মাঠ প্রশাসনের কান্ডে বিব্রত সরকার

ফসল না ফলালে জমি কেড়ে নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি

কয়েকজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) চাষযোগ্য জমি ফেলে রাখলে তা সরকার নিয়ে নেবে বলে যে প্রচার চালিয়েছেন তাতে সরকারের কোনো সাড়া নেই। এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মাঠ প্রশাসনের এ ধরনের সিদ্ধান্তে সরকার বিব্রত বলে জানা গেছে।

কুষ্টিয়ার ডিসি ওই জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি চিঠি পাঠিয়েছেন গত মাসে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, যেসব ভূমি মালিক তাদের জমি অনাবাদি ফেলে রাখছেন তাদের জমি ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত করার আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ কেউ যদি তার কৃষিজমিতে চাষাবাদ না করেন, তাহলে সেই জমি সরকার নিয়ে নেবে।

একই ধরনের একটি ‘গণবিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশ করেছেন পটুয়াখালীর ডিসিও।

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনটি কার্যকর আছে। কিন্তু ৯২ (১) ধারাটি সরকার কার্যকর করার কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না জানতে চাইলে ভূমি সচিব মো. মাছুদুর রহমান পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন কোনো সিদ্ধান্ত ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হয়নি। দেশে বহু আইন আছে। সেসব আইন কার্যকর থাকলেও সংশ্লিষ্ট আইনের অনেক ধারা প্রয়োগ করা হয় না। বৃহত্তর পরিসরে অনেক আইন করা হয়। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে এ বিবেচনায় অনেক কিছুই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ধারাটি সেরকম একটি। এটা প্রয়োগ করা হলে ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেবে। দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।’

কয়েক ডিসির এ সংক্রান্ত নির্দেশনার কারণ কী জানতে চাইলে ভূমি সচিব বলেন, এটা হতে পারে বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে তারা নির্দেশনা দিয়েছেন। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে আমাদের আরও বেশি ফসল ফলাতে হবে। সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে কোনো জমি যেন পতিত না থাকে। এ কারণেই হয়তো মাঠ প্রশাসন থেকে এ ধরনের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

সরকারের মাঠ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিশাখা হচ্ছে মাঠ প্রশাসন। একজন অতিরিক্ত সচিব মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বে রয়েছেন। এ ধরনের নির্দেশনার কথা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগও জানে না। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব আ. গাফ্ফার খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো নির্দেশনা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা হয়নি।’

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে বলা হয়েছে, কেউ জমি পতিত ফেলে রাখতে পারবে না। পতিত রাখলে তা সরকার অধিগ্রহণ করতে পারবে।

সম্প্রতি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নিয়মিত কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ধরনের অনুষ্ঠানে তিনি কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের নির্দেশনাও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাকে আমলে নিয়ে কয়েকজন ডিসি নিজ এলাকায় গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন বলে জানা গেছে।

মাঠ প্রশাসনের এ ধরনের অগ্রিম পদক্ষেপে নীতিনির্ধারকরা বিব্রত হয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা বলেছেন, আমরাও মাঠে ছিলাম। এ ধরনের কোনো অগ্রিম কাজ করতে যাইনি। মানুষের জমি কেড়ে নেওয়া যায় না। আইন থাকুক আর যাই থাকুক। যারা জমি ফেলে রাখে তাদের বোঝাতে হবে। করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশে^র খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে। আমাদের কোনো জমি ফেলে রাখা যাবে না। সেটা না করে ভয় দেখানোর কাজে নেমে পড়েছেন ডিসিরা। মাঠ প্রশাসন তিলকে তাল করে ফেলে। করোনাভাইরাস আসার পর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সবাইকে ঘরে অবস্থান করার নির্দেশনা দেয় সরকার। এই নির্দেশনা পেয়ে বিভিন্ন স্থানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার ভূমি (এসি ল্যান্ড) সাধারণ মানুষদের হয়রানি শুরু করল। যশোরে বয়োজ্যেষ্ঠ দুই ব্যক্তিকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। অথচ সরকার এ ধরনের কোনো নির্দেশনা দেয়নি।

এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় গত ২০ মে ১৪ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে তাদের কোনো জমি পতিত ফেলে রাখা হয়েছে কি না তা তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটিতে ৮ জন অতিরিক্ত সচিব ও ৬ জন যুগ্ম সচিব রয়েছে। কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, বেশি ফসল উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো জমি যেন পতিত না থাকে সে বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা দেখভাল করবেন তারা।

বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার অবশ্যই দেশের সব কৃষিজমি যেন চাষের আওতায় আসে সেই উদ্যোগ নেবে। কিন্তু কৃষিকাজ করে যদি লোকসান হয়, তাহলে জমির মালিক কেন জমিতে চাষ করবে। সরকার তো লোকসান দিতে জমির মালিককে বাধ্য করতে পারে না। আগে উৎপাদন খরচ কমান, চাষে কৃষককে সরাসরি ভর্তুকি দিন, পরে কৃষককে সব জমি চাষের আওতায় আনতে বাধ্য করুন। কিন্তু সরকার সে পথে না হেঁটে সস্তায় বাজিমাত করার জন্য ‘চাষের জমি ফেলে রাখলে অধিগ্রহণ করা হবে’ এ বক্তব্য দিচ্ছে। এ নির্দেশনা প্রত্যাহার করা উচিত।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেবে দেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৮৬ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি আবাদযোগ্য হলেও পতিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ খাসজমিও পতিত অবস্থায় রয়েছে।

কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো জমির মালিক যেন কৃষি জমি ফেলে না রাখেন সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের উদ্বুদ্ধ করি। জেলা পর্যায়ে একজন কর্মকর্তা আছেন, যিনি এ বিষয়গুলো দেখেন। কেন্দ্রীয়ভাবেও একটি তদারকি টিম গঠন করা হয়েছে। গ্রামে যারা বাস করেন তাদের আমরা উদ্বুদ্ধ করি যেন ঘরের পাশের জায়গাটুকুও তারা ফেলে না রাখেন। সেখানে যেন সবজির আবাদ করা হয়। আমাদের জমি কম। এ কারণে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমন ধান ছাড়া আমরা অন্য সব ধানের চাষযোগ্য জমি বাড়াতে পারি। পতিত জমি আবাদের আওতায় আনার জন্য আমরা নানা রকম পদক্ষেপ নিয়েছি। আউশে প্রণোদনা দেওয়া হয়। আউশের উন্নত জাতও আবিষ্কার করা হয়েছে।