রেকর্ড মৃত্যুর দিনে প্রথমবার ৩ সহস্রাধিক শনাক্ত

দেশে করোনা পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার দেশে করোনা শনাক্তের ৯৪তম দিনে এযাবৎ সর্বোচ্চ নমুনা পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যুতেও আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো শনাক্ত ৩ হাজার ছাড়িয়েছে। এর আগে গত রবি ও সোমবার ২৪ ঘণ্টায় ৪২ জন করে মারা যায়, যা ছিল গতকালের আগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা এবং গত ২ জুন ২ হাজার ৯১১ জনের শনাক্ত ছিল সর্বোচ্চ শনাক্তের ঘটনা। গত ২৪ ঘণ্টায় সাড়ে ১৪ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্তের হার ছিল ২২ শতাংশের কাছাকাছি, যা গত ছয় দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ।

দেশে কী পরিমাণ করোনা রোগী আছে তা এখনো আন্দাজ করা যাচ্ছে না। কারণ যত বেশি নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে, তত বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। চলতি মাসে রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শনাক্ত বৃদ্ধিতে কিছুটা ধারাবাহিকতা থাকলেও মৃত্যু বেড়েছে হঠাৎ করেই। শুরুটা হয়েছে গত মাসের শেষ দিন। ওইদিন ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ মৃত্যু ২৮ থেকে এক লাফে ৪০-এ গিয়ে ঠেকে। এরপর চলতি মাসের প্রথম দিন মৃত্যু কিছুটা কম হলেও বাকি ৮ দিন মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩০ থেকে ৪৫-এর মধ্যে। গত ৯ দিনে মোট মৃত্যুবরণ করেছে ৩২৫ জন এবং শনাক্ত হয়েছে ২৪ হাজার ৫২২ জন। গত মে মাসে মোট শনাক্ত হয়েছিল ৩৯ হাজার ৪৮৬ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছে ৪৮২ জন। দেখা যাচ্ছে, পুরো মে মাসে যে পরিমাণ শনাক্ত ও মৃত্যু হয়েছে, তার অর্ধেকেরও অনেক বেশি হয়েছে চলতি মাসের মাত্র ৯ দিনেই। গত কয়েক দিন ধরে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে যে হারে রোগী শনাক্ত হচ্ছে তাতে বুঝা যাচ্ছে, নমুনা পরীক্ষা দ্বিগুণ পরিমাণে বাড়ানো হলে রোগী শনাক্তও দ্বিগুণ বাড়তে পারে। অর্থাৎ প্রতিদিন ২৮ হাজার করে নমুনা পরীক্ষা হলে রোগী শনাক্ত হতে পারে ৬ হাজার করে।

গতকাল নিয়মিত বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার দুপুর ১২টা থেকে মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত) নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৪ হাজার ৬৬৪টি। এসব পরীক্ষায় নতুন করে ৩ হাজার ১৭১ জনের মধ্যে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। এদিন রোগী শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ৬২ শতাংশ। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৪৫ জন এবং সুস্থ হয়েছে ৭৭৭ জন। তিনি জানান, নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রমে গতকাল নতুন করে যুক্ত হয়েছে শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ। এ নিয়ে সারা দেশে মোট ৫৬টি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষা চলছে। তবে গতকাল পরীক্ষা হয়েছে ৫৫টি প্রতিষ্ঠানের ল্যাবে। দেশে এ পর্যন্ত সর্বমোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৫৯৫টি। এসব পরীক্ষায় মোট ৭১ হাজার ৬৭৫ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত মারা গেছে ৯৭৫ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৫ হাজার ৩৩৭ জন। শনাক্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ ও সুস্থতার হার ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ।

বুলেটিনে সর্বশেষ মৃত ৪৫ জনের বিষয়ে বলা হয়, তাদের মধ্যে পুরুষ ৩৩ জন ও মহিলা ১২ জন। তাদের ২৮ জনই ঢাকা বিভাগের। বাকিদের মধ্যে চট্টগ্রামে ১১ জন, রাজশাহীতে ২ জন, সিলেটে ২ জন ও রংপুরে ২ জন। তাদের মধ্যে ১১-২০ বছরের ২ জন, ২১-৩০ বছরের ২ জন, ৩১-৪০ বছরের ৫ জন, ৪১-৫০ বছরের ৩ জন, ৫১-৬০ বছরের ১৫ জন, ৬১-৭০ বছরের ১০ জন এবং ৭১-৮০ বছরের ৮ জন।

বুলেটিনে আরও বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে ৫৫৭ জনকে। বর্তমানে আইসোলেশনে আছে মোট ৭ হাজার ৮৯৩ জন। একই সময়ে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে আরও ২ হাজার ৬০২ জনকে। বর্তমানে সারা দেশে কোয়ারেন্টাইনে আছে মোট ৫৬ হাজার ৬৩৮ জন। স্বাস্থ্য বাতায়ন-১৬২৬৩, ৩৩৩ ও আইইডিসিআরের হটলাইনে ২৪ ঘণ্টায় কল এসেছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৩৭টি। স্থল, সমুদ্র ও বিমানপথে ২৪ ঘণ্টায় দেশে প্রবেশ করেছে ১ হাজার ১৩৯ জন, তাদের প্রত্যেককে স্ক্রিনিং করা হয়েছে।

বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুদ না করার আহ্বান : করোনা চিকিৎসার জন্য অনেকেই বাসাবাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে মজুদ করছেন উল্লেখ করে ডা. নাসিমা বলেন, অক্সিজেন থেরাপি একটি কারিগরি বিষয়। দক্ষ চিকিৎসক ব্যতীত অন্য কেউ অক্সিজেন প্রয়োগ করলে রোগীর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে করোনা রোগীকে হাই ফ্লো অক্সিজেন দিতে হয়, যা বাসায় দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি জনসাধারণকে অযথা অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে বাসায় মজুদ না করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, এভাবে অযথা বাসায় মজুদ করলে বাজারে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে এবং হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীরা অক্সিজেন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে, যা কারও কাম্য নয়। অক্সিজেন থেরাপিতে প্রতি মিনিটে কত মিলি লিটার যাবে, এটা শুধুমাত্র চিকিৎসকই নির্ধারণ করে দেন এবং টেকনোলজিস্ট ছাড়া এটার ব্যবহারও সম্ভব নয়। তাই কেউ যাতে নিজের বিপদ নিজে ডেকে না আনেন।