকাল রবিবার থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার দুই এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে রেড জোনগুলোতে ব্যাপকভাবে লকডাউন শুরু হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এবং করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি এবং স্বাস্থ্যবিদদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পর জোনভিত্তিক লকডাউনের প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হয়। এখন এটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কীভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হবে তার গাইডলাইন ঠিক করে দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, গাজীপুর, নরসিংদী আর নারায়ণগঞ্জে পাইলটিং ভিত্তিতে লকডাউনের কাজ করা হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পল্টন, কলাবাগান, গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর, গুলশান, রমনা, মতিঝিল, তেজগাঁও, বৃহস্পতিবার থেকে ‘রেড জোনে’ কড়া লকডাউন শাহজাহানপুর ও হাজারীবাগ এই ১০ এলাকায় লকডাউনের ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবনা রয়েছে। এদিকে গত শনিবার রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে জোনভিত্তিক মানচিত্র প্রকাশের পর থেকেই দেশব্যাপী বিভিন্ন এলাকায় অস্থিরতা দেখা দেয়। ম্যাপ দেখে এলাকার লোকজন স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে যোগাযোগ শুরু করে। আলোচনায় আসে, দেশের ৫০টির মতো জেলায় লকডাউন শুরু হয়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিরা বিপাকে পড়েন। তারা একবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন। এ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিপ্তরের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি দেখা দেয়।
ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধে জোনভিত্তিক লকডাউনের এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলেন, দেশের এই সংকটপূর্ণ সময়ে যদি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয় তাহলে এর জন্য সবাইকে কঠিন বিপদের মুখোমুখি হতে হবে। তারা মনে করেন, যেভাবে করোনা শনাক্ত এবং মৃত্যুর হার বাড়ছে, এটাকে এখনই নিয়ন্ত্রণের দিকে নিতে হবে। এখন যে পরিস্থিতি রয়েছে যদি আর ঊর্ধ্বগতি না হয় তাহলেও আরও ৯০ দিন লাগবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে। তা ছাড়া আমাদের স্বাস্থ্যসেবা এখনই ভেঙে পড়েছে, ফলে মুক্তি হলো সংক্রমণের পথ আটকে দেওয়া। তাই যেকোনোভাবেই হোক জোনভিত্তিক লকডাউন পুরোপুরি সফল করতে হবে।
জানা গেছে, করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) তথ্য আপডেটসংক্রান্ত সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশের লকডাউন এলাকার তালিকা। ‘গ্রিন, ইয়েলো ও রেড জোন’ এই তিন ভাগে ভাগ করে তালিকা প্রকাশ করা হলেও এসব জোনের নাগরিকদের জন্য নতুন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশের ভূমিকা কী হবে, এ বিষয়েও কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। শনিবার ওয়েবসাইটটিতে সর্বশেষ আপডেট হিসেবে এই তালিকা দেখা যায়। করোনা প্রতিরোধ সহায়ক এই ওয়েবসাইটটি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), সরকারের এটুআই প্রকল্প, মন্ত্রিপরিষদ ও আইসিটি বিভাগের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জোনিংয়ের কোনো ঘোষণা না এলেও ওয়েবসাইটে দেশের তিনটি বিভাগ, ৫০টি জেলা ও ৪০০টি উপজেলাকে পুরোপুরি লকডাউন (রেড জোন বিবেচিত) দেখানো হয়েছে। আংশিক লকডাউন (ইয়েলো জোন বিবেচিত) দেখানো হয়েছে দেশের ৫টি বিভাগ, ১৩টি জেলা ও ১৯টি উপজেলাকে। আর লকডাউন নয় (গ্রিন জোন বিবেচিত) এমন জেলা দেখানো হচ্ছে ১টি এবং উপজেলা দেখানো হচ্ছে ৭৫টি। ঢাকা মহানগরীর ৩৮টি এলাকাকে আংশিক লকডাউন (ইয়েলো জোন বিবেচিত) হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে লকডাউন নয় (গ্রিন জোন বিবেচিত) বলে দেখানো হচ্ছে ১১টি এলাকাকে। ঢাকায় এখন পর্যন্ত পুরোপুরি লকডাউন (রেড জোন বিবেচিত) হিসেবে কোনো এলাকাকে দেখানো হচ্ছে না। তবে রেড জোন বা ইয়েলো জোনে নাগরিকদের জন্য কোনো ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি সরকারি এই ওয়েবসাইটে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) হাবিবুর রহমান খান তালিকা সম্পর্কে বলেন, ‘এ ধরনের একটি তালিকা প্রকাশ করার কথা ছিল। তবে এটা করা হয়েছে কি না, আমার কাছে কোনো আপডেট নেই। তাই এ বিষয়ে আমি এখনই মন্তব্য করতে পারব না। আমাকে তালিকা দেখে ও বুঝে মন্তব্য করতে হবে।’
মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ আপডেট করা তালিকা অনুসারে, বরিশাল বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও পিরোজপুর। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন ভোলা ও ঝালকাঠি। চট্টগ্রাম বিভাগে পুরোপুরি লকডাউন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ফেনী, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি।
ঢাকা বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইল। এই বিভাগে শুধু ঢাকা ও ফরিদপুর আংশিক লকডাউন। খুলনা বিভাগের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা, যশোর, খুলনা, মেহেরপুর, নড়াইল ও সাতক্ষীরা পুরোপুরি লকডাউন। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও মাগুরা। খুলনা বিভাগেই দেশের একমাত্র গ্রিন জোন চিহ্নিত জেলা ঝিনাইদহ, অর্থাৎ এটি লকডাউন নয়। রাজশাহী বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহী। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ। রংপুর বিভাগের আটটি জেলাই পুরোপুরি লকডাউন। জেলাগুলো হলো দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও।
সিলেট বিভাগের সব কটি জেলা পুরোপুরি লকডাউন। জেলাগুলো হলো হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও সিলেট। ময়মনসিংহ বিভাগের সব কটি জেলা পুরোপুরি লকডাউন। এ চারটি জেলা হলো জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর।
অন্যদিকে ওয়েবসাইটের তালিকায় ঢাকা মহানগরীর আংশিক লকডাউন বলে চিহ্নিত ৩৮টি এলাকা হলো আদাবর থানা, উত্তরা পূর্ব, উত্তরা পশ্চিম, ওয়ারী, কদমতলী, কলাবাগান, কাফরুল, কামরাঙ্গীরচর, কোতোয়ালি, খিলক্ষেত, গুলশান, গে-ারিয়া, চকবাজার, ডেমরা, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, দক্ষিণখান, দারুসসালাম, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, পল্টন মডেল, পল্লবী, বংশাল, বাড্ডা, বিমানবন্দর, ভাটারা, মিরপুর মডেল, মুগদা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, রমনা মডেল, লালবাগ, শাহআলী, শাহজাহানপুর, শেরেবাংলা নগর, সবুজবাগ, সূত্রাপুর ও হাজারীবাগ থানা এলাকা।
লকডাউন নয় বলে চিহ্নিত ১১টি এলাকা হলো উত্তরখান থানা, ক্যান্টনমেন্ট থানা, খিলগাঁও, তুরাগ, বনানী, ভাসানটেক, মতিঝিল, রামপুরা, রূপনগর, শাহবাগ ও শ্যামপুর থানা এলাকা।
আইইডিসিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, ঢাকা জেলায় ২০ হাজার ৭০৭ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে আক্রান্ত ১৯ হাজার ৩২৭ জন।
জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির একজন সদস্য বলেন, কোন পদ্ধতিতে, কোন বিধিনিষেধের আওতায় কোন এলাকা আসবে, সেটা নির্ধারিত এলাকার জনপ্রতিনিধিরা ঠিক করবেন। রেড জোন থেকে সবুজ বা সবুজ থেকে হলুদ এলাকায় মানুষের যাতায়াত কী হবে, সেটা কেন্দ্রীয়ভাবে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, রেড জোন মানেই সম্পূর্ণভাবে এসব এলাকা লকডাউন করে দেওয়া নয়। এসব এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার বা মেয়র যেভাবে এটা বাস্তবায়ন করলে সর্বোচ্চ সুবিধা পাবেন বলে মনে করবেন, সেভাবেই তারা এটি বাস্তবায়ন করবেন। এ জন্য সাপোর্টিং ম্যানেজমেন্ট যেমন খাবার, বাজার, ব্যাংকসহ প্রয়োজনীয় বিষয় মাথায় রেখে করতে হবে। কতটুকু ইউনিটে কোন ম্যাজার নেবে সেটা স্থানীয় প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে করা কমিটি ঠিক করবে। রেড জোন মানে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, কীভাবে নেওয়া হবে এগুলো ঠিক করার জন্য কমিটি গঠনের প্রস্তাবনাও রাখা হয়েছে। মুশতাক হোসেন বলেন, টোলারবাগ মডেল অনুসরণ করব। শুরুর দিকে টোলারবাগে লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যখন, তখন এভাবে মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকাকে রেড জোন ঘোষণা করে লকডাউন ঘোষণা করার পর তা কার্যকরভাবে পালন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় ও কমিউনিটি নেতৃত্বকে সংযুক্ত করতে হবে এমন সুপারিশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষজন ঠিকমতো কোয়ারেন্টাইন মানছে কি না, তা নিশ্চিত করতে এবং কোয়ারেন্টাইনে থাকাদের কাছে খাবার, ওষুধ পৌঁছে দিতে স্থানীয় ভলান্টিয়ার, সমাজকল্যাণ সমিতি, হাউজিং সমিতির সদস্যদের যুক্ত করা হবে। কোয়ারেন্টাইন করা ব্যক্তিদের তালিকা করা হবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ওষুধের স্থানীয় দোকানের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের বাসায় খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হবে। প্রথম দিকে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজে প্রতি জেলায় কমিটি ছিল, ঢাকায় বিভিন্ন এলাকায় সে রকম কমিটি তৈরি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই স্বাস্থ্যবিদ জানান, সিটি করপোরেশনের মেয়রের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় কমিটি থাকবে, আবার ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটিও থাকবে। আবার জোনভিত্তিক কমিটিও করা হতে পারে। বিভিন্ন জেলার কমিটিগুলোর আদলে তৈরি হলেও এসব কমিটিতে কীভাবে এনজিওসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করা সংস্থাগুলোকে সংযুক্ত করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা চলছে। আর যারা এই পুরো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলেও জানান মুশতাক হোসেন।
প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জে প্রাথমিকভাবে অধিক সংক্রমণ থাকার কারণে তিনটি এলাকাকে রেড জোন ঘোষণা করে সেখানে লকডাউন ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শক্রমে জেলা প্রশাসক এ লকডাউন ঘোষণা করেন।
গতকাল দুপুরে শহরের আমলাপাড়া, জামতলা ও ফতুল্লার রূপায়ণ টাউনকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে রেড জোন ও লকডাউন ঘোষণা করা হয়।