পশ্চাৎপদ কর ব্যবস্থার ফাঁদে টেলিকম খাত : অ্যামটব

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল সেবার ওপর বর্ধিত সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব)। দেশের অর্থনীতিতে টেলিযোগাযোগ খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান থাকা সত্ত্বেও সরকার নিয়মিতভাবে আরও বেশি করে কর আরোপের মাধ্যমে এই খাতকে দুর্বল করে তুলছে। সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করা ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নতুন করে শুল্ক আরোপ করায় মোবাইল সেবায় খরচ বেড়ে যাওয়ায় এর ব্যবহার কমে যেতে পারে। এতে সরকার উল্টো রাজস্ব হারাতে পারে।

গতকাল ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অ্যামটব নেতারা এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অ্যামটব সভাপতি মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, মহাসচিব এস এম ফরহাদ, বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার তাইমুর রহমান, রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম, গ্রামীণফোনের হেড অব পাবলিক অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হোসেন সাদাত।

অ্যামটব সভাপতি মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে টেলিযোগাযোগ খাত আরও একবার ডিজিটাল বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে সরে গেছে। যখন আমরা দেশের ডিজিটাল বিভাজন বন্ধ করার প্রাণান্ত চেষ্টা করছি, ঠিক সে সময়ে সম্পূরক শুল্ক আবারও বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এটা সীমিত আয়ের মানুষদের মোবাইল সেবাপ্রাপ্তি থেকে আরও দূরে সরিয়ে নেবে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশের দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

মাহতাব আরও বলেন, ৪৫ শতাংশ (অতালিকাভুক্ত অপারেটরদের জন্য) করপোরেট ট্যাক্স বিশ্বের সর্বোচ্চ, ২ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার ট্যাক্স লাভের মুখ দেখতে না পারা অপারেটরদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এছাড়া আপিল করার আগেই বিতর্কিত ভ্যাট দাবির ৫০ শতাংশ অগ্রিম অর্থ প্রদানের বিধান বিচারপ্রাপ্তির মূলনীতির লঙ্ঘন, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা প্রেরণ করে।

টেলিকম খাতের অর্থনৈতিক অবদান উল্লেখ করে মাহতাব বলেন, ‘বর্তমানে শিল্পটি দেশের জিডিপিতে ৭ শতাংশ অবদান রাখছে যা সহজেই দুই অঙ্কের ঘরে নেওয়া সম্ভব হবে যদি এই শিল্পের যথাযথ সদ্ব্যবহার করা যায়। গ্রাহক এবং আমাদের শেয়ারহোল্ডারদের ওপর চাপ না দিয়েও সরকারের পক্ষে এই খাত থেকে আরও বেশি রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব। আমরা এর উপায় বের করার জন্য সরকারের সঙ্গে একই সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।’

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বৃহস্পতিবার সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের যে বাজেট উত্থাপন করেছেন, তাতে মোবাইল সিম বা রিম কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে সেবার বিপরীতে সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করেন। সেদিনই এনবিআর এসআরও জারি করায় গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই মোবাইল সেবায় বাড়তি হারে সম্পূরক শুল্ক কাটা শুরু হয়। ফলে মোবাইল ফোনে কথা বলা, এসএমএস পাঠানো এবং ডেটা ব্যবহারের খরচ বেড়েছে গ্রাহকদের।

সংবাদ সম্মেলনে অ্যামটব মহাসচিব এস এম ফরহাদ বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান থাকা সত্ত্বেও সরকার নিয়মিতভাবে আরও বেশি করে কর আরোপের মাধ্যমে এই খাতকে দুর্বল করে তুলছে। এই নতুন করে কর বৃদ্ধি দরিদ্র মানুষের ওপরে অসহনীয় বোঝা হয়ে পড়বে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য নেতিবাচক, যা করোনাভাইরাস সংকটের কারণে আরও ত্বরান্বিত হবে। মোবাইল শিল্প খাতটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হবে।

টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আমাদের কথা শুনে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় ছাড় দেওয়ার কথা বলেছেন, কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটেনি জানিয়ে অ্যামটব মহাসচিব বলেন, ‘সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করা ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এখনো মোট গ্রাহকের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ফিচার ফোন ব্যবহার করে, তারা কথা বলা বা এসএমএস করে থাকে। তারা ব্যবহার কমিয়ে দিলে রাজস্ব আসবে না এবং সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধিতে মূল চাপটা গ্রাহকের ওপর পড়বে জানিয়ে ফরহাদ বলেন, ‘তারা ব্যবহার কমিয়ে দিলে রাজস্ব কমে যাবে। অপারেটরদের আয়ের ৫১ থেকে ৫৭ শতাংশ সরকারের রাজস্বে চলে যায়। অপারেটররা আয় করলে সরকারের রাজস্বও বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। তাই পুরো ট্যাক্স পলিসি রিভিউ করা উচিত।’

সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধিতে ৪০০ কোটি টাকার মতো সরকার গেইন করবে। তবে এ খাতের সার্বিক দিক বিবেচনায় সরকার অনেক খাতেই রাজস্ব হারাবে। তিনি বলেন, দেশে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার নিয়মিত কাজ করছে। নতুন করে করারোপ ফ্রিল্যান্সাররা ব্যবহার কমিয়ে দিলে এ খাতে আয় কমে যাবে, মহামারীর সময়ে ই-কমার্স মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দাঁড়াচ্ছে, সব মিলে সরকারের ক্ষতির দিকটাই বেশি। শর্ট টাইম লাভের আশায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হারাবে। মহামারীর সময়ে এই সিদ্ধান্ত বোধগম্য হচ্ছে না। এর যুক্তি কোথায় আমরা বুঝতে পারছি না।

বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, ১৪টি দেশে ভিওনের ব্যবসা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো এত কর অন্য দেশে নেই। এ কারণে বিনিয়োগ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে।

গ্রামীণফোনের হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হোসেন সাদাত বলেন, এ সিদ্ধান্ত গ্রাহকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। সরকারের কাছে বিবেচনার দাবি জানাই।