বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের ধাক্কায় বিপর্যস্ত তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশ সৌদি আরব। টানা ১০০ দিনেরও বেশি লকডাউনে দেশটিতে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। এতে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক। সংকট সামাল দিতে চলতি বছরের শেষ নাগাদ অন্তত ১২ লাখ শ্রমিককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি সরকার। সৌদি সরকারের এ সিদ্ধান্তে দুই লাখের মতো বাংলাদেশি শ্রমিক দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন শ্রমিকদের মধ্যে নতুন শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশেষ বিমানযোগে বাংলাদেশিদের ফেরত আনার কাজ শুরু করেছে সরকার। এরই মধ্যে কয়েক হাজার প্রবাসী দেশে ফেরার জন্য দূতাবাসে আবেদন করেছেন। তাদের মধ্যে গত বুধবার ৩৫৭ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে দূতাবাস। আগামীকাল শনিবার তাদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। এছাড়া সোমবার জেদ্দা থেকে ৪০০ ও রাজধানী রিয়াদ থেকে আরও ৪০০ জনের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, সৌদি থেকে বাংলাদেশিদের ফেরাতে দুটি বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। রিয়াদ থেকে ঢাকা ফ্লাইটের ইকোনমিক ক্লাসের ভাড়া ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮০০ সৌদি রিয়াল ও বিজনেস ক্লাসের ভাড়া ৩ হাজার ৮০০ রিয়াল। আর জেদ্দা থেকে ঢাকা ফ্লাইটের ইকোনমিক ক্লাসের ভাড়া ৩ হাজার ৩০ রিয়াল ও বিজনেস ক্লাসের ভাড়া ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩০ সৌদি রিয়াল। নিজ খরচে দেশে ফিরতে ইচ্ছুক প্রবাসীদের নিবন্ধন করতে বলেছে দূতাবাস। এছাড়া এ ফ্লাইটে ফিরতে ‘করোনায় আক্রান্ত নয়’ এ সংক্রান্ত সৌদি কর্র্তৃপক্ষের সনদও থাকতে হবে। এরই মধ্যে ফ্লাইট ভাড়া নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শ্রমিকরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে ৩০-৪০ হাজার টাকা দেশে আসা-যাওয়ার টিকিট খরচ পড়ত। অথচ করোনা সংকটের মধ্যে শুধু ফেরার জন্য বিমানভাড়া দ্বিগুণ ধরে ন্যূনতম ৬০ হাজার টাকা করা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, একদিকে ফ্লাইটের স্বল্পতা, অন্যদিকে ফিরতে ইচ্ছুকদের হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এ কারণে ভাড়া বেশি পড়ছে।
সৌদি আরবের রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম ও মক্কায় কর্মরত কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা তিন মাসেরও অধিক সময় কাজ বন্ধ থাকায় ইতিমধ্যে পথে বসেছে অভিবাসীশ্রমিকরা। প্রথম দিকে অনেক দাতব্য সংস্থা, সৌদি সরকার ও নিয়োগদাতারা আর্থিক সহযোগিতা করলেও এখন সেটি নেই। এ অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশি শ্রমিক। অনেকে দেশ থেকে টাকা এনে প্রাত্যহিক খরচ মেটাচ্ছেন। কেউ কেউ ‘ভিক্ষাবৃত্তি’ করছেন। তবে সম্প্রতি সৌদিতে আসা শ্রমিকদের অবস্থা শোচনীয়। কারণ তারা চাইলেও দেশ থেকে টাকা আনতে পারছেন না। এ পরিস্থিতিতে দেশে ফিরতে আগ্রহী শ্রমিকদের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবারও সৌদিতে ফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তা ভর করেছে।
রিয়াদ থেকে আল আমিন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খাবারের অভাবে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক রিয়াদে কঠিন দিন পার করছে। এসব শ্রমিক এত টাকা দিয়ে দেশে ফিরবে কী করে?’
ভাড়া বাড়ানো প্রসঙ্গে জানতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোকাব্বির হোসাইনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া মেলেনি। এমনকি এসএমএস পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের শ্রমিকদের দেশে ফেরত আনা হচ্ছে। যে দেশ শ্রমিক নেয় তাদের নীতির সঙ্গে দ্বিমত করলে ভবিষ্যতের জন্য সেটা ভালো হয় না। তবে এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়া হলে সেটা অবশ্যই দুঃখজনক।’
সৌদিপ্রবাসী বাংলাদেশিরা জানান, মে মাসের শেষদিকে করোনা সংক্রমণ কিছুটা কমতে শুরু করলে ‘সীমিত পরিসরে’ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালুর অনুমতি দেয় সৌদি কর্র্তৃপক্ষ। এতে চরম আর্থিক সংকটে পড়া অভিবাসীশ্রমিকরা কিছুটা আশার আলো দেখতে শুরু করে। তবে জুনের প্রথম সপ্তাহে সেখানে ফের করোনা সংক্রমণের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী হয়। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সৌদিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখের মতো। গত বুধবার পর্যন্ত দেশটিতে মারা গেছে ১ হাজার ৯৫ জন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা ৩৫৩ জন। দেশটিতে করোনায় বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশিরা বেশি মারা গেছে বলে জানা গেছে।
জেদ্দাপ্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক সাইফুল রাজীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৌদি আরবের অর্থনীতি মূলত তেল ও হজনির্ভর। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তাই গত এপ্রিলে তেলের উৎপাদন কমিয়ে দেয় দেশটি। মজুদ রাখার পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় পানির দরে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটি। এতে অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগে নির্মাণাধীন উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের কাজও থমকে গেছে। যার বড় প্রভাব পড়েছে অভিবাসীশ্রমিকদের ওপর। অধিকাংশ কোম্পানিই শ্রমিকদের বেতনভাতা পরিশোধ করছে না। কিছু কিছু কোম্পানি শ্রমিকদের শুধু খাওয়ার খরচ বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দেশটিতে থাকা শ্রমিকরা মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।’
মক্কাপ্রবাসী সাংবাদিক জাবেদ আহমেদ বলেন, ‘প্রতি বছর ২৫ লাখ মানুষ সৌদিতে হজ করতে আসে। সৌদি সরকারের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে এ খাতে ১২ বিলিয়ন ডলার সরাসরি আয় হয়। এছাড়া হাজিরা সেখানে ২৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। হজ উপলক্ষে মক্কা ও মদিনার হোটেলগুলোতে অভিবাসীশ্রমিকদের বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে এ বছর হজ হবে কি না, এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত জানায়নি সৌদি সরকার।’
অতিরিক্ত সচিব শহিদুল আলম বলেন, ‘শ্রমিকদের ফেরত আসাটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। তবে দেশের মানুষ দেশে এলে খুব বেশি অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।’ জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহামারীর কারণে সব দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। সৌদি আরব ফেরত পাঠাতে চাইলে আমাদের কিছু করার নেই। প্রবাসীরা এতদিন শুধু দেশকে দিয়েছে। এখন দেশের উচিত তাদের জন্য কিছু করা। এসব শ্রমিককে প্রণোদনা দিয়ে দেশেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি ভালো হলে তাদের আবারও পাঠানো যাবে।’}