সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ত্বরিত পদক্ষেপ নিন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীতে গত এক সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। আর এই ১০টি দেশের মধ্যে করোনা পরীক্ষার হারে বাংলাদেশ রয়েছে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে। জাতিসংঘ সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, করোনা মহামারীতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে ২৫টি দেশ এরই মধ্যে সংক্রমণের পিক বা সর্বোচ্চ চূড়া অতিক্রম করে ফেলেছে। আর এখনো সংক্রমণ বাড়ছে এমন ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪ নম্বরে। তবে সংক্রমিতদের মধ্যে মৃত্যুহারে বাংলাদেশ রয়েছে ১৭তম অবস্থানে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন এ হিসাব দিচ্ছে তখন দেশে সব মিলিয়ে দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা লাখ ছুঁইছুঁই করছে আর করোনায় মারা গেছে অন্ততপক্ষে ১ হাজার ২৬২ জন। কিন্তু দেশে এখনো করোনার পরীক্ষা আর চিকিৎসার জন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর দ্বারে দ্বারে চিকিৎসাপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি আর আহাজারি থামছে না। এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্যবিদরা বারবার হুঁশিয়ার করছেন যে, এলাকাভিত্তিক কঠোর লকডাউনসহ মানুষজনের অবাধ চলাচল বন্ধ করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিলে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

এ অবস্থায় সরকার সম্প্রতি দেশকে সংক্রমণের ঘনত্ব বিবেচনায় রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করে এলাকাভিত্তিক কঠোর লকডাউন প্রয়োগ করার যে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে তার দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিগত ১ জুন সরকারের উচ্চপর্যায়ের সভায় এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সত্ত্বেও এখনো তার প্রয়োগ শুরু করা যায়নি। উল্লেখ্য, গত ১০ জুন করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও সংক্রমণ ঠেকাতে পূর্ণ লকডাউন প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৭টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৮টি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১১টি এলাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রেড জোন ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু ঠিক কবে নাগাদ রেড ও ইয়োলো জোন হিসেবে চিহ্নিত এসব এলাকায় পূর্ণমাত্রায় লকডাউন শুরু হবে, তাও সঠিক করে বলতে পারছেন না স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জোনভিত্তিক লকডাউন প্রয়োগ করা না হলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়বে বলে সতর্ক করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। একই সঙ্গে রেড ও ইয়েলো জোনগুলো পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং ওই সব এলাকার বাসিন্দাদের খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহসহ নিত্য প্রয়োজনগুলো মেটাবার ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। নইলে রেড ও ইয়েলো জোনের বাসিন্দারা অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়তে পারেন বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।  

এলাকাভিত্তিক লকডাউন প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো, রেড জোনগুলোতে বসবাসকারী সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা। একই সঙ্গে রেড জোন এলাকায় অবস্থিত সব সামরিক-আধাসামরিক, সরকারি-আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত-আধাস্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি দপ্তরগুলোতেও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ইয়েলো এবং গ্রিন জোনগুলোতে ১৬ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফিস চলবে। একই সঙ্গে গ্রিন জোনগুলোতেও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ১২ দফা নির্দেশনা মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো, রেড ও ইয়েলো জোনগুলোর যথাযথ সীমানা এবং লকডাউন পরিচালনা সংক্রান্ত নিয়মাবলি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি সরকার। অবিলম্বে এই বিষয়গুলোর চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান করে যত দ্রুত সম্ভব কঠোর লকডাউন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনগুলোতে বসবাসকারী নাগরিকদেরও মহামারীর অবনতিশীল পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে নিজ নিজ উদ্যোগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, জনসাধারণ সচেতন না হলে সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। 

করোনা মহামারীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের নানা দুর্বলতা আর ব্যর্থতার বিষয়গুলো নগ্নভাবে সামনে চলে এসেছে। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার ওপরই এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু করোনাভাইরাস থেকে কভিড-১৯ রোগ ইতিমধ্যেই দেশে গণহারে ছড়িয়ে পড়ায় আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টিতেও একইভাবে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। খেয়াল করা জরুরি যে, দেশে ৫০-এর বেশি শয্যার সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কভিড ও নন-কভিড সব ধরনের রোগীকে আলাদা ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা দেওয়ার যে নির্দেশ সরকার দিয়েছে এখনো তার বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার দিক থেকেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার বৈশ্বিক হারের চেয়ে বাংলাদেশে আক্রান্তের হার বেশি। এ বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ না নিলে করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার ত্বরিত পদক্ষেপ নেবে সেটাই কাম্য।