বাজেট আমাদের জাতীয় জীবনের একটি অংশ। সামন্তযুগে, সামন্তপ্রভু ও রাজারা নিজস্ব সামন্তযন্ত্র, রাজ্য দখল ও নিজেদের ভোগ-বিলাস ইত্যাদির ব্যয় নির্বাহের জন্য এক ধরনের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা করতেন। জনগণ বা জনকল্যাণ ওই বাজেটের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল না, তা সহজেই অনুমেয়। জনকল্যাণকেন্দ্রিক বাজেট প্রণয়ন কিছুটা সাম্প্রতিককালের ধারণা। আধুনিককালে জাতীয় বাজেটসমূহ দৃশ্যত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার পাশাপাশি জনগণের সুরক্ষা ও মঙ্গলের ওপর গুরুত্ব দেয়। বাজেটের আরেকটি বড় উদ্দেশ্য থাকে সম্পদের ব্যবস্থাপনায় নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে অপচয় রোধ করা।
অর্থ সংগ্রহ পরিকল্পনা বাজেটের একটি বড় দিক। সম্পদ সংগ্রহে আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ মূলত কর ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে থাকে। সামন্ততন্ত্রে যা ছিল সামন্তরাজার বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্য সম্পদ। আইনগতভাবে, ১২১৫ সালে ‘ম্যাগনাকার্টা’ চুক্তির মাধ্যমে সর্বপ্রথম কর আরোপের সময় করদাতাদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। আরও পরে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্লোগান ছিল, ‘প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কোনো কর আরোপ নয়’।
পরে আধুনিক বাজেট মূলত পশ্চিমাবিশ্বে আমলাতন্ত্রের হাত ধরে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। কিন্তু বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতা নিয়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগের দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে আরও কিছুকাল। এরই মধ্যে বাজেট কিছুটা গণমুখী চরিত্র পায় ইংল্যান্ডে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, ১৬৮৯ সালে। এ সময় বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগ থেকে সরিয়ে আইনসভার ওপর ন্যস্ত করা হয় প্রথমবারের মতো।
ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ ছিল করের ওপর রাজা ও অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব। অবশেষে, এই বিরোধের মধ্য দিয়েই উভয় গোষ্ঠীরই পতন হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে নেপোলিয়নের সময় ফ্রান্সে বাজেট ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু সংস্কার আনা হয়, মূলত বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে তথ্য ও উপাত্তভিত্তিক বিশ্লেষণ, কর সংগ্রহ ও খরচের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে গুরুত্বারোপ করা হয়। নেপোলিয়ন যে ব্যবস্থাপনায় ভালো ছিলেন, এটি তার একটি দৃষ্টান্ত।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৭৮৬ কোটি টাকার প্রথম বাজেট পেশ করেন। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে বর্তমান অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। বোঝা-ই যায় সময়ের পরিক্রমায় বাজেটের আকার কত পরিবর্তন হয়েছে।
সাধারণত গণমানুষের বাজেটের প্রতি আগ্রহ কোনো পণ্যের দাম কমল না বাড়ল, সেটুকু পর্যন্ত। আগ্রহী না হওয়ার পেছনে কারণ হতে পারে বাজেটে নিজেদের কথা খুঁজে না পাওয়া বা বুঝতে না পারা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাজেট কি শুধুই আর্থিক পরিকল্পনা, রাজস্ব আয়, রাজস্ব ব্যয়, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, ঘাটতি ইত্যাদি, নাকি আরও অন্য কিছু? সাধারণ মানুষের বিষয়সমূহ বাজেটে কতটুকু আছে, তা একটি বড় প্রশ্ন। আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদে বাজেট তৈরির প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামত গ্রহণের বিধান আছে। যদিও এই বিধানের বাস্তবায়ন নেই বলে অভিযোগ বিস্তর। কিন্তু জাতীয় বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের কোনো অংশগ্রহণ নেই। মোটামুটি সম্পূর্ণটাই আমলাতান্ত্রিক। মন্ত্রণালয়গুলো নিজস্ব প্রক্ষেপণের ভিত্তিতে চাহিদা প্রণয়ন ও প্রস্তাব করে থাকে। মন্ত্রণালয়ের চাহিদা ও জনগণের চাহিদা যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এক না, তা বলাই বাহুল্য। এখানে দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকট প্রকট। এই সংকট উন্নয়ন মানসিকতারও।
তত্ত্বগতভাবে রাষ্ট্রের ও সরকারের নীতি বাস্তবায়নে বাজেট একটি বার্ষিক কর্মকৌশল। আমাদের সর্বোচ্চ নীতি সংবিধান। এ ছাড়া আমরা সবাই স্বাস্থ্যনীতি, শিক্ষানীতি, কৃষিনীতি, নারীনীতি, যুবনীতি, দক্ষতা উন্নয়ননীতিসহ অনেক নীতির কথা জানি, একের পর এক পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কথা জানি। এই নীতি ও পরিকল্পনাগুলোর সঙ্গে বাজেটের সম্পৃক্ততা থাকা জরুরি কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়নের জন্য যেমন সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা করা হয় না, তেমনি তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দও দেওয়া হয় না।
জনগণই বাজেটের প্রাণ। বাজেটে জনগণ বিশেষত, বঞ্চিত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিষয় বলতে সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকির মতো কিছু বিষয় থাকে, তাও আবার সংখ্যার আলোকে। কিন্তু বাজেট শুধু সংখ্যা না, বাজেট মানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির সম্মিলনের প্রতিফলন। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করার জন্য বাজেট প্রক্রিয়া বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ জরুরি। অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া কী হবে সে নিয়ে আলোচনা থাকতে পারে। কিন্তু বর্তমান সংসদীয় প্রতিনিধিত্বশীল অংশগ্রহণ বাজেটে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, তা প্রায় স্পষ্ট। জনগণের সঙ্গে আলোচনা বলতে যতটুকু হয়, তা বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে, যেন বাজেট শুধু ব্যবসায়ীদের। তাই বাজেটে সবকিছু অর্থের আলোকে বিবেচনা করা হয়, আর্থসামাজিক অবস্থার অন্য অনুষঙ্গগুলো বাদ পড়ে যায়, যার মধ্যে রয়েছে পুঞ্জীভূত সম্পদের পুনর্বণ্টন ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা করার মতো বিষয়সমূহ।
অর্থমন্ত্রী ২০২০-২১ বাজেট বক্তৃতায় সংস্কারকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আশা করি কোনো এক দিন কোনো এক অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় মৌলিক এই দৃষ্টিভঙ্গিগত সংস্কারের কথা বলবেন।
লেখক : উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত
psmiraz@yahoo. com