মায়েস্থেনিয়া গ্রাভিস কী

মায়েস্থেনিয়া গ্রাভিস একটি অটোইমিউন নিউরোমাস্কুলার রোগ, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে শরীরের ঐচ্ছিক মাংসপেশি ও স্নায়ুর সংযোগস্থলের বিরুদ্ধে অটোএন্টিবডি তৈরি করে এবং মাংসপেশির ক্ষতি করে। মায়েস্থেনিয়া বিভিন্ন বয়সী পুরুষ ও মহিলা উভয়কেই প্রভাবিত করতে পারে। সাধারণত মহিলাদের ক্ষেত্রে কম বয়সে এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে অধিক বয়সে এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। প্রতি বছরের মতো এ বছরেও জুন মাসকে মায়েস্থেনিয়া গ্রাভিসবিষয়ক সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হচ্ছে।

কারণ

যখন শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত প্রান্তীয় স্নায়ু এবং পেশির স্নায়ুপ্রান্তের সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে, তখন এই রোগের সূচনা হয়। এ ক্ষেত্রে অ্যাসিটাইল কোলিন নামক রাসায়নিক বার্তাবহের (যা স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির মধ্যে পরিবাহিত হয় এবং সব ধরনের চলন ও কার্যকলাপ সম্পাদনে সাহায্য করে) ঘাটতির জন্য পেশি কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনাক্রম্যতা নিয়ন্ত্রণকারী থাইমাস গ্রন্থির টিউমার ও ক্যানসার এবং এই রোগ-সংক্রান্ত পারিবারিক ইতিহাস মায়েস্থেনিয়া গ্রাভিসের প্রবণতা আরও বৃদ্ধি করে।

লক্ষণ

প্রধান লক্ষণ হলো ঐচ্ছিক মাংসপেশির দুর্বলতা। সাধারণত দিনের বেলায় তেমন কোনো দুর্বলতা অনুভূত হয় না, কিন্তু দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা ও রাতের দিকে এই দুর্বলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের ঐচ্ছিক পেশি দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। চোখের পাতার পেশি দুর্বল হয়ে পড়ায় চোখের পাতা ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসতে থাকে, এতে আক্রান্ত ব্যক্তির দেখতে সমস্যা হতে পারে। এ ছাড়া ভারী কিছু তুলতে, চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে, কথাবার্তা বলতে, চিবাতে ও গিলতে এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেও অসুবিধা হতে পারে। পাশাপাশি ক্ষীণ স্বর ও ক্রমাগত শারীরিক দুর্বলতার বিষয়টিও বেশ পরিলক্ষিত হয়। যথাসময়ে চিকিৎসা না নিলে উপসর্গগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

রোগ নির্ণয়ের জন্য এক ধরনের স্নায়বিক পরীক্ষা করা হয়, যা পেশির দুর্বলতার মাত্রা, পেশির দৃঢ়তা, পেশির সমন্বয়, প্রতিবর্ত ক্রিয়া এবং চোখের ত্রুটি নির্ণয় করে। এ ছাড়া অ্যাসিটাইল কোলিন নামক রাসায়নিক বার্তাবহের পরিমাপ, এড্রোফোনিয়াম ক্লোরাইড পরীক্ষা, ইলেক্টরোমায়োগ্রাফি (যা পেশিকলার বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ রেকর্ড করে), থাইমাস গ্রন্থির সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই, শ্বাস-প্রশ্বাস ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য ফুসফুসের পরীক্ষা ইত্যাদি টেস্ট করে রোগের তীব্রতা নির্ধারণ করা যায়। বর্তমানে মায়েস্থেনিয়া গ্রাভিসের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিকার নেই। উপসর্গের ব্যবস্থাপনা এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করাই এর চিকিৎসা পদ্ধতি। এজন্য স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ বেশ কার্যকর। স্নায়ুকোষ ও পেশির মধ্যে স্নায়বিক সংকেত উন্নত করার জন্য পাইরিডোস্টিগমিন ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিনও ব্যবহার করা যায়, যা প্রবর্তিত অনাক্রম্যতার সঙ্গে লড়াই করতে সাহায্য করে। যদিও এই পদ্ধতি বেশ ব্যয়বহুল। ক্ষেত্রবিশেষে থাইমাস গ্রন্থি অপসারণ-সংক্রান্ত অস্ত্রোপচার করা যেতে পারে। জীবনযাপন পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন এই রোগের উপসর্গ হ্রাসে সাহায্য করতে পারে। যেমন পেশি দুর্বলতা কমাতে বিশ্রাম নেওয়া, মানসিক চাপ এবং অতিরিক্ত উষ্ণতা এড়িয়ে চলা ইত্যাদি।