মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই...
রবীন্দ্রনাথের ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের কপালপোড়া ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ’ করেছিল সে মরে নাই। তাও ভালো। প্রমাণ দেওয়ার মতো কেউ তার ছিল। কিন্তু হরিপদদের কী উপায়! সংসার অরণ্য তার। তার খোঁজ করার কেউ নেই। তার জন্য শোক করারও কেউ নেই। কাদম্বিনীর মতো ‘মরিয়া’ হলেও হরিপদরা সংসারে তার বাঁচার দাবি কার কাছে করবে উত্থাপন? হরিপদদের চিনতে কারোরই অসুবিধে হওয়ার কথা না। বাংলার চিরায়ত বোবা কেরানিকুলের ডাকনাম হরিপদ। সাত চড়ে তাদের রা নেই। প্রশ্ন করার সাহস নেই। জবাব চাইবার অধিকার নেই। হরিপদরা কলের পুতুল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসে-যায়। তাদের হাসি-কান্না-দুঃখ-অভাব-অভিমান-অভিযোগ একই রকম। আলাদা নাম-পরিচয়ে এদের ডাকলে শব্দের অপচয়। এই দম দেওয়া মাটির পুতুলেরই অধুনা সংস্করণ নিম্নমধ্যবিত্ত। অধুনা হরিপদদের থাকে পালিশ করা জুতো, ইস্ত্রি করা জামা, এমনকি কারও কারও গলায় থাকে টাইয়ের চিকন ফাঁস। দারিদ্র্যসীমার ওপরে এদের বাস। বুক ফাটলেও মুখ না ফোটাই তাদের নিয়তি। হরিপদরাই আদতে সার্কাসের সং। জীবনের চিকন দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যায়। তাদের জীবনটাই ক্ষেত্রবিশেষে ব্ল্যাক কমেডি।
প্রভুদের সংসারে হরিদাস পাল...
পৃথিবী অতিক্রম করছে ক্রান্তিকাল। মহামারীতে দেশে দেশে মাতম চলছে। কেউ কাঁদছে স্বজন হারিয়ে, কেউ বইছে জীবিকার শোক। মহামারী সামাল দিতে বঙ্গভূমের হরিপদরাও সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছে। তাদের আসন্ন দিনগুলো জীবনানন্দের কবিতার মতো ধূসর। কিন্তু বান্ধব-স্বজনের সঙ্গে মন খুলে সুখ-দুঃখের দুটি আলাপ করে মনের ভার লাঘবেরও উপায় নেই। নতুন বাজেটে কথারও দাম বেড়েছে। শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় আট মণ চাল কেনার দিন যেমন গত হয়েছে, তেমনি গত হয়েছে ডিজুসের কলরেটে সস্তায় আলাপের দিন। ফোনে একশ টাকা রিচার্জ করলে এখন রাজকোষে জমা হবে এক-চতুর্থাংশ। ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজা-উজির মারাও আর সস্তা কাজ থাকছে না। ডিজিটাল বাংলাদেশে নতুন বাজেটে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনেরও খরচা বেড়েছে। বাড়তি বাজার-মূল্যের জামানায় হরিপদদের জীবনের দামটাই শুধু নিম্নগামী। কাদম্বিনীর মতোই তারও জীবনের হিসাব যেন মেলে না। কাদম্বিনীর মতোই হরিপদদেরও বেঁচে থাকাটাই যেন অপরাধ। মহামারীর মধ্যে অফিসযাত্রার খরচ বেড়েছে। পরিবহনের প্রভুরা স্বাধীন ও সার্বভৌম। ইচ্ছামতো বাড়িয়ে নিয়েছে বাসের ভাড়া। ভাড়ার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন করাটা সার্কাসের সং-এর কাজ নয়। সঙেরা সংঘবদ্ধ নয়। কৃষকরাও না। তারা ধানের ন্যায্যমূল্য হাঁকতে পারেন না। কৃষকের ধানের দাম ঠিক করে নগরের কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু পরিবহন-প্রভুরা কারও অধীন নয়। তারা সংঘবদ্ধ। মুহূর্তেই দেশ অচল হয়ে যায় প্রভুদের ইশারায়। হরিপদরাই শুধু একাকী ও বিচ্ছিন্ন। তাই, প্রশ্ন গিলে খেয়ে তারা শিখতে থাকে দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার দুরূহ কসরত। বাসপ্রভুদের মতোই, স্বাধীন ও সার্বভৌম হাসপাতাল-প্রভুরাও। আগে ছিল বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। এখন বেসরকারি হাসপাতালে ছুঁলে ৩৬ ঘা। এই মহামারীর মধ্যে ‘সাহেব-সুবো’দেরই জেরবার হয়ে যাচ্ছে। অক্সিজেনের অভাবে জল থেকে তোলা মাছের মতো কাতরাচ্ছে অসুস্থতা। এই মওকায় সিলিন্ডারের দাম আকাশ ছুঁয়েছে! চড়াদামের বাজারে অসুস্থ হওয়া হরিপদদের ‘কম্ম’ নয়। ধনী যারা, যারা ননির পুতুল, ফুলের টোকায় যাদের গায়ে ব্যথা হয়, এখন শুধু তাদেরই অসুস্থ হওয়া মানায়। তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে বিলাসবহুল হাসপাতালের সেবাবিক্রেতারা। বিক্রি করতে গিয়ে হাসপাতাল-প্রভুরা ইচ্ছামাফিক রোগীদের গলা কাটবে। নিজের গলাকাটার কথা হরিপদরা ভাবতেও পারে না। অতএব, অসুস্থ হওয়ার বিলাসিতা তাদের মানায় না। ননির পুতুলদের এক প্রভু অবশ্য হরিপদদের উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘গরিবদের এক ধরনের শক্তি থাকে। তাই, শ্রমিকরা করোনায় কম আক্রান্ত’ হন। হরিপদরা এই কথায় শক্তি পায়। ঠিক যেমন শক্তি পায়, ‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছো মহান, তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান’ কবিতার বাক্যে।
হরিপদরা সেলাই শ্রমিকের মতো অত গরিব না। তাদের বাস দারিদ্র্যসীমার অনেক ওপরে। এমনকি কিঞ্চিৎ বিলাস-ব্যাসনও করে আধুনিক হরিরা। মোটা চাল খেয়ে জিহ্বায় প্রলেপ পড়ে গেলে জিহ্বার স্বাদ বদলাতে মাসে কোনো এক দিন তাদের বাড়িতেও হয় চিকন চালের ভাত। হরিপদরা আরেকটা জায়গাতেও কুলি-কামিন-শ্রমিক-মজুরদের চেয়ে উন্নত। শ্রমিকদের করোনা না হলেও অন্য অনেক রোগ-বালাই হয়। এসব অসুখ-বিসুখ নিয়ে শ্রমিকরা সাধারণত ধরনা দেয় সরকারি হাসপাতালে। সেখানে প্রভুর আসনে থাকা ‘ডাক্তার স্যারেরা’ই তাদের ভরসা। যদিও এই টেস্ট, ওই টেস্ট করতে ‘স্যারেরা’ গরিব-গুর্বোগুলোকে পাঠায় বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে। কিন্তু হরিপদরা শুরুতেই চলে যায় বেসরকারি হাসপাতালে। যদিও বিল দিতে গিয়ে তারা চোখে-মুখে আন্ধার দেখে। এইখানে, জনান্তিকে বলে রাখা ভালো, হাসপাতাল-প্রভুরাও স্বাধীন। যে যার ইচ্ছামতো দাম হাঁকে। হাসপাতাল-প্রভুদের মতোই স্বাধীন টেলিকম ও বাড়িওয়ালা প্রভুরা। নিজের খুশি মতো তারা হরিপদদের ওপরে চাবুক চালায়। এমনকি যে সিএনজিচালক, যাকে হরিপদের চেয়েও খাটো এবং আদতে হরিদাস ভাবা হয়, সংঘবদ্ধ অবস্থায় তারও শক্তি কম নয়। দিনের পর দিন তারা অচল করে রাখতে পারে রাজনগর। তাদের হাতে জিম্মি হয় হরিপদকুল। উঁচুতলার প্রভুদের অবশ্য সিএনজি-প্রভুদের সঙ্গে বিশেষ লেনদেন নেই। কারণ তাদের রয়েছে নিজস্ব শকট। এই দেশে সংঘবদ্ধ প্রভুদের স্বাধীনতা আছে। পরিবহন-প্রভু, বাড়িওয়ালা-প্রভু, সিএনজিচালক-প্রভু, উবার-পাঠাও-প্রভু, টেলিকম-প্রভু, বেসরকারি হাসপাতাল-প্রভু, ডাক্তার-প্রভু, ইন্টারনেট সেবাদাতা-প্রভু, ওষুধ কোম্পানি-প্রভু, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী-প্রভু, সরকারি দল-প্রভু, বেসরকারি দল-প্রভুরা সবাই সংঘবদ্ধ, সবাই স্বাধীন। তারা হয় অবরোধ ডেকে, নয় সেবা বন্ধ রেখে, নয় দাম বাড়িয়ে নিজের আখের গোছাতে পারে। কিন্তু হরিপদরা চিরকাল হরিদাস পাল। জিম্মি হওয়াই তাদের নিয়তি। গায়ের ছাল উঠে গেলেও রা-টি তাদের কাড়ে না। জীবনের দাম বাড়ানোর ইচ্ছায় দর-কষাকষি করতে কোনো দিন তারা সংঘবদ্ধ হয় না। হরিপদরা তাই হরিদাস পালের নামান্তর হয়ে বাঁচে।
আইডিয়া অব বাংলাদেশ
হরিপদ বা হরিদাস পালদের বিন্দু বিন্দু ঘামের টাকা জমা হয় যে রাজকোষে, সেই রাজভাণ্ডার এভাবেই কি লোপাট হওয়ার কথা ছিল বিদ্যুতের খাম্বা-বালিশ-বই আর পর্দার পেছনে? যেই হরিদের করের অর্থে গঠিত হয় রাজকোষ, সেই রাজকোষের কড়ি প্রণোদনা হিসেবে যোগ হবে ননির পুতুলদের ব্যাংকের হিসাবে আর রাজকোষাগারে অর্থ জোগানদাতার ভাগ্যে জুটবে উৎসাহব্যাঞ্জক বুলির ব্ল্যাক কমেডি, এমনই কি হওয়ার কথা ছিল? ঋণ অনুমোদন না দেওয়ার অপরাধে ব্যাংকের বড় কর্তাকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে শায়েস্তা করেছে এক প্রভুচক্র। আইন ও ন্যায়-বিচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রভুরা আকাশপথে বায়ু-শকটে উড়াল দিয়েছেন। আমাদেরও বীরত্ব কম নয়! প্রভুদের ফেলে যাওয়া স্থল-শকট জব্দ হয়েছে। এই তামাশাই কি রচিত হওয়ার কথা ছিল? এটাই কি ছিল ৭১-এর আইডিয়া অব বাংলাদেশ?
এভাবে দশকের পর দশক ধরে পরতে পরতে দূষণ জমা হয়েছে। এভাবে দশকের পর দশক ধরে মাফিয়া-প্রভুরা দখল নিয়েছে। মাফিয়াদের ভেল্কির নিচে চাপা পড়েছে সবার জন্য সুষমবণ্টনের স্বপ্নে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে রচিত বাংলাদেশের ধারণা। স্তরে স্তরে দেখা দিয়েছে আস্থার সংকট। নেতা-আমলা-প্রজা-ভৃত্য কেউ কাউকে আর আস্থায় নিতে পারছে না। করোনা জীবাণুর মহামারী এসেছে, আবার চলেও যাবে। কিন্তু অনাস্থার জীবাণুতে এ দেশে যে মহামারী চলছে, তার অবসান কোথায়?
‘ওপরে-ওপরে ফিটফাট, ভেতরে সব সদর-ঘাট’ হয়ে আছে। সমবেত এই ভাঁওতাবাজি কি আমাদের ব্যথিত করে না? অক্সিজেনের জন্য ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে প্রাণপণে ছুটতে থাকা বাবা-মায়ের আর্তি আমাদের হৃদয়ে কি দাগ কাটে না? মহামারীর মধ্যেও দুর্নীতি থেমে নেই। যে যেভাবে পারছে টু-পাইস হাতিয়ে নিচ্ছে। লিংক-লবি-টাকা-নেটওয়ার্ক থাকলে সব সিস্টেম পদানত, নইলে হরিদাস পালের জীবনের কানাকড়ির দাম নেই। সাধারণ নাগরিকের জীবন হবে কাদম্বিনীর চেয়ে অনাদরণীয়, এটাই কি ছিল ১৯৭১-এর আদর্শ বাংলাদেশের স্বপ্ন?
সংসারের কোনো বদল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। বদলের জন্য উদ্যোগ নিতে হয়। রোজকার এই মরণ, এই ধুঁকে ধুঁকে বাঁচা, এই মাফিয়াতন্ত্র পাল্টাতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে সাধারণের অধিকার। নইলে আজ জন্ম নেওয়া শিশুর সামনে আপনিও অপরাধী। শিশুকে শোনানো হবে নীতিনৈতিকতায় ভরা সৎ-সাহসী-সুদূর বাংলার এক কাগুজে গপ্প। কিন্তু বাস্তবে সে দেখবে, সৎ ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার হোসেনরা লাশ হয়ে যায় মাফিয়াদের ইশারায়। এই বাস্তবতায় সেও যদি হতে চায় মাফিয়া; টাকা, পেশি ও নেটওয়ার্কের জোরে সে-ও যদি সব নিতে চায় নিজের নিয়ন্ত্রণে, তাকে কোন অধিকারে নেব কাঠগড়ায়? নাকি সেই শিশুকেও দিতে চান হরিপদনাম্নী হরিদাস পালের জীবন? ধুঁকতে ধুঁকতে একদিন ক্লান্ত হয়ে কাদম্বিনীর মতো এই নয়া হরিদাসও কি মরিয়াই মুক্তি লইবে? মানুষের চেহারায় হরিপদরা কি কেবলি হরিদাস পাল? জীবনে ও মরণে কাদম্বিনীর মতো হরিরা কি ছাইদানি ভরা শুধুই মরা আগুন?
লেখক
কবি ও সহকারী অধ্যাপক
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
afroja.shoma@gmail.com