সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চলতি সপ্তাহেই শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। আজ সোমবার এই বিষয়ে ঘোষণা দেবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ফ্লাইট চালানোর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। শর্তের ব্যত্যয় ঘটলে ফ্লাইট বাতিল করারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হবে। ফ্লাইট চালানোর সময় যাত্রী ও বিমান কর্র্তৃপক্ষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। ফলে বদলে যাবে আকাশপথের রুট। সামজিক দূরত্ব মেনেই যাত্রীদের আসন বণ্টন করবে কর্র্তৃপক্ষ। এই ক্ষেত্রে যাত্রীদের ভাড়াও বেড়ে যাবে। আবার যাত্রীদের থাকতে হবে করোনার নেগেটিভ সার্টিফিকেট। প্রথম ফ্লাইট চলবে লন্ডন ও কাতার রুটে। তারপর চলবে বিশ্বের সব রুটেই ফ্লাইট। গত ১ জুন থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে। এই ক্ষেত্রে নিজেদের সফল মনে করায় বেবিচক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তাছাড়া ফ্লাইট চলাচল শুরু করতে বেবিচকের ওপর চাপ ছিল।
এই প্রসঙ্গে বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজ (গতকাল) একটি মিটিং হয়েছে। আশা করি চলতি সপ্তাহেই ফ্লাইট চালু করতে পারব। তিনি বলেন, ফ্লাইট চালুর ব্যাপারে আজ বিস্তারিত জানানো হবে। ইতিমধ্যে সীমিত আকারে পহেলা জুন থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচল শুরু করেছে। এতে আমরা সফলতা পাচ্ছি। ফ্লাইট চলাচলের ব্যাপারে বেশ কিছু শর্ত থাকবে। শর্ত না মানলে ফ্লাইট চলতে দেওয়া হবে না।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাজ্য ও কাতারে ফ্লাইট চলাচলের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে। দুই দেশের দুটি এভিয়েশন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। যাত্রীদের করোনার নেগেটিভ রিপোর্ট থাকলেই ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হবে। তাছাড়া কাতার এয়ারওয়েজ দোহা থেকে ঢাকায় ফ্লাইট পরিচালনা করতে চাচ্ছে। তবে কাতারে কোনো বাংলাদেশি যাত্রী যেতে পারবেন না। করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে থাকায় সেখানে বাংলাদেশিদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ট্রানজিট যাত্রীরা কাতার হয়ে অন্য দেশে যেতে পারবেন। পর্যায়ক্রমে সব রুটেই সরাসরি ফ্লাইট চালু হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গত আড়াই মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অসংখ্য চার্টার্ড ও বিশেষ ফ্লাইট ঢাকায় চলাচল করেছে। একই সঙ্গে কার্গো পণ্য ও ত্রাণসামগ্রী বহনকারী ফ্লাইটগুলোও নিয়মিত বাংলাদেশে চলাচল করছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে ২৯টি দেশে ফ্লাইট চলাচল করছে। প্রতিদিন গড়ে ২শ ফ্লাইট ওঠানামা করে শাহজালাল, ওসমানী ও শাহআমানত বিমানবন্দরে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, যশোর, সৈয়দপুর, রাজশাহী ও বরিশাল রুটে প্রতিদিন ১৪০টির মতো ফ্লাইট চলাচল হয়। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গত ২১ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, চীন, হংকং, থাইল্যান্ড ছাড়া সব দেশের সঙ্গে এবং অভ্যন্তরণীণ রুটে যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল বেবিচক। এরপর আরেকটি আদেশে চীন বাদে সব দেশের সঙ্গে ১৫ মে পর্যন্ত বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা সরকারি সাধারণ ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে ১৪ এপ্রিল, ৩০ এপ্রিল, ৭ মে, ১৬, ৩০ মে ও ১৫ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের জন্য বেবিচকের ওপর চাপও আছে।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের ক্ষেত্রে অনেক বিদেশি ও অনাবাসী বাংলাদেশি দেশে ফিরবেন। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখার বিষয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। করোনা তা-বে দুনিয়াব্যাপী বন্ধ রয়েছে ফ্লাইট চলাচল। বিগত তিন থেকে চারমাস ধরে বন্ধ থাকায় অনেক এয়ারলাইনস দেউলিয়ার পথে। ছাঁটাইয়ের ঢেউ লেগেছে এমিরেটসসহ দুনিয়ার শীর্ষ এয়ারলাইনসে। শুধু এমিরেটসই চলতি মাসে ৩০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। তাছাড়া ফ্লাইট চলাচল শুরু করতে আমাদের ওপর চাপ বাড়ছে। আজ (গতকাল) মন্ত্রণালয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে। মূলত ওই বৈঠকে ফ্লাইট চালানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জানা যায়, বাংলাদেশে লকডাউনের দীর্ঘ ছুটি থাকলেও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে আইকাও গাইড লাইন অনুযায়ী সীমিত আকারে ফ্লাইট চালুর সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত মাসে ঢাকায় হয়ে গেছে আইকাও-এর সঙ্গে যুক্ত ব্রিফিং। এতে করোনা পরিস্থিতির মাঝে পুনরায় বিমান চলাচলের বিষয়ে আলোচনা করেন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সিভিল এভিয়েশন খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা। দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী অনলাইনে এই সভায় করোনা পরিস্থিতিতে নেওয়া পদক্ষেপ, মোকাবিলা পদ্ধতি পরিস্থিতির উত্তরণ নিয়ে আলোচনা হয়। তাছাড়া করোনার কারণে বিশ্বের অন্যান্য বিমান সংস্থার মতো টার্কিশ এয়ারলাইনসও তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছিল। কিছুদিন আগে টার্কিশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, পুনরায় তারা তাদের ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করতে যাচ্ছে। ৪ জুন থেকে তাদের অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে। ১০ জুন থেকে তাদের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল শুরু করবে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট পরিচালনার জন্য টিকিট বিক্রি শুরু করবে সৌদি এয়ারলাইনস।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা বলেন, ফ্লাইট চালু হওয়ার পর কঠোর বিধিবিধান মানতে হবে যাত্রী ও বিমান সংস্থাসহ সবাইকে। ফ্লাইটে ওঠার আগে কোনো যাত্রীর করোনার নেগেটিভ সার্টিফিকেট থাকতে হবে। তাছাড়া শরীরে তাপমাত্রা ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা এর বেশি থাকলে তার যাত্রা বাতিল হয়ে যাবে। বিমানবন্দরের টার্মিনালে একাধিক ফ্লাইটের যাত্রীরা একসঙ্গে থাকতে পারবেন না। প্রতিটি ফ্লাইটে ওঠার আগে যাত্রীদের বোর্ডিং পাস নেওয়ার পর নির্ধারিত এলাকার মধ্যেই থাকতে হবে। সবাইকে মাস্ক ও গ্লাভস পরতে হবে। বিমানবন্দরে আসার আগে ও পরে মাস্ক ও গ্লাভস পরে আসতে হবে। টার্মিনালে প্রবেশের পর যাত্রীরা যে বিমানে করে যাবেন, তারাই নতুন গ্লাভস ও মাস্ক দেবে। এসব পরে ফ্লাইটে ওঠার সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে। বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। প্রত্যেক যাত্রীকে স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ফরম পূরণ করতে দেওয়া হবে। দূরের ফ্লাইটে খাবার দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে উড়োজাহাজের ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ যাত্রী প্রতিটি ফ্লাইটে থাকবেন। এর বেশি যাত্রী নেওয়া যাবে না। সার্জিক্যাল মাস্ক অথবা মানসম্মত মাস্ক, ক্যাপ প্রতিটি ফ্লাইটের ক্রুদের পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেবিন ক্রুদের এন-৯৫ মাস্ক, চশমা, রাবারের হ্যান্ড গ্লাভস ও ফেসিয়াল মাস্ক পরতেই হবে। হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক প্রতি ৪ ঘণ্টা পরপর বদলাতে হবে। তাদের ককপিটে প্রবেশ যতটা সম্ভব কমিয়ে ইন্টারকমে যোগাযোগ করতে হবে। যাত্রাবিরতিতে কেবিন ক্রুরা কোনো হোটেলে অবস্থান করলে ওই হোটেলের রুমেই খাবার খেতে হবে। প্রয়োজনে ওই হোটেলের ভেতরের রেস্টুরেন্টে খাবার খাবেন। হোটেলের বাইরে যেতে পারবেন না।
সুইজারল্যান্ড থেকে মাত্র ৩ জন বাংলাদেশি ফিরেছেন : সুইজারল্যান্ডে আটকে পড়া তিন বাংলাদেশিকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে এসেছে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট। এছাড়া কাতার থেকেও এসেছেন একদল বাংলাদেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশে অবস্থানরত আফগানিস্তানের ১২৩ নাগরিক দেশে ফিরে গেছেন। গতকাল শনিবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওঠানামা করে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকেও একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে আফগানিস্তনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া সৌদি আরবের জাভা এয়ারের একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে ওষুধ পাঠানো হয় ঢাকা থেকে।
জেনেভার বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যাত্রীরা যাতে ঢাকা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট দেখাতে পারেন সেজন্য সুইজারল্যান্ড ছাড়ার আগে তাদের প্রয়োজনীয় মেডিকেল টেস্ট করতে বলা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনার আলোকে জেনেভায় বাংলাদেশ দূতাবাস সুইজারল্যান্ডে আটকেপড়া বাংলাদেশিদের তথ্য চেয়ে দূতাবাসের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত মার্চের শেষে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ওই বিজ্ঞপ্তির ধারাবাহিকতায় দূতাবাস চারজন আটকেপড়া বাংলাদেশির তথ্য পায়। তাদের মধ্যে একজন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হলে এবং স্থগিত হয়ে থাকা ব্যবসায়িক কাজ শেষ করে দেশে ফিরবেন বলে দূতাবাসকে জানান। দেশে ফিরতে আগ্রহী বাকি তিনজনের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ফিরিয়ে নিতে কাতার এয়ারওয়েজের এই বিশেষ ফ্লাইটটির ব্যবস্থা করে।