‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি সবই দেখি তা না না না’

কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন। লালনের গানকে তিনি নিয়ে গেছেন সব শ্রেণির মানুষের দোরগোড়ায়। তার কাজ ও লালনের গানে তার অবদান দেশ ছাড়িয়ে দেশের বাইরে চর্চিত হয়েছে। পেয়েছেন এশিয়ার নোবেলখ্যাত ‘ফুকুওয়াকা’, একুশে পদকসহ অনেক স্বীকৃতি। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে দেখেছেন অনেক চড়াই-উতরাই। মুখোমুখি হয়েছেন অনেক স্মরণীয় অভিজ্ঞতার। যা বিশ্বের যে কোনো সংগীতপ্রেমী মানুষের জন্য আগ্রহের বিষয় হতে পারে। এই বরেণ্য শিল্পীর ঘটনাবহুল জীবন এবার বইয়ের মলাটে বন্দি হতে যাচ্ছে। যেখানে থাকছে তার শিল্পী ও ব্যক্তিজীবনের নানা অধ্যায়। তবে বইটি কোনো দেশি লেখক লিখছেন না। ফরাসি গবেষক ড. এলেন পিয়ারো অনন্য এই শিল্পীর জীবনী লেখা শুরু করেছেন এরইমধ্যে। ফরিদা পারভীন বলেন, ‘এলেন পিয়ারোর সঙ্গে অনেক দিনের পরিচয়। গত শতকের আশির দশকে তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে আমাদের জানাশোনা। সে আমার সংগীত জীবনের অনেক স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী। তাই তিনি যখন আগ্রহ প্রকাশ করছেন আমার কর্ম ও ব্যক্তিজীবন নিয়ে কাজ করার, তখন তাকে সম্মতি না দিয়ে পারলাম না। অনুমতি পেয়েই তিনি আরও আগ্রহের সঙ্গে আমার সংগীতজীবন নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন। একই সঙ্গে আমার জীবনী লেখার কাজেও হাত দিয়েছেন। প্রতিটি কাজ যত্ন ও গুরুত্ব দিয়ে করেন বলেই আমার জীবনী লেখার বিষয়ে ড. এলেন পিয়ারোকে যোগ্য লেখক বলে মনে হয়েছে। আশা করছি, বিভিন্ন অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে জীবনের প্রতিটি বিষয় তিনি বইয়ে তুলে ধরতে পারবেন।’ একজন বিদেশি লেখক কি পারবেন এ দেশের শিল্পী ও তার কাজের যথার্থ মূল্যায়ন করতে? জানতে চাইলে ফরিদা পারভীন বলেন, ‘আসলে সংগীতের কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নেই। আবেগের রং সব দেশে, সব কালে একই রকম। তা না হলে আমার গানে ব্রিটেনের রানীর চোখ ভরে জল আসত না। দেশের বাইরে এত বড় বড় শো করি, সেখানকার দর্শক আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেন না। তাই ড. এলেন পিয়ারোও পারবেন আমাকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে। তিনি বিদেশি হলেও কোনো বাঙালির চেয়ে এদেশের জন্য মনের টান তার কম নয়। এ দেশের মাটি ও সংস্কৃতি নিয়ে অদ্ভুত দখল রয়েছে তার। তাছাড়া আমার বেশিরভাগ বিদেশি শোতে তিনি স্বচক্ষে সব দেখেছেন, অনুধাবন করেছেন। সে সব কথাই লেখা হবে বইটিতে। তিনি এবারই প্রথম এ ধরনের কাজ করছেন না। সুফি গানের কিংবদন্তি পাকিস্তানি শিল্পী ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খানের জীবনী গ্রন্থও তিনি লিখেছেন। সেটি ঢাকার অলিয়ঁস ফ্রঁসেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সব মিলিয়ে তাকে সবচেয়ে যোগ্য মনে হয়েছে।’

ফরিদা পারভীন এখন করোনা মহামারীর কারণে ঘরবন্দি সময় কাটাচ্ছেন। করোনার প্রকোপ শুরু না হলে এরমধ্যে দারুণ একটি কাজ করে ফেলতেন। শোনা যাক তার মুখেই, ‘ইউরোপিয়ান সংগীতকার লরেনের সঙ্গে একটি দ্বৈত কাজ করেছি। লালনের ৬টি গান আর ফ্রান্সের ৬টি গান নিয়ে একটি কোলাবোরেশন করেছি। করোনার পরিস্থিতি তৈরি না হলে এরইমধ্যে ভারতবর্ষেও বিভিন্ন জায়গায় এই কাজটি নিয়ে শো করা হয়ে যেত এত দিনে। তবে আশা করছি, সব ঠিক হলে কাজটি নিয়ে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়ব।’

ঘরবন্দি সময়েও ফরিদা পারভীনের সংগীতচর্চা থেমে নেই। বিশেষ করে বিশ্বের এই নতুন চেহারা তাকে নতুন করে জীবনে বুঝতে শিখিয়েছে বলে জানান তিনি। ফরিদার ভাষ্য, ‘সৃষ্টিকর্তা আমাদের আত্মশুদ্ধির নতুন এক সুযোগ করে দিয়েছেন। মানুষ নিজেদের সৃষ্টি, কর্ম নিয়ে কতই না গর্ব করত। কিন্তু সবই তো এখন স্থবির। লালন ফকির বলে গেছেন, সত্য কাজে কেউ নয় রাজি, সবই দেখি তা না না না। আসলেই তাই, আমরা সবাই অনেক কিছু করছি, কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে। করোনা পরিস্থিতি আমাদের শেখায়, শুধু মানবকল্যাণের জন্যই কাজ করা উচিত।’