ছেলের পর একই কক্ষে পুড়ে মরলেন সাংবাদিক বাবা

একমাত্র ছেলে স্বপ্নিল আহমেদ পিয়াসের মৃত্যুর ৬ মাসের মাথায় একই ধরনের অগ্নিকাণ্ডে মারা গেলেন দৈনিক যুগান্তরের অপরাধ বিভাগের প্রধান ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু। গতকাল শনিবার সকাল সোয়া ৮টায় রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

এর আগে শুক্রবার ভোররাত পৌন ৪টার দিকে রাজধানীর আফতাবনগরের জহিরুল ইসলাম সিটির ৩ নম্বর রোডের ‘বি’ ব্লকের পিস তাজমহল ৪৪/৪৬ নম্বর বাড়ির ১০তলার নিজ ফ্ল্যাটে অগ্নিকাণ্ডে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন নান্নু। তার শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে যায়।

ফ্ল্যাটের একই কক্ষে গত ২ জানুয়ারি অগ্নিকাণ্ডে মারা যান নান্নুর ছেলে স্বপ্নিল আহমেদ পিয়াস। একই কক্ষ এবং প্রায় একই সময়ে ফের অগ্নিকাণ্ডে মারা গেলেন বাবা। ছেলের মৃত্যুর পর মেরামত শেষে গত ৩১ মে স্ত্রী ও শাশুড়িকে নিয়ে ১ হাজার ৯১০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটটিতে উঠেছিলেন নান্নু। তার মৃত্যুর খবরে সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। ক্র্যাবসহ বিভিন্ন মহল শোক প্রকাশ করেছে।

গতকাল সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, স্বামীর শোকে স্ত্রী শাহীনা হোসেন পল্লবী বিলাপ করছেন। স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এ সময় কান্নারত পল্লবী বলেন, ‘বাড়ি নির্মাণে পিস ডেভেলপার কোম্পানির ত্রুটির কারণে আমি আমার সন্তানের পর স্বামীকে হারালাম। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব?’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘বাসায় গ্যাসের লাইনে লিকেজ ছিল। মাঝেমধ্যে গন্ধ পাওয়া যেত। কয়েক দিন আগে মিস্ত্রি এনে মেরামত করা হলেও পুরোপুরি ঠিক হয়নি। গ্যাসের লিকেজই অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ। সন্তান হারানোর পর পিস ডেভেলপার কোম্পানিকে ক্ষমা করেছি। এবার আর নয়।’

ভবনের ব্যবস্থাপক মনসুর আলম জানান, শুক্রবার ভোররাত ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে পরপর তিনটি শব্দে তার ঘুম ভাঙে। বাইরের রাস্তায় লোকজন আগুন আগুন বলে চিৎকার করছিল। এরপর তিনি ভবনের ফায়ার অ্যালার্ম বাজান। উপরে ওঠার সময় লোকজনকে নান্নুকে ধরে নিচে নামাতে দেখেন। এরপর মনসুর পানি দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন নিভিয়ে ফেলেন। দুর্ঘটনাকবলিত কক্ষের একটি খাট, এসি, টেলিভিশন ও ছোট সোফা পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

মনসুর আলম আরও জানান, ভবনের কারও ফ্ল্যাটে সমস্যা দেখা দিলে তিনিই দেখভাল করেন। নান্নুর ফ্ল্যাটের গ্যাসলাইনের রাইজারে ত্রুটি ছিল, ৩১ মে বাসায় ওঠার সময় সেটি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। এরপর গ্যাসের কোনো সমস্যার কথা এই দম্পতি তাকে জানাননি।

বাড্ডা থানার ওসি মো. পারভেজ ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলে গেলে আশপাশের ফ্ল্যাটের লোকজন রাতে স্বামী-স্ত্রীর তুমুল ঝগড়ার শব্দের কথা জানান। এরপরই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনের উৎপত্তি কোথা থেকে, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রথমবার দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন ফায়ার সার্ভিস এখনো পুলিশকে দেয়নি।

ভবনের কয়েক বাসিন্দাও এই দম্পতির মধ্যে ঝগড়ার কথা জানান। ঘটনাস্থলে যাওয়া অপরাধবিষয়ক সাংবাদিক নাসির উদ্দিন শোয়েব জানান, গ্যাসের লাইনের সংযোগ ওই কক্ষের সঙ্গে তিনি পাননি। লাইনটি রান্নাঘর সংলগ্ন। এজন্য গ্যাস লিকেজের প্রসঙ্গ বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাছাড়া বাসিন্দাদের অনেকেই রাতে ঝগড়া ও ধুমধাম শব্দ পাওয়ার কথা বলেছেন।

নিহতের ভাই বাবলু হোসেন বলেন, ‘আমরা মনে করছি দুর্ঘটনায় আমাদের ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার।’

তবে মৃত্যুর ঘটনা পরিকল্পিত দাবি করে ক্র্যাব সভাপতি আবুল খায়ের বলেন, ‘একই বাসায় একই কক্ষে একই ধরনের দুর্ঘটনায় ছেলের পর বাবাও মারা গেল। এটিকে আমি দুর্ঘটনা বলব না। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। প্রথমবার দুর্ঘটনার পর ভবন মালিক, ভূমি মালিক কেউই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেননি। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গেলেও এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন দেয়নি। যাদের কারণে বাবা-ছেলেকে জীবন দিতে হলো, তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছি।’

দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘ভবনে হয়তো কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। ভবনের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে হলেও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।’

এদিকে সাংবাদিক নান্নুর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের, আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ, বিশিষ্ট শিল্পপতি ও যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল, দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ চৌধুরী, ক্র্যাব সভাপতি আবুল খায়ের, এডুকেশন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ইরাব) সভাপতি মুসতাক আহমদ, ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হুমায়ুন কবির প্রমুখ।