প্রথম আমেরিকান গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-৬৫) দাসপ্রথা নিয়ে হয়েছিল। তৎকালীন আমেরিকান রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন উত্তরের রাজ্যগুলোর সমর্থন নিয়ে দাসপ্রথা বিলুপ্তির নির্দেশ দিয়েছিলেন। দক্ষিণের রাজ্যগুলো সেই নীতির বিরোধী ছিল। গৃহযুদ্ধের ফলে ৭,৫০,০০০ লোক হতাহত হয়েছিল। দাসত্বের পক্ষে থাকা দক্ষিণের রাজ্যগুলো পরাজিত হয়েছিল। তবুও, আফ্রিকান আমেরিকানরা মৌলিক অধিকারের বাইরেই ছিল। ড. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে ১৯৬৫ সালে নাগরিক অধিকার আন্দোলন সফল হয়। আমেরিকান কংগ্রেস আইন করে বর্ণবাদ প্রথাকে বাতিল করে। ফলে, মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য বর্ণের জনগণ সমান অধিকার পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পায়।
ভোটাধিকারপ্রাপ্তি এবং বর্ণের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হওয়ার প্রথা বিলুপির পঞ্চাশ বছর পরও আমেরিকা এখনো আগের মতোই বর্ণবাদী। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডের নির্মম হত্যাকাণ্ড ব্যাপক বিক্ষোভের সূচনা করেছে। ফ্লয়েডের বেআইনি হত্যাকা-ের ভিডিওচিত্র ভাইরাল হওয়ার পরে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্ণবাদের এই ধরনের নৃশংসতার নিন্দা করার পরিবর্তে যারা এ ঘটনার প্রতিবাদ করছেন তাদের সমালোচনা শুরু করেন।
ফ্লয়েডের ঘটনার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি হচ্ছে? এবং কেনই যুক্তরাষ্ট্রকে বর্ণবাদের কেন্দ্রস্থল বলা হয়? ফ্লয়েডের নৃশংস হত্যার পরে আগুনে ঘি ঢালার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প এবং অন্যান্য সাদা আধিপত্যবিদদের ভূমিকা কী?
কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরা মার্কিন জনসংখ্যার ১৩%, কিন্তু ইউরোপীয় উপনিবেশকারীরা তাদের পূর্বপুরুষদের আমেরিকাতে দাস হিসেবে নিয়ে আসার ৪০০ বছর পরেও, তারা এখনো উচ্চমাত্রার বর্ণবাদের শিকার হয়। ২০০৯-১৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা, কখনোই সাদা জনগোষ্ঠীর এমন একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। এই শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা কৃষ্ণাঙ্গদের অলস, বুদ্ধিহীন এবং অপরাধী হিসেবে বর্ণিত করে বর্ণবিদ্বেষ প্রদর্শন করে আসছিল।
কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের বর্বরতার ঘটনা এই প্রথম নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৪ সালে, নিউইয়র্কে পুলিশ চৌকিতে রাখার পরে মারা যাওয়া এরিক গার্নারও ফ্লয়েডের মতোই শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন: ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না।’ একই বছর মাইকেল ব্রাউনকে পুলিশ অফিসার গুলি করে হত্যা করার ঘটনায় ফার্গুসনে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দাঙ্গা হয়েছিল। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর, একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার একজন নিরস্ত্র
কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে গুলি করার জন্য শাস্তি পেয়েছিলেন। এই জাতীয় শত শত ঘটনার কারণেই ফ্লয়েডের হত্যার পর মানুষ ক্রোধে ফেটে পড়ে।
দ্বিতীয় আমেরিকান গৃহযুদ্ধ একটি বাস্তবতা হতে পারে, কারণ একদিকে রয়েছেন বর্ণবাদের কারণে বৈষ্যমের শিকার কৃষ্ণাঙ্গরা, এবং অন্যদিকে রয়েছেন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী/আধিপত্যবাদীরা যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কালো ও অন্য বর্ণের মানুষদের থেকে মুক্ত করতে চান। তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের সমর্থক হিসেবে খুঁজে পেয়েছেন, যিনি তাদের আমেরিকার ‘শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান গৌরব’ পুনরুদ্ধার করার এজেন্ডার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় আমেরিকান গৃহযুদ্ধ দুটি কারণে বাস্তবে পরিণত হতে পারে। প্রথমত, রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের দ্বারা উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদের উত্থান এখন বাস্তবতা। দ্বিতীয়ত, প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের লাগাম ছাড়া কথাবার্তা। তিনি হোয়াইট হাউজে বিক্ষোভ করার সাহস দেখালে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে কুকুর ছেড়ে দেওয়ার মতো কথা বলে আগুনে আরও ঘি ঢেলেছেন।
রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সশস্ত্র শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী গোষ্ঠীগুলোর অনুপ্রেরণা পাওয়া সম্পর্কিত রিপোর্টগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের দুর্দশাকে আরও গতিশীল করবে। করোনাভাইরাস মহামারীতে প্রায় ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি এবং মারাত্মক বেকারত্বের কারণে ইতিমধ্যেই ধুঁকতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে চলমান জাতিগত সহিংসতা পরাশক্তিটিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে যথেষ্ট। এবং জাতিগত কুসংস্কার প্রচার এবং শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ প্রচারে ট্রাম্প একা নন। তিনি আজকের আমেরিকার এমন একটি মানসিকতাসম্পন্ন মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করেন যারা অ-শ্বেতাঙ্গ দেশগুলো থেকে অভিবাসন দূরীকরণ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যকে পুনরায় প্রবর্তন করতে চান। দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী/আধিপত্যবাদীরা যদি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পান তবে তা অবশ্যই অ-শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করবে। ট্রাম্প প্রশাসন এবং তার শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী রিপাবলিকান পার্টির কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে পুলিশ, জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের অন্য স্তম্ভগুলোতে বর্ণবাদী উপাদানকে যেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাতে তারা ভবিষ্যতে শ্বেতাঙ্গ বাদে অন্য বর্ণের লোকদের কণ্ঠরোধ করতে পারে।
শিবসেনার হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে অতি ডানপন্থি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রতিনিধিত্বকারী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এবং রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের বর্ণবাদী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতার মধ্যে সাদৃশ্যকে কেউই উপেক্ষা করতে পারবে না। মোদি এবং ট্রাম্প উভয়েই সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারে বিশ্বাসী। উভয়েই একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতার অধিকারী। মোদি প্রশাসন যদি তার দেশের পুলিশ, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র এবং সামরিক বাহিনীকে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা পরিপূর্ণ করে থাকেন তবে ট্রাম্পও ক্ষমতাশালী পদে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতার নীতি অনুসরণ করেন। ফলস্বরূপ, উভয় গণতন্ত্রই গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে এবং নৈরাজ্যের জন্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
মোদির মতো ট্রাম্পও রাষ্ট্রের অঙ্গগুলো, বিশেষত সেনা, রাজ্য গভর্নর এবং আমলাতন্ত্রকে রাজনীতিকরণ করছেন। ট্রাম্প যেভাবে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী ব্যবহার করার হুমকি দিয়েছিলেন তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ট্রাম্পের এহেন আচরণের জন্য ক্লু ক্লাক্স ক্ল্যানের মতো সাদা বর্ণবাদী গোষ্ঠীরা আত্মবিশ্বাসী যে, ট্রাম্প প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সহায়তায় তারা কালো বর্ণের জনগণকে দমন করতে পারেন। কিন্তু এখন ২০২০ সাল, ১৮৬১ বা ১৯৬৫ নয়। সাদা বর্ণবাদী গোষ্ঠীরাই এখন সংখ্যালঘু। শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এবং এটিকে তারা তাদের দেশের ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করেন। ইতিমধ্যে, বেশ কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ফ্লয়েডের লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রকাশ করে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
আমেরিকান জনগণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার সমমনস্ক মানুষদের হাত থেকে মুক্তি না পেলে দ্বিতীয় আমেরিকা গৃহযুদ্ধ অনিবার্য। আমেরিকার শক্তি দুর্বল করার জন্য করোনভাইরাস বা চীনের দরকার নেই। ট্রাম্প এবং তার শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা আমেরিকাকে ভেতর থেকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমেরিকা সর্বশ্রেষ্ঠ হলেও, জাতি-বৈচিত্র্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির সমাধান করতে পারছে না।
লেখক : শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
sharifhasan059@gmail.com