উপজেলা আ.লীগ সভাপতির বিরুদ্ধে চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণের তালিকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় একাধিকবার একই ব্যক্তির নাম যেমন রয়েছে তেমনি আছে অনেক ভূয়া নামের ছড়াছড়ি।

শুধু তাই নয়, যে গ্রামে হিন্দু পরিবার নেই, তালিকায় রয়েছে অনেক হিন্দু উপকারভোগীর নাম। সরকারি চাল হজম করতে তালিকায় মৃত ব্যক্তিসহ ও একই পরিবারের স্বামী স্ত্রী ও সন্তাকে দেখানো হয়েছে ভিন্ন ধর্মের।

এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইমদাদুল রহমান মুকুল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি।

১১৮৫ জনের তালিকায়  কয়েক শ নাম রয়েছে ভূয়া।  উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেছেন, বিষয়টি ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল প্রাপ্তির তালিকায় মোট উপকারভোগী রয়েছেন ১ হাজার ১৮৫জন। ২০১৬ সালে ওই তালিকা তৈরী করা হয়। তখন থেকে উপকারভোগীদের চাল পাওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই এখনও পাননি সে সুবিধা। 

তালিকা যাচাইয়ে দেখা যায়, কোন ব্যক্তির নাম ৩ থেকে ৪ বার  রয়েছে। এদেরই একজন কুটি মিয়া। বাড়ি ইউপি চেয়ারম্যানের নিজ গ্রাম সাতাইহালে। তার নাম রয়েছে তালিকার ক্রমিক নং ৬৬৬, ৬৮০, ৭২০, ১০৭৩ নম্বরে। এছাড়া একাধিক ব্যক্তির নাম প্রায় ৫০টির মতো রয়েছে তালিকায়। প্রাথমিক যাচাইয়ে পাওয়া গেছে এর সত্যতা। রয়েছে কয়েকজন মৃত ব্যক্তির নামও। কয়েকটি গ্রামে হিন্দু পরিবার না থাকলেও দেয়া হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভূয়া নাম। তালিকায় নাম থাকলেও কোন সময়ই চাল জুটেনি, এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেল  তারালিয়া গ্রামের প্রায় ২২ জনের নাম আছে। বাস্তবে চাল পাচ্ছেন ৩ জন। ৪৯৯ নং থেকে ৫০৮ পর্যন্ত  হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘সরকার’ পদবীধারী  সম্প্রদায়ের বেশ কয়েক জনের নাম রয়েছে সুবিধাভোগী হিসেবে। গ্রামবাসীরা জানান, গোপ পদধারী  লোকজন এখানে বসবাস।  তালিকায় যে সরকার পদধারী নাম রয়েছে গ্রামবাসী কাউকেই চিনেন না। 

তালিকায় থাকা কয়েকজন মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সাথেও আলাপ করে জানা গেছে তারা জীবিত থাকতেও কোন সময় চাল পাননি, মারা যাবার পরও তারা জানেনই না যে তালিকায় নাম আছে।

মজার বিষয় হচ্ছে গজনাইপুর গ্রামেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস নেই। কিন্তু  স্বামী মুসলমান-স্ত্রী হিন্দু, পুত্র হিন্দু- পিতা মুসলমান দেখানো হয়েছে। তালিকার ৫৮২ নং থাকা নাম আঃ আহাদ, পিতার নাম দেয়া হয়েছে: গিরিজা সরকার। ৫৮৬ নং মহেশ সরকার পিতা: সুনুজ উল্লা। ৫৯২ স্বরসতী সরকার, স্বামী আকবর মিয়া। অর্থাৎ একই পরিবারের দুই ধর্মলম্বী দেখানো হয়েছে। যা  বাস্তবে নেই।
 
গজনাইপুর ইউনিয়নের কয়েকজন ইউপি সদস্যদের সাথে আলাপকালে তারা বলেন, তারা ইউপি চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুলের নির্দেশে তালিকায় ৫০টি করে নাম দিয়েছেন । বাকি নামের কোন কিছুই তাদের জানা নেই। তারা নাম দেননি অথচ নিজ এলাকার ভূয়া নামে ভরা দেখে তারা নিজেরাই বোকা বনে গেছেন।

এ ব্যাপারে গজনাইপুর ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি  ইমদাদুর রহমান মুকুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। তার দাবি, সকল ইউপি সদস্যদের সমন্বয়ের মাধ্যমেই করা হয়েছে এ তালিকা।

তিনি বলেন, তালিকা ও ইউপির সকল মেম্বারদের নিয়ে বসেছি। তা সংশোধনের  চেষ্টা চলছে। কোন কোন ক্ষেত্রে সুবিধাভোগির  নিজ গ্রামের জায়গার অন্য গ্রামের নাম হয়েছে।  ৪ বছর ধরে কেন সংশোধন করেননি প্রশ্নের জবাবে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি এই চেয়ারম্যান।

এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পাল বলেন,গজনাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুল ওই ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কমিটির সভাপতি।  এই তালিকা প্রণয়নে যদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কোন অনিয়ম করে থাকে তাহলে সেটা তদন্তে উঠে আসবে। ইতোমধ্যে উপজেল প্রানীসম্পদ কর্মকর্তা আজিজুর রহমান, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাদেক হোসেন, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্ত নুসরাত ফেরদৌসীকে তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

উল্লেখ্য, ওই ইউনিয়নের দুই ভাগে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল পরিবেশনের দায়িত্বে রয়েছেন দুজন ডিলার। লিটন চন্দ্র দেব ও মনির মিয়া। নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে ডিলার লিটন চন্দ্র দেবের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে।