করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ডিজিটাল নজরদারি

কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকলে অনেক দেশ রোগী শনাক্ত করার জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির আশ্রয় নেয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করে করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে বলেও দাবি করছে তারা। অন্যদিকে নজরদারি নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হচ্ছে। ডিজিটাল নজরদারি নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

ডিজিটাল নজরদারি

আপনি কোথায় আছেন, কী করছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন সবকিছু নজরে রাখাকে বলা হয় নজরদারি বা সারভেইলেন্স। যেকোনো জায়গা থেকেই এই নজরদারি করা যায়। ইন্টারনেটের সাহায্যে সিসিটিভি দিয়ে বেশির ভাগ জায়গায় সারভেইলেন্স করা হয়। সাধারণত বেশি মানুষ কোনো জায়গায় জমায়েত হলে, অপরাধ হতে পারে এমন সন্দেহে, ব্যক্তি বা দলের নিরাপত্তায় অথবা অপরাধ তদন্তে সরকার সারভেইলেন্স ব্যবহার করে। এ ছাড়া অপরাধী সংগঠনগুলো অপরাধীদের পরিকল্পনা বা বয়ান রেকর্ড করতে, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নানা জায়গায় সারভেইলেন্সের ব্যবহার আছে। অনেক দেশে সরকার যেকোনো সময় জনমানুষের চলাচলে সারভেইলেন্সের ব্যবহার করতে পারে। এর আগে নানা কারণে সারভেইলেন্সের ব্যবহার হলেও সাধারণ জনগণের ওপর এর ব্যবহার প্রকট ছিল না। তবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ করোনাভাইরাস শনাক্তকরণে সারভেইলেন্স ব্যবহার করেছে বিভিন্নভাবে। তবে এবার শুধু ক্যামেরা নয়, কাজে লাগানো হয়েছে নানা ধরনের অ্যাপ। মানুষ কখন, কার সঙ্গে কথা বলছে, যোগাযোগের সময় করোনা আক্রান্তের সংস্পর্শে এসেছে কি না এসব কিছু নজরদারি করা হচ্ছে কড়াভাবে। অনেক দেশই এ পদ্ধতি ব্যবহার করে সফল হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই সারভেইলেন্স বা নজরদারির মাধ্যমে ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ হচ্ছে কি না বা গোপনীয়তা লঙ্ঘন হচ্ছে কি না। কভিড-১৯ বিশ্বকে শিখিয়েছে যে যেভাবে পারে সেভাবেই যেন একে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। এ চেষ্টায় ইতালি বা স্পেনের চেয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর বেশি সফল ছিল। এশিয়ার দেশগুলোতেও মহামারী মোকাবিলায় চেষ্টার কমতি ছিল না, তবে এসব দেশে জনমানুষের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠেছে বেশি।

লোকেশন ট্র্যাকিং

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে বিশ্বের অন্তত ৩০টি দেশ লোকেশন ট্র্যাকিং নিয়ে কাজ শুরু করে। তবে এদের বেশির ভাগই ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। দেশগুলোতে সরকারের মূলত কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের কৌশল তৈরি করতে এবং কোন কোন জায়গায় ফোকাস করতে হবে সেটি জানতে লোকেশন ট্র্যাকিং দরকার ছিল। যদিও সরকারগুলো বলছে, এগুলো সাময়িকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু এ দুঃসময় কেটে গেলে কতদিনেও জনগণের গোপনীয়তার ওপর হস্তক্ষেপ শেষ হবে, সেটাই এখন প্রশ্ন। মহামারীর এই যুদ্ধে সারভেইলেন্সের (নজরদারি) জন্য সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি ছিল স্মার্টফোনের মাধ্যমে লোকেশন বা জায়গা শনাক্ত করা। কোয়ারেন্টাইন অবস্থায় ব্যক্তির প্রতিটি চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিছু সরকার এমন অ্যাপও তৈরি করেছিল, যেটির সাহায্যে লোকেশন ট্র্যাকিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে করোনাভাইরাস-সংক্রান্ত তথ্যও পাওয়া যাচ্ছিল। যেমন মার্চের শুরুর দিকে ব্যবহারকারীদের রিয়েল টাইম লোকেশন ডেটা সংগ্রহ করতে ‘এসি-১৯’ নামের একটি অ্যাপ তৈরি করেছিল ইরানের সরকার। ৩ মার্চ দেশের সব নাগরিককে এই অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়। মূলত করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত কি না তা শনাক্তে অ্যাপটির মাধ্যমে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে ভাইরাস শনাক্তের চেয়ে লাখো ইরানি বাসিন্দার তথ্য অ্যাপে জমা হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ আসে। তাই প্লে-স্টোর থেকে শেষ পর্যন্ত অ্যাপটি সরিয়ে নেওয়া হয়। ২৫ মার্চ, আর্জেন্টিনার স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে যারা দেশে প্রবেশ করছেন, তাদের ১৪ দিনের জন্য বাধ্যতামূলক একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়। এটিও ছিল লোকেশন ট্র্যাক করার অ্যাপ। যদিও অ্যাপের মাধ্যমে সরকার যে লোকেশন ট্র্যাকিং করছে, সেটি নিয়ে কিছু বিরূপ মন্তব্য আসছিল। এরপরও সান্তা ফে রাজ্যে অনেকটা জোর করেই কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের অ্যাপ ডাউনলোডে বাধ্য করা হয়। এদিক থেকে কিছুটা আলাদা ছিল অস্ট্রেলিয়া। তারা সরাসরি ফোনে লোকেশন ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক না করে বাড়িতে অথবা শরীরে সারভেইলেন্স ডিভাইস ইনস্টল করতে বলে। এপ্রিলের ৮ তারিখে ছোট্ট দেশ বাহরাইন করোনাভাইরাস শনাক্তে মোবাইল অ্যাপে ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট যুক্ত করে দেয়। কোয়ারেন্টাইন চলাকালীন কেউ এই নিয়ম ভঙ্গ করলে তাকে অন্তত তিন মাসের জেলের সাজা ভোগ করতে হতো। অ্যাপ ব্যবহার করে সরকারের পাওয়া তথ্য ব্যবহার করার অনুমতি ছিল কানাডার পুলিশের। ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, জন্মদিন সব তথ্যই তাদের কাছে রাখা ছিল। স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে গিয়ে গোপনীয়তা যেন ভঙ্গ না হয়, সেদিকে তারা নজর রাখার চেষ্টা করেছে।

করোনাভাইরাস নিয়ে নজরদারির প্রথমদিকের উদ্যোক্তা ছিল চীন। ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই সারভেইলেন্সের সব পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করে তারা। পাবলিক ক্যামেরাগুলোকে ফেসিয়াল রিকগনিশনের জন্য ব্যবহার করা, ফোনের মাধ্যমে লোকেশন ট্র্যাকিং, এমনকি সরকারের নির্দেশে ড্রোন ব্যবহার করাও শুরু হয়। ২০০টিরও বেশি শহরে স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং সবুজ, হলুদ ও লাল রঙের মাধ্যমে রোগের অবস্থা চিহ্নিত করা হতো। এই অ্যাপের তথ্য সরাসরি চলে যেত পুলিশের কাছে। জনবহুল এলাকা থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তৎক্ষণাৎ সরিয়ে নেওয়া হতো। সরকার থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও দেশটির বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কভিড-১৯-সংক্রান্ত নানা তথ্য দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। চীনে কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রতিটি ব্যক্তির বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে বাধ্যতামূলকভাবে সারভেইলেন্স ক্যামেরা লাগানো ছিল। জার্মানি একটি স্মার্টওয়াচ অ্যাপ তৈরি করে যার মাধ্যমে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা যেত। এ ছাড়া তাদের ছিল ব্যক্তিগত চলাচল এবং যোগাযোগের ওপর নজর রাখার জন্য ব্লুটুথ অ্যাপ। লোকেশন ট্র্যাকিংয়ে আরও নাম ছিল আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র, তুর্কি, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া, কাতার, পোল্যান্ড, পাকিস্তান, নরওয়ে, কেনিয়া, ইতালি, ইসরায়েল, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, হংকং, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, ইকুয়েডর, দুবাই, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, বাহরাইন ও অস্ট্রিয়ার নাম।

বিভিন্ন দেশের সরকার ছাড়াও করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ১৩০টি দেশের মানুষ কখন কোথায় যাচ্ছে, তার ওপর নজর রেখেছে গুগল এবং এই তথ্য তারা প্রকাশ করেছে। যেসব জায়গার ওপর গুগল নজর রেখেছে, তার মধ্যে আছে : দোকানপাট, বিনোদনের জায়গা, গ্রোসারি ও ফার্মেসি, পার্ক, সমুদ্রতীর ও প্লাজা, বাস, মেট্রো, রেলস্টেশন, অফিস ভবন এবং অন্যান্য কর্মস্থল, আবাসিক ভবন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লকডাউন জারির পর কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় মানুষের ভিড় লকডাউনের আগের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কতটা কম-বেশি, সেটা জানতে সাহায্য করছে গুগলের এই কর্মসূচি। লকডাউন কতটা কাজ করছে কিংবা ৪৮ ঘণ্টা আগে পরিস্থিতি কী ছিল, সেটাও জানা যায় গুগলের মাধ্যমে।

মোবাইল অ্যাপ

ভাইরাস শনাক্তে বিভিন্ন দেশ ব্যবহার করেছে মোবাইল অ্যাপ। ট্রেস টুগেদার অ্যাপ নিয়ে সর্বপ্রথম কাজ শুরু করে সিঙ্গাপুর। তাদের লক্ষ্য ছিল অন্তত পাঁচজনের ভেতর একজন এই অ্যাপ ডাউনলোড করবে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় এই অ্যাপ ডাউনলোড করেছিল ১ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ। বিশ্বে সর্বপ্রথম ব্লুটুথ কন্টাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ তারাই এনেছিল। জিপিএস লোকেশন এবং ব্লুটুথের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অবস্থান শনাক্তকরণ নিয়ে ভারত নিয়ে এসেছিল আরোগ্য সেতু অ্যাপ। এই অ্যাপ ডাউনলোড হয় ৫০ মিলিয়নবার। এই অ্যাপের মাধ্যমে ব্যক্তি এমন কারও সংস্পর্শে এসেছেন, যিনি পরে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন, সেই তথ্য জানা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির স্মার্টফোন থেকে পাওয়া লোকেশন ডেটার সাহায্যে কাজ করে এই অ্যাপ। সিঙ্গাপুরের ট্রেস টুগেদার অ্যাপের মতো তারাও ফোনে ব্লুটুথ সিগন্যাল চালু করেছে, যার সাহায্যে আক্রান্ত রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। ভারতীয় জনগণের জন্য অ্যাপ বাধ্যতামূলক না হলেও, সরকারের সব ব্যক্তির জন্য এটি ডাউনলোড করা বাধ্যতামূলক। দেশটিতে স্মার্টফোনের তুলনায় ফিচার ফোন ব্যবহার বেশি হওয়ায় অ্যাপ ব্যবহার করে করোনার বিরুদ্ধে লড়তে সরকারকে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়া এ ধরনের অ্যাপ নিয়ে কাজ না করলেও তারা কাজ করেছে তথ্য, প্রচার এবং সচেতনতা নিয়ে। শুরুতে তারা জোর দিয়েছে নিজেদের তথ্যভাণ্ডারে। সরকার নিয়ন্ত্রিত ‘বিগডেটা’র বিশাল তথ্যভাণ্ডারে কোরিয়ার প্রতিটি নাগরিক ও বসবাসরত বিদেশিদের সব তথ্য থাকে। প্রতিটি সরকারি সংস্থা, হাসপাতাল পরিষেবা, আর্থিক সেবা সংস্থা, মোবাইল ফোন নম্বরসহ সব ধরনের সেবা প্রদানকারীদের সিস্টেমের সঙ্গে ইন্টিগ্রেটেড এই তথ্যভাণ্ডার। যখনই কোনো করোনা পজিটিভ ব্যক্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তির ভ্রমণ ডিটেইলস, তার বিগত কিছুদিনের কর্মকাণ্ড, কোন কোন রুটে তিনি যাতায়াত করেছেন, সেই ম্যাপসহ কাছাকাছি এলাকার সব মোবাইল গ্রাহক নোটিফিকেশনে পেয়ে গেছেন। এসব নোটিফিকেশন মোবাইলের সিস্টেম পুশ হিসেবে এসেছে। যখন নোটিফিকেশন আসে তখন মোবাইলের কলসহ অন্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করোনাভাইরাস-সংক্রান্ত নোটিফিকেশন পাঠানো হয়েছে। মোবাইল নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা সংস্থার কাছেও করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিগত দু-এক সপ্তাহ কোথায়, কার সঙ্গে মিশেছেন, এসব তথ্য চলে যাচ্ছে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করা বা সময় কাটানো বন্ধু-পরিজন বা সহকর্মীদেরও সহজেই করোনা পরীক্ষার আওতায় আনা গেছে।

ফেসিয়াল রিকগনিশন সিসিটিভি সিস্টেম

কেরালার পাথানামথিতার একই পরিবারের তিনজন সদস্য যখন ইতালি থেকে ফিরে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলেন, তখন স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ বেশ কয়েকটি এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে। দেখা যায়, তারা কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার আগে অনেক মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। তাদের কারণে অন্তত ৯০০ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরও সিসিটিভি ফুটেজকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিল। ফেসিয়াল রিকগনিশন সিসিটিভি সিস্টেম হচ্ছে ভিডিও মনিটরিং এবং নজরদারির ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির একটি। সরকারদলীয় কোনো ব্যক্তি, বর্ডার প্রোটেকশন এজেন্সি, ব্যাংক, বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে সুরক্ষার জন্য এর প্রয়োজন হয়। তবে এবার এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হয়েছে করোনাভাইরাস চিহ্নিত করতে। শুরুতে চীন এটি ব্যবহার করে। বলে রাখা ভালো, চীনের বাসগুলোতে কোনো ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কি না তা জানতে থার্মোমিটারের সাহায্যে ফেসিয়াল স্ক্যানও করা হতো। আক্রান্ত হলেই এই স্মার্ট থার্মোমিটার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ড্রাইভারকে তা জানিয়ে দিত। যাত্রীরা ট্রান্সপোর্টে ওঠার সময় কার্ড সোয়াইপ করলে প্রতি যাত্রীর কপালেই থার্মোমিটারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যেত। যাত্রী ছাড়া চালককেও ট্র্যাক করা হতো, এমনকি বাসেও নিয়মিত ভাইরাসের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হতো। সর্বপ্রথম ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরার মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমিত এলাকা ওয়েনঝু থেকে হাংঝুয়ের একজন বাসিন্দা ভ্রমণ করে এলে তাকে শনাক্ত করা হয়। সেই ব্যক্তিকে দুই সপ্তাহ বাড়িতে থাকতে বাধ্যতামূলক নির্দেশ দেওয়া হয়। চীন ছাড়াও এ পদ্ধতি পরে অবলম্বন করেছিল লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ। কিছু সারভেইলেন্স ক্যামেরা আছে, যেগুলো দিয়ে ব্যক্তির শরীরে অল্প মাত্রায় জ্বর থাকলে সেটিও চিহ্নিত করা যায়। তখন করোনাভাইরাসের ঘটনাগুলো ঘটার সম্ভাবনাও জানা যায়। একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল মস্কোও। রাশিয়ার প্রধান এ শহরে ১০ হাজার ক্যামেরা বসানো হয়, যেগুলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কোয়ারেন্টাইন থাকাকালীন শহরটিতে এই পদ্ধতি করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি খুঁজে পেতে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। ভাবতে পারেন, যারা মাস্ক পরেননি তাদের জন্যই কেবল কাজ করে এই ফেসিয়াল রিকগনিশন। মাস্ক পরলে তাদের চিহ্নিত করা যাবে না। এ সমস্যার সমাধানও ছিল চীনের কাছে। চীনের হাংওয়াং টেকনোলজি ছয় মিলিয়ন বিনামাস্কের মানুষের এবং মাস্ক পরিহিত কিছু মানুষের তথ্য সংগ্রহ করেছিল। জানুয়ারির শুরুতেই তারা ঘোষণা দিয়েছিল, বেশি বা কম জ্বর থেকে শুরু করে করোনাভাইরাস-সংক্রান্ত তথ্য তাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব।

এই প্রযুক্তিতে আরও একটি নাম যুক্ত আছে, সেটি হচ্ছে থার্মাল ক্যামেরা। এটিও ভাইরাস শনাক্ত করতে সক্ষম। এই ক্যামেরার সাহায্যে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা, অসামঞ্জস্য শারীরিক তাপমাত্রা বোঝা সম্ভব, যার মাধ্যমে ভাইরাস আক্রমণের সম্ভাবনা আছে কি না, তা জানা যায়। ভাইরাস প্রাদুর্ভাব ছড়ানো শুরু করলে দুবাইয়ের শেখ রাশিদ টাওয়ারে থার্মাল ক্যামেরার ব্যবহার শুরু হয়। সেখানে আগত সব দর্শনার্থীর জন্য এটি বাধ্যতামূলক ছিল। চীনেও ভিড়ের মধ্যে থার্মাল ক্যামেরার মাধ্যমে কারও জ্বর আছে কি না, তা জানা যেত। এপ্রিল মাসে বোস্টনের একটি হাসপাতালে রোবটের মাধ্যমে নতুন এক টেলিমেডিসিন সেবার প্ল্যাটফর্ম চালু হয়। সেখানে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ভালো সেবা দিয়েছে রোবট। জার্মানির সুপার মার্কেট ও চেইন শপে হিউম্যানেইড রোবট স্থাপন করা হয়েছে, যারা কাজ করছে ক্যাশ কাউন্টারে।

রোবট ও ড্রোন

মার্চের শুরুর দিকে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়া উহানে নতুন আরেকটি আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছিল। এই ওয়ার্ডের পুরোটাই দেখাশোনা করত রোবট। রোগীদের তাপমাত্রা দেখা, খাবার ও ওষুধ দেওয়া, ওয়ার্ডকে জীবাণুমুক্ত করা সবই করত তারা। কোয়ারেন্টাইনের নানা কাজও এই রোবট করত। সিঙ্গাপুরে রোবটের মাধ্যমে হাসপাতাল পরিষ্কার করা হতো। রোবট দিয়ে কাজ করানোয় স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা একদমই কমে গেছে। চীনের কিছু এলাকায় ড্রোনের সঙ্গে ক্যামেরা যুক্ত করা হতো। ভিড়ের মধ্যে লাউডস্পিকারে সংক্রমিত ব্যক্তিকে সতর্ক করা হতো এবং তাকে নির্দেশ দেওয়া হতো বাড়ি ফিরে যেতে। ভারতের চণ্ডীগড়ে মানুষের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়। চিলিতে বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দিয়েছে ড্রোন।