বাজেটে কর্মহীনদের রক্ষার উদ্যোগ নিন

করোনাভাইরাস মহামারীর অর্থনৈতিক অভিঘাতে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক হারে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বেশ আগেই সতর্ক করেছেন। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর চেয়েও দেশে দেশে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রভাব রেখে যাবে এই মহামারীর কারণে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়া মানুষের মিছিল আর দারিদ্র্য। বাংলাদেশের অর্থনীতিও যে এরই মধ্যে করোনার অভিঘাতে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে সেটা স্পষ্টতই দৃশ্যমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০১৯ সাল শেষে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। অতিদারিদ্র্যের হার সাড়ে ১০ শতাংশ। দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৬ লাখ।  সেই হিসাবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৪০ লাখ। তাদের মধ্যে ২ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ হতদরিদ্র। কিন্তু করোনাকালের আগের এই হিসাব এরই মধ্যে পাল্টে গেছে। এ অবস্থায় করোনাকালের আসন্ন বাজেটে কর্মহীনদের রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণে জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।  

সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার-পিপিআরসি ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-বিআইজিডি এক যৌথ গবেষণায় বলেছে করোনা মহামারী শুরুর পর দেশে অতিগরিব, গরিব, গরিব হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানুষ এবং গরিব নয় এমন মানুষের দৈনিক আয় ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ কমেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মার্চ ও এপ্রিল দুই মাসে সাধারণ মানুষের আয়ে এই ধস নেমেছে। গবেষণার ফল বলছে আয় কমে যাওয়ায় সার্বিকভাবে ২৩ শতাংশ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে। এদিকে সোমবার বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনায় দাবি করা হয়েছে করোনা প্রতিরোধে দেশে লকডাউনের দুই মাসে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। লকডাউনের আগে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪০ লাখ, যা লকডাউনের মাত্র ৬৬ দিনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৫ কোটি ৮০ লাখ। বিকল্প বাজেট উপস্থাপনকালে সমিতির সভাপতি অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত দাবি করেন, কভিড-১৯ মহামারী দেশের শ্রেণি কাঠামোকে পাল্টে দিয়েছে এবং বিশাল এক ‘নব দরিদ্র’ গোষ্ঠী তৈরি করেছে। তবে অতিধনী শ্রেণির ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের আর্থিক অবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে ধনীরা আরও ধনী হয়েছে।

করোনায় কাজ হারিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়া দরিদ্রদের হতদরিদ্রে পরিণত হওয়ার এসব হিসাবের সমর্থন মেলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য সংস্থার গবেষণাতেও। বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে গত বছরের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশই দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বব্যাংক ব্যক্তিগত আয়ের ভিত্তিতে দারিদ্র্য পরিমাপ করে থাকে। দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম হলে ওই ব্যক্তিকে গরিব হিসেবে ধরা হয়। সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডি বলছে, করোনার কারণে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, মানুষের আয় কমেছে। ফলে দারিদ্র্যের হারও বেড়ে গেছে। সিপিডির মতে, করোনার কারণে ‘গিনি সহগ’-এ ভোগের বৈষম্য বেড়ে দশমিক ৩৫ পয়েন্ট হয়েছে। ২০১৬ সালে এটি ছিল দশমিক ৩২ পয়েন্ট। একইভাবে আয়ের বৈষম্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৫২ পয়েন্ট।  ২০১৬ সালের হিসাবে এটি ছিল দশমিক ৪৮ পয়েন্ট। সাধারণত গিনি সহগে আয়ের বৈষম্য দশমিক ৫০ পয়েন্ট পেরোলেই ‘উচ্চ আয় বৈষম্যের’ দেশ হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতিও বলছে, গিনি সহগের হিসাবে বাংলাদেশ এখন উচ্চ আয় বৈষ্যমের দেশ এবং বিপজ্জনক আয় বৈষ্যমের দেশে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও এক হিসাবে জানিয়েছে, করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষই জীবিকা হারাতে পারে। বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে চারটি শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষেরা। বৈদেশিক আয়ে পোশাকশ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকরা। আর অভ্যন্তরীণ খাদ্যচাহিদা পূরণ ও ভোগ্যপণ্য ও সেবা খাতে কৃষিশ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা। করোনায় পোশাকশ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকদের পরিস্থিতি এরই মধ্যে নাজুক হয়ে পড়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা সীমাহীন দুর্ভোগে। কিন্তু বিভিন্ন শিল্প খাত ও ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের কোনো সুফল দৃশ্যমান হচ্ছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া কেবল সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর সহায়তা কর্মসূচি দিয়ে এই পরিস্থিতি সামলানো যাবে না। এজন্য শ্রমিক ছাঁটাই রোধ করা এবং বিভিন্ন খাতের কাজ হারানো শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের আন্তরিক ও সৃজনশীল উদ্যোগ জরুরি আসন্ন বাজেটে।