শততম দিনেও করোনা মোকাবিলার দিশা নেই

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শততম দিন পেরুলো সোমবার। শততম দিনে দেশে করোনা সংক্রমিত শনাক্তের সংখ্যা ৯০ হাজার ৬১৯ জনে পৌঁছে গেছে। এরই মধ্যে করোনায় মারা গেছেন ১ হাজার ২০৯ জন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত সর্বমোট ৩৪ হাজার ২৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে এখন দেশের মোট ৫৮টি ল্যাবরেটরিতে গড়ে প্রতিদিন মোট ১৪ থেকে ১৫ হাজার নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। আর দেশে এ পর্যন্ত মোট ৫ লাখ ১৬ হাজার ৫০৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার পর ১৮ মার্চ করোনায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কিন্তু বিগত তিন মাসেরও বেশি সময়ে একদিকে সাধারণ ছুটি ও তথাকথিত লকডাউন পরিস্থিতি; আরেকদিকে স্বাস্থ্যসেবা খাতের বেহাল দশা আর পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে মানুষের ভোগান্তি নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা হলেও করোনা মোকাবিলার কোনো সুনির্দিষ্ট দিশা দেখাতে পারছে না সরকার।

প্রতিদিনই শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো আত্মীয় বা স্বজনের সংক্রমিত হওয়ার বা মারা যাওয়ার খবর পাচ্ছে মানুষ। এ অবস্থায় প্রায় লাখো শনাক্ত আর হাজারের বেশি মৃত্যুর ঘটনায় জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। কেননা, চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে পুলিশ, সাংবাদিক, ব্যাংকারসহ নানা পেশাজীবী আর কর্মজীবী সাধারণ মানুষ তো বটেই এমনকি মন্ত্রী, এমপি, সচিব, রাজনীতিকসহ সমাজের সব স্তরের মানুষই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু কেউই জানেন না কবে কীভাবে এই মহামারীর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। দুই মাসের বেশি সাধারণ ছুটির পর ‘জীবন ও জীবিকা’ দুটোই রক্ষার কথা জানিয়ে সবকিছু খুলে দেওয়া হলো। জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘হার্ড ইমিউনিটির’ পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। বলা হলো, প্রয়োজনে আবারও সাধারণ ছুটি কিংবা কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হবে। কিন্তু দেখা গেল একদিকে কাজ হারিয়ে, ছাঁটাই হয়ে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, নিম্নবিত্ত আর হতদরিদ্ররা মানবেতর জীবনে বাধ্য হচ্ছে; আরেক দিকে লাখো কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ আর করোনাকালের বাজেট ঘোষিত হলেও সাধারণ মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এখন একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এই নীতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যেমন স্বাভাবিকতা আনা যায়নি তেমনি করোনা মোকাবিলার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কিংবা চিকিৎসা পরিস্থিতিরও কোনো উন্নতি ঘটানো যায়নি। ফলে সরকারি নীতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে সাধারণ মানুষ।

দুনিয়ার অন্যান্য দেশ যেখানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এনে লকডাউন তুলে নেওয়ার পথে অগ্রসর হয়েছে সেখানে আমরা ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়েও তথাকথিত হার্ড ইমিউনিটির অনিশ্চিত পথে যাত্রা করলাম। বিগত ১ জুন সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক সভায় দেশকে সংক্রমণের ঘনত্ব বিবেচনায় রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করে এলাকাভিত্তিক কঠোর লকডাউন প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। গত ১০ জুন করোনা মোকাবিলা জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও সংক্রমণ ঠেকাতে পূর্ণ লকডাউন প্রয়োজন বলে মত দিল। তারও আগে গত এক মাস ধরেই জোনভিত্তিক ভাগ করে করোনা নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৭টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৮টি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১১টি এলাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপুর্ণ রেড জোন ঘোষণা করল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু সোমবার পর্যন্ত রাজধানীর একটি এলাকা এবং ঢাকার বাইরে দুটি জেলায় সীমিত আকারে কিছু লকডাউন ছাড়া এখনো কোথাও পূর্ণমাত্রায় লকডাউন শুরু করা যায়নি। এমনকি ঠিক কবে নাগাদ পূর্ণমাত্রায় লকডাউন শুরু হবে, তাও সঠিক করে বলতে পারছেন না স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। কিন্তু দ্রুততম সময়ের মধ্যে জোনভিত্তিক লকডাউন প্রয়োগ করা জরুরি।

সর্বশেষ সোমবার সবচেয়ে বিপজ্জনক লাল ও বিপজ্জনক হলুদ জোনগুলেতে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সব ধরনের অফিস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে সরকার। এসব এলাকার বাসিন্দাদের এবং এসব এলাকায় যারা কাজ করেন তাদেরও এ সময় ছুটি পালন করতে বলা হয়েছে। তবে সবুজ জোন হিসেবে ঘোষিত এলাকার অফিসগুলো সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে খোলা থাকবে। এই পরিস্থিতিতে আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছুটি ঘোষণা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। লাল ও হলুদ জোনে অফিস বন্ধ রাখা এবং সর্বত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো এলাকাভিত্তিক লকডাউন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা না হলে এতে কী ফল পাওয়া যাবে। করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় মানুষের আস্থা অর্জন করা এবং কোন পথে কীভাবে করোনা মোকাবিলা করা হবে সে বিষয়ে জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া ছাড়া এই সংকট উত্তরণের কোনো দিশা দেখা যাচ্ছে না।