স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দাবি

করোনায় টালমাটাল অর্থনীতির মধ্যেই আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আজ উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেটের আকার হবে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ঘাটতি বাজেট হিসেবে ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ। এ ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেট ঘাটতির পরিমাণ বাড়তে পারে। কিন্তু এ ঘাটতি পূরণে বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া যাবে না। এতে  ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে। প্রধানমন্ত্রীঘোষিত ব্যাংকনির্ভর প্রণোদনা বাস্তবায়নে অনাগ্রহ দেখবে ব্যাংকগুলো। এজন্য বিদেশি ঋণের দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। অন্যদিকে আগামী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে। এটিও বাস্তবসম্মত নয়। আর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও হবে চ্যালেঞ্জিং। এ ক্ষেত্রে করোনায় জীবন রক্ষায় স্বাস্থ্য খাত, মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি বাজেটে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় তারা আগামী বাজেট নিয়ে এ প্রত্যাশার কথা জানান। 

ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, আগামী বাজেটে ৮.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হলে তা হবে পুরোপুরি অবাস্তব। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, বড়জোর ৪-৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, করোনার থাবা কতদিন স্থায়ী হবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এ থাবার প্রভাব বন্ধ করতে না পারলে অর্থনীতিও গতিশীল হবে না। নতুন অর্থবছর শুরু হতে বাকি আছে ২১ দিনের মতো। এ অবস্থায় করোনার বড় ধাক্কা নতুন অর্থবছরেও আসবে এবং এগুলো সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।

তিনি বলেন, আসন্ন বাজেটে চারটি বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষকে তার কর্ম ফিরিয়ে দিতে হবে। এটি করতে পারলে অর্থাৎ মানুষের আয়বর্ধক কর্মকা- নিশ্চিত করতে পারলে অনেক কিছুর সমাধান হয়ে যাবে। করোনার কারণে স্বাভাবিকভাবে স্বাস্থ্য খাতে বেশি জোর দেওয়া উচিত। আগামী বাজেটে এটা মূল ইস্যু হওয়া উচিত। এরপর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বাড়াতে হবে। করোনার কারণে অনেক লোক চাকরি হারাবে। মানুষকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকতে হবে। প্রবাসী অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরবেন। তাদের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিতেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বরাদ্দ দিতে হবে, যাতে সংকটময় এ সময়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে না পড়ে। এখন বরাদ্দ যাই হোক না কেন, সরকার চাইলে যেকোনো সময় বরাদ্দ বাড়াতে বা কমাতে পারে। এছাড়া করোনায় ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। সহসায় আসবে না বিনিয়োগ। বিনিয়োগে গতি আনার বিষয়ে মির্জ্জা আজিজ বলেন, দেশে দীর্ঘদিন থেকে বিনিয়োগে মন্দা চলছে। বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত হতাশাজনক। দেশের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে এ বিনিয়োগ কমছে। এ মন্দা কাটাতে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের জন্য পুঁজির জোগান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে হবে। 

ড. জাহিদ হোসেন : বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বাড়তি ঋণ নিলে করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বিঘœ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ এ প্যাকেজ ব্যাংকের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এখন ঝুঁকি ও অন্যান্য বিষয় চিন্তা করে ব্যাংকগুলো সরকারকেই বেশি ঋণ দিতে আগ্রহ দেখাবে। কেননা ব্যক্তি খাতের চেয়ে সরকারি ঋণে সুদহার ভালো আর ঝুঁকিও নেই বললেই চলে।

তিনি বলেন, আগামী বাজেটে অর্থায়নই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এ অর্থায়ন পূরণে রাজস্বের যে টার্গেট ধরা হচ্ছে তা উচ্চাভিলাষী। অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণনির্ভর না হয়ে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার প্রতি বেশি দৃষ্টি দিতে হবে। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ কভিড-১৯ মোকাবিলায় বিশেষ ফান্ড ঘোষণা করেছে। সেখানে নেগুসিয়েশন বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, বাজেট হতে হবে দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষবান্ধব। তাদের সহায়তা ও কর্মে ফিরিয়ে আনতে হবে। এছাড়া মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রশ্নে স্বাস্থ্য খাত যে ভঙ্গুরতার পরিচয় দিয়েছে, তা থেকেও জাতিকে উত্তরণ করতে হবে। এজন্য বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দিতেই হবে। 

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, করোনার কারণে দেশে দরিদ্র মানুষের হার দ্বিগুণের বেশি হবে। এ ক্ষেত্রে আগামী বাজেটে দরিদ্র মানুষের সহায়তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এমন একটি পরিস্থিতিতে সরকারের টাকারও দরকার আছে। কিন্তু অনেক বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে না। কারণ যারা কর দেন, তাদের অবস্থাও এখন ভালো নয়। বিশেষ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্পপতিরাও বেশ অসুবিধার মধ্যে আছেন। দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প তৈরি পোশাকে কাজকর্ম খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। করোনার কারণে বৈদেশিক আয় কম হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও তেমন হবে বলে মনে হয় না। এজন্য বাজেটে অর্থসংস্থান কঠিন হবে।

তিনি বলেন, সরকার এরই মধ্যে যেসব ভর্তুকি সুদের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সেগুলো বাজেটের মধ্যে নিয়ে আসতে পারে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরকারের ঋণ প্রণোদনা সহায়তা পেলেও এসএমই প্রতিষ্ঠান হয়তো সেভাবে পাচ্ছে না। এটা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। করোনার কারণে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষত রপ্তানি বাণিজ্য ধরে রাখতে অর্থনৈতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, করোনার বহু আগে থেকেই আমাদের শেয়ারবাজারের অবস্থা খারাপ ছিল। এখনো অনেক খারাপ। কিন্তু বাজেটে এর জন্য কিছু করার আছে বলে মনে হয় না। শেয়ারবাজারের এতদিনে বড় সংকট ছিল সুশাসনের। যার অভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট ছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে নতুন নেতৃত্ব আসায় আশা করছি অবস্থার পরিবর্তন হবে।