কুড়িগ্রামের সাবেক আরডিসি (সিনিয়র সহকারী কমিশনার, রাজস্ব) নাজিম উদ্দিনের সম্পদের হিসাব চেয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাকে চাকরিতে যোগদানের সময় জমা দেওয়া সম্পদের হিসাব বিবরণীর পরিপূরক সম্পদ বিবরণী জমা দিতে বলা হয়েছে। গত ১৯ মে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় সব কমকর্তা-কর্মচারীকে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দিতে হয়। নাজিম উদ্দিন যোগ দিয়েছিলেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে। ওই সময় তার জমা দেওয়া সম্পদের হিসাব বিবরণীর সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সম্পদের মিল খুঁজে পাচ্ছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ কারণে তাকে সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দিতে বলা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়েছে, কুড়িগ্রামের সিনিয়র সহকারী কমিশনার বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত সিনিয়র সহকারী সচিব নাজিম উদ্দিনের নামে-বেনামে বিভিন্ন স্থানে অবৈধ সম্পদ অর্জন করার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসব সম্পদের সঙ্গে তার চাকরিতে যোগদানকালীন সম্পদ বিবরণীর মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
গত ১৩ মার্চ মধ্যরাতে কুড়িগ্রামে ‘বাংলা ট্রিবিউনের’ প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে বাড়িতে ঢুকে ধরে নিয়ে গিয়ে এক বছরের কারাদণ্ড দেয় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তার বাড়িতে আধা বোতল মদ ও গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ আনা হয়। সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন এবং এডিসি রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এস এম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। ঘটনা তদন্ত করে রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) প্রতিবেদন পাঠানোর পর তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এ ঘটনায় গত ৭ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিত জবাব দিয়েছেন সাবেক এডিসি এস এম রাহাতুল ইসলাম। এ ছাড়া সুলতানা পারভীন, নাজিম উদ্দিন এবং রিন্টু বিকাশ চাকমাও বিভাগীয় মামলার অভিযোগের জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সাবেক আরডিসি নাজিম উদ্দিন বিভিন্ন সময়ে মাগুরার মহাম্মদপুরে ও কক্সবাজার সদর উপজেলায় এসিল্যান্ড হিসেবে কাজ করেছেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে কক্সবাজারে চাকরির সময় ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনার ভিডিও সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ওই ভিডিও এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ ছাড়া যশোরের মনিরামপুর পৌরসভার ভগবানপাড়ায় তিনি চারতলা বাড়ি নির্মাণ করছেন বলে গণমাধ্যমে সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে তার বেনামে বিভিন্ন সম্পদ থাকারও অভিযোগ উঠেছে।
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, কিছু অভিযোগের সত্যতা তদন্ত কমিটি পেয়েছে। অবশিষ্ট অভিযোগগুলো বিভাগীয় মামলার আওতায় খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। চাকরি পাওয়ার ছয়-সাত বছরের মধ্যে তিনি কী করে বিত্তবান হলেন তা দেখা হচ্ছে। চাকরিতে যোগদানের সময় দেওয়া সম্পদের হিসাবের সঙ্গে তার বর্তমান সম্পদ তুলনা করে পুরো চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশের সময় তার ও তার পরিবারের সদস্যদের দখলে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক। বিধিমালা অনুযায়ী, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে প্রতি পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হ্রাস ও বৃদ্ধি উল্লেখ করে তার বিবরণী সরকারের কাছে দাখিল করাও বাধ্যতামূলক। বিধিতে ক্যাডার বা নন-ক্যাডার কর্মকর্তার কোনো উল্লেখ নেই। অর্থাৎ সব গণকর্মচারীর জন্য একই বিধান প্রযোজ্য।
পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও সরকার তা নেয় না। ২০১৯ সালে সরকার গঠনের পর ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী তার মন্ত্রণালয়ের সব দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেন। কিন্তু সরকারের অন্য কোনো মন্ত্রণালয় এ হিসাব না নেওয়ায় সরকারের ভেতর টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় হিসাব নিলেও সংশ্লিষ্টদের সম্পদের পর্যালোচনা করেনি। অর্থাৎ চাকরি শুরুর সময়ের হিসাব বিবরণীর সঙ্গে ২০১৯ সালের সম্পদের তুলনা করে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর আগে ২০১৫ সালে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়। ওই হিসাবও বস্তাবন্দি হয়ে পড়ে আছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। এসব বিবরণী পর্যালোচনা করে বলা হয়নি, কার সম্পদ বেড়েছে বা কমেছে। জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, ওই সময় সম্পদের হিসাব চাওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ ওই সময় রাজনীতির রাঘববোয়ালদেরও বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল। ট্রুথ কমিশন গঠন করে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনকারীদের স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় কমিশনে তিন শতাধিক আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে শতাধিক আমলাও ছিলেন। যদিও পরে এ কমিশন বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং কমিশনে স্বীকার করার পরও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো আমলাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়; ধাপে ধাপে পদোন্নতি দেওয়া হয়।