ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা চায় চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো বাজেট প্রস্তাবনায় এ দাবি জানানো হয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের ট্যাক্স হলিডে প্রদান, শিল্প আমদানিকারকদের নিজস্ব জেটি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া, চট্টগ্রামের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে বৈষম্য কাটাতে দেশের সব শিল্পাঞ্চলের সড়কগুলোতে ওজন পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করা ও চট্টগ্রামে গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার নির্মাণের জন্য বিশেষ বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে চট্টগ্রামের স্বার্থ বিবেচনায় চেম্বারের পক্ষ থেকে এনবিআরের কাছে শুল্ক কর, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংক্রান্ত মোট ২৪৬ দফা প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। আশা করি, এবারও বাজেট প্রণয়নে চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রস্তাবনাগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
চেম্বার সূত্র জানায়, ২৪৬ দফা প্রস্তাবনার মধ্যে ১৫৭টি প্রস্তাবনা রয়েছে শুল্ক করে। এছাড়া আয়করে ৫৩ ও ভ্যাটে ৩৬টি প্রস্তাবনা রয়েছে।
প্রস্তাবনায় দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি ইত্যাদি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সরকার সময় সময় নীতিমালা পরিবর্তন করে থাকে। এসব কার্যক্রম টেকসই করার লক্ষ্যে নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রায়োগিক ও বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। কোনো ব্যবসা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই লাভজনক হওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পণ্য প্রদর্শন ও বিপণনে সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বিশেষ করে শিল্পকারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, প্রয়োজনীয় সেবা যেমনÑ বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ইত্যাদি সংযোগপ্রাপ্তি যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। এরপর প্রাথমিক ও পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু, মান যাচাই, মানোন্নয়নের ব্যবস্থা করে সঠিক পণ্য বাজারজাত করতে হয়। এই প্রক্রিয়াগুলো শেষ করার মাধ্যমে একটি শিল্প প্রকৃতপক্ষে উৎপাদন শুরু করতে পারে। উদ্যোক্তারা শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং দেশীয় পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে শিল্প স্থাপন করে থাকেন। এসব বিষয় বিবেচনাপূর্বক নীতিমালা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুল্ক করাদি থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যৌক্তিকভাবে অব্যাহতি প্রদান করা না হলে এসব উদ্যোগ কখনই লাভজনক বা টেকসই হওয়া সম্ভব নয়। তাই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ সংক্রান্ত নীতিমালা দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক জোন সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে বিভিন্ন কর প্রণোদনা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত সব কারখানাকে বেজা রপ্তানির ক্ষেত্রে ভ্যাট এবং শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা দিলেও স্থানীয়ভাবে বিক্রি বা ব্যবহারের জন্য পণ্যসামগ্রী ছাড়ের সময় শুল্ক এবং ভ্যাট দিতে হবে। চেম্বার মনে করে, এ সমস্ত পণ্য অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে স্থানীয়ভাবে বিক্রির জন্য ডেলিভারির সময় সরকারের রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়া স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে।
এ অবস্থা নিরসনে অর্থনৈতিক জোনে স্থাপিত সব শিল্প প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের ট্যাক্স হলিডে প্রদান, স্থানীয় বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ জোনে স্থাপিত শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং ট্যারিফ জোনে বিদ্যমান শিল্প প্রতিষ্ঠানের ওপর শুল্ক, কর, ভ্যাট আরোপ এবং সুবিধা প্রদানের বিষয়ে বৈষম্য না রাখার প্রস্তাব করা হয়।
চেম্বারের প্রস্তাবনায় বলা হয়, চট্টগ্রামের বড় দারোগা হাটে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ওজন পরিমাপক যন্ত্র স্থাপনের কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ১৩ টনের বেশি মাল পরিবহন করতে দেওয়া হচ্ছে না। আগে এক গাড়িতে ২০-৩০ টন পণ্য বহন করা সম্ভব হতো। এখন ২-৩ গাড়িতে এ পরিমাণ পণ্য বহন করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের আমদানি-রপ্তানিকারকদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এ অবস্থায় অসম প্রতিযোগিতার কারণে বাজার হারাচ্ছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। দেশের আর কোথাও গাড়ির ওজন পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে না বিধায় ঢাকা বা আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোয় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী স্বাচ্ছন্দ্যে ৩০, ৩৫ বা ৪০ টন পরিবহন করছে। ফলে যার দরুণ চট্টগ্রামের উৎপাদিত পণ্য অসম প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছে বা পেছনে পড়ে যাচ্ছে। তাই এ বৈষম্য নিরসনে বরিশাল, মংলা, পায়রা, খুলনা, নোয়াপাড়া, যশোর, কুমিল্লা, মাওয়া, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, ভৈরব, আশুগঞ্জ, হবিগঞ্জ ইত্যাদি এলাকার শিল্পাঞ্চলের সড়কগুলোতে ওজন পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন প্রয়োজন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি হবে।
আগামী বাজেটে চট্টগ্রামে একটি গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার নির্মাণে বিশেষ বরাদ্দ রাখার অনুরোধ জানিয়ে চেম্বারের প্রস্তাবে বলা হয়, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, চায়না, জাপান, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশে গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার রয়েছে। এসব সেন্টারের মাধ্যমে পণ্য গুদামজাত করে পাইকারি, খুচরা বা সরাসরি ভোক্তার কাছে সরবরাহ হয়। এসব সেন্টারে ওয়্যারহাউজ ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে কন্টেইনারের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিবহন ব্যয় কমানো সম্ভব। চট্টগ্রামেও একটি গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার প্রয়োজন।
চেম্বারের বাজেট প্রস্তাবে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ অনুযায়ী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ হারে আগাম কর আদায় না করে উৎপাদিত পণ্য সরবরাহকালে উৎপাদন কর হিসেবে আদায় করার সুপারিশ করে বলা হয়, প্রতিষ্ঠিত শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। কাঁচামাল আমদানিতে উৎপাদন কর আগাম কর হিসেবে আদায়ের ফলে প্রচুর অর্থ ব্যয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনায় কমপক্ষে ২-৩ মাসের কাঁচামাল মজুদ রাখতে হয়। এ কাঁচামাল উৎপাদনে ব্যবহারের আগে উৎপাদনযোগ্য পণ্যে আগাম কর (মূসক) আদায় যুক্তিসংগত নয়। নতুন ভ্যাট আইনে ৫ শতাংশ হারে আগাম কর আরোপ করায় এবং এ আগাম কর সমন্বয়পূর্বক অবশিষ্ট অর্থ সর্বনি¤œ ৬ মাসের পূর্বে ফেরত পাওয়ার কোনো বিধান না থাকায় কস্ট অব ফান্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে যা ব্যাংক ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে সামগ্রিক ব্যবসায় অযাচিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বাড়ছে।