রাজধানীর রামপুরার বাসার যে কক্ষে ৫ মাস আগে আগুনে পুড়ে মারা যায় একমাত্র ছেলে, সেখানেই গতকাল শুক্রবার ভোররাতে আগুনে ঝলসে গেলেন সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু। দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার অপরাধ বিভাগের প্রধান নান্নু আশঙ্কাজনক অবস্থায় শেখ হাসিনা জাতীয় প্লাস্টিক অ্যান্ড বার্ন ইনস্টিটিউট হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা বলছেন, তার শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে। ৭২ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এদিকে নান্নুর বাসার গ্যাসের লিকেজ থেকে গ্যাস বের হওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা।
সাংবাদিক নান্নুর স্ত্রী পল্লবী বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, নান্নুকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন ৭২ ঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।
এর আগে গত ২ জানুয়ারি ভোরে সাংবাদিক নান্নুর ছেলে স্বপ্নীল আহমেদ পিয়াস দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন বলে পল্লবী বেগম জানান।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নান্নু গতকাল ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে আফতাবনগরে জহিরুল ইসলাম সিটির ৩ নম্বর রোডের বি ব্লকের ৪৪/৪৬ নম্বর পিস তাজমহল অ্যাপার্টমেন্টের দশ তলার ফ্ল্যাটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নান্নুর স্ত্রী পল্লবী জানান, ‘বৃহস্পতিবার (দিবাগত) রাতে নান্নু যুগান্তর অফিস থেকে লেট নাইট ডিউটি করে রাত দেড়টায় বাসায় ফেরেন। বাসায় ঢুকে তিনি গোসল করেন। এরপর আমরা এক সঙ্গে রাতের খাবার খাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বপ্নীল মারা যাওয়ার পর তার ঘরটিতে মাঝে মাঝে আমরা দরজা খুলে দেখতাম। বুধবার তার ঘরটি খুলে আমরা বাবা-মা এক সঙ্গে তার বিছানায় বসে অনেক কেঁদেছি। ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। তাই তার বিছানা ও ব্যবহৃত জিনিস নিয়েই আমরা পড়ে থাকি। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে তিনটা বা পৌনে ৪টার দিকে নান্নু তার ছেলের ঘরের দরজা খোলেন। আমি তখন বেডরুমে ছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। কক্ষের সামনে গিয়ে দেখি, হালকা আলোতে ধোঁয়ার কু-লি। নান্নু চিৎকার করতে করতে বাথরুমে গিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে শরীরে পানি লাগাচ্ছে। ঘরের চারদিকে এখানে ওখানে আগুন জ্বলছিল। নান্নু বাথরুম থেকে পানি এনে আগুন নেভায়। এরই মধ্যে বাড়ির অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা চলে আসেন। তাকে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।’
শেখ হাসিনা জাতীয় প্লাস্টিক অ্যান্ড বার্ন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, (গতকাল) ভোরে সাংবাদিক নান্নুকে হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। তার শারীরিক অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। আমরা চেষ্টা করছি তাকে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার। তার শরীরের ৬০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। ৭২ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পর তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করা যাবে।
মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০৭ সালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।
ক্র্যাব সভাপতি আবুল খায়ের ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বিকু দেশবাসীর কাছে তার সুস্থতা কামনায় দোয়া চেয়েছেন। ক্র্যাব এক বিবৃতি দিয়ে সাংবাদিক নান্নু’র বসবাস করা ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজের ত্রুটির বিষয়টি তদন্ত করার দাবি জানিয়েছে। ক্র্যাবের সভাপতি আবুল খায়ের দাবি করেছেন, ওই বাড়ির বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে গ্যাসের লিকেজ থেকে গ্যাস বের হওয়ার অভিযোগ শুনেছি। বিষয়টি তদন্ত করার জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সহায়তা চেয়েছেন।
দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, এটা একটা মর্মান্তিক ঘটনা। পিতার সামনে সন্তান দগ্ধ হয়ে মারা গেছে। সেই ঘরে পিতা আবার দগ্ধ হয়েছে। আমরা শুনেছি, ওই বাড়ির গ্যাস লাইনে ত্রুটি ছিল। এটা তদন্ত করা হোক। নির্মাণকাজে গাফিলতি থাকলে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।