যশোর সদর উপজেলার কাজী নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইমরান হোসেন পুলিশের নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন ইমরানের কিডনি কাজ করছে না, তার আরোগ্য নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশি নির্যাতনে ইমরানের জীবন এখন সংকটাপন্ন। এই পুলিশি নির্যাতনের বিচার দাবি করেছেন তারা।
ইমরান হোসেন যশোর সদর উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের নিকার আলীর ছেলে। যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইমরান অভিযোগ করেন, তিনি গত ৩ জুন সন্ধ্যার দিকে পাশের সলুয়া বাজার এলাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় তার সঙ্গে একই এলাকার আরেকটি ছেলে ছিল। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছালে সাজিয়ালি ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা তাদের গতিরোধ করে। এরপর সঙ্গে থাকা ছেলেটির ব্যাগ তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। এ সময় ভয়ে ইমরান দৌড় দেন। পুলিশ ধাওয়া করে তাকে ধরে বেধড়ক মারপিট করলে তিনি জ্ঞান হারান। পরে একটি ফার্মেসিতে তার জ্ঞান ফেরে। এ সময় পুলিশ তার পকেটে গাঁজা দিয়ে আটকের কথা বলে। এরপর ইমরানের বাবাকে ফোন দিয়ে তাকে ছাড়তে ২৫ হাজার টাকাও দাবি করেন এক পুলিশ সদস্য। পরে ৬ হাজার টাকা নিয়ে তারা ইমরানকে ছেড়ে দেয়। মারপিটের ঘটনা কাউকে বললে পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে ফের পেটানোর হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ করেন ইমরান।
ইমরান বলেন, ‘ভয়ে আমি কাউকে কিছু বলিনি। পরের তিন দিন পেটের ব্যথা সহ্য করতে পারছিলাম না। তখন মা-বাবাকে নির্যাতনের বিষয়টি জানাই। এরপর তারা আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। এখন যেন আমার পেটের মধ্যে সব ছিঁড়ে যাচ্ছে। কোনো ওষুধে কাজ হচ্ছে না। আমি মনে হয় বাঁচব না।’
ইমরানের মা বুলবুল বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘এভাবে কেউ কাউকে নির্যাতন করতে পারে? ছেলেটারে শেষ করে ফেলেছে। ওর চিকিৎসা কীভাবে করাব? বাঁচবে কি না জানি না। আমি এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি চাই।’
ইমরানের বাবা নিকার আলী বলেন, ‘আমার ছেলেটা লেখাপড়া করে। এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখেন, কোনো খারাপ কাজের সঙ্গে নেই সে। অথচ তাকে ধরে নির্যাতন করা হলো। ডাক্তার বলেছেন, তার অবস্থা খুব খারাপ। আমি এই ঘটনায় জড়িত পুলিশদের বিচার চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যায়বিচার ভিক্ষা চাই।’
ইমরানের চিকিৎসক যশোর জেনারেল হাসপাতালের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. উবায়দুল কাদির উজ্জ্বল বলেন, ‘ইমরানের দুটি কিডনির ফাংশন খুবই খারাপ। স্বাভাবিক অবস্থায় কিডনির ক্রিটেনিন ১ দশমিক ৪ থাকার কথা, কিন্তু ইমরানের তা ছিল ৮ দশমিক ৮। আজ এটা আরও বেড়েছে। দ্রুত তার ডায়ালাইসিস শুরু করতে হবে এবং আজই সেটা করা হবে। তবে বলা যাচ্ছে না, সে রিকভারি করবে কি না। তার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন।’
এ বিষয়ে সাজিয়ালি পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মুন্সি আনিচুর রহমান বলেন, ঘটনার দিন সকালে জরুরি কাজে যশোর কোতোয়ালি থানায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকে রাত ১২টার দিকে ক্যাম্পে ফিরি। এসে জানতে পারি এএসআই সুমারেশ সাহা, এএসআই সাজদার রহমান ও চার কনস্টেবল ওই কলেজছাত্রকে আটক করেছিল। কিন্তু সে অসুস্থ হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে তার বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয়। ইমরানকে ছাড়তে কোনো টাকা-পয়সার লেনদেন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছেন। ওই ছেলেটি অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না সে খোঁজও নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে ইনফরমেশন পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো পুলিশের কাছে তথ্য ছিল ওই রাস্তা দিয়ে মাদকদ্রব্য আসবে। সেই অনুযায়ী ওই ছেলে দুটোকে আটক করেছিল পুলিশ। ওই সময় ইমরান নামে ছেলেটি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। পড়ে গিয়ে সে আঘাত পায়। পিছু ধাওয়াকারী পুলিশ সদস্যরা তাকে কাদার মধ্য থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘করোনাকালে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যত কমসংখ্যক মানুষকে গ্রেপ্তার করা যায়, ততই ভালো। এমনকি কোনো ব্যক্তির শরীরের কাছাকাছি যেতেও নিষেধ করা হয়েছে। ছেলেটির কাছে টাকা দাবির কথাও শুনেছি। যদি কোনো পুলিশ সদস্য টাকা লেনদেন বা শারীরিক নির্যাতনে জড়িত বলে প্রমাণিত হন, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’