হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণের তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় একাধিকবার একই ব্যক্তির নাম যেমন রয়েছে তেমনি আছে ভুয়া নামের ছড়াছড়ি। শুধু তাই নয়, যে গ্রামে হিন্দু পরিবারই নেই, সেই গ্রামের তালিকায় রয়েছে অনেক হিন্দু উপকারভোগীর নাম। এমনকি সরকারি চাল হজম করতে তালিকায় মৃত ব্যক্তিসহ একই পরিবারের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানকে দেখানো হয়েছে ভিন্ন ধর্মের। এমনই অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নে।
স্থানীয় ইউপি সদস্যরা বলছেন, তারা ইউনিয়নটির চেয়ারম্যান ইমদাদুল রহমান মুকুলের নির্দেশে তালিকায় ৫০টি করে নাম দিয়েছেন। বাকি নামের বিষয়ে কোনো কিছুই তাদের জানা নেই। নাম দেননি অথচ নিজ এলাকার তালিকায় ভুয়া নামে ভরা দেখে তারা নিজেরাই বোকা বনে গেছেন। ইউনিয়নের ১১৮৫ জন সুবিধাভোগীর তালিকায় কয়েকশ’ ভুয়া নাম রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান মুকুল গজনাইপুর ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কমিটির সভাপতি, পদাধিকারবলে তালিকা প্রণয়নের দায়িত্বও তার। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি এবং জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, গজনাইপুর ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চালপ্রাপ্তির তালিকায় মোট উপকারভোগী রয়েছেন ১ হাজার ১৮৫ জন। ২০১৬ সালে ওই তালিকা তৈরি করা হয়। তখন থেকে উপকারভোগীদের চাল পাওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই এখনো পাননি সে সুবিধা।
তালিকা যাচাইয়ে দেখা যায়, কোনো কোনো ব্যক্তির নাম ৩ থেকে ৪ বার রয়েছে। এদেরই একজন কুটি মিয়া। বাড়ি ইউপি চেয়ারম্যানের নিজ গ্রাম সাতাইহালে। তার নাম রয়েছে তালিকার ৬৬৬, ৬৮০, ৭২০ ও ১০৭৩ নম্বরে। এছাড়া একাধিক ব্যক্তির নাম প্রায় ৫০টির মতো রয়েছে তালিকায়। রয়েছে কয়েকজন মৃত ব্যক্তির নামও। আবার কয়েকটি গ্রামে কোনো হিন্দু পরিবার বসবাস না করলেও ওই গ্রামের তালিকায় দেওয়া হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ভুয়া নাম। তালিকায় নাম থাকলেও কোনো সময়ই চাল জুটেনি, এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারালিয়া গ্রামের প্রায় ২২ জনের নাম আছে সুবিধাভোগীর তালিকায়। কিন্তু বাস্তবে চাল পাচ্ছেন ৩ জন। তালিকায় ৪৯৯ নম্বর থেকে ৫০৮ নম্বর পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘সরকার’ পদবিধারী বেশ কয়েক জনের নাম রয়েছে সুবিধাভোগী হিসেবে। কিন্তু গ্রামবাসী জানান, গোপ পদধারী লোকজনের সেখানে বসবাস। তালিকায় যে সরকার পদধারী নাম রয়েছে গ্রামবাসী তাদের কাউকেই চেনেন না। তালিকায় থাকা কয়েকজন মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও আলাপ করে জানা গেছে, তারা জীবিত থাকতেও কোনো সময় চাল পাননি, মারা যাওয়ার পরও তাদের স্বজনরা জানেনই না যে তালিকায় নাম আছে।
সবচেয়ে অস্বাভাবিক হলো গজনাইপুর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের বসবাসই নেই। কিন্তু এই গ্রামের তালিকার কিছু কল্পিত নামে স্বামী মুসলমান স্ত্রী হিন্দু আবার ছেলে হিন্দু বাবা মুসলমান দেখানো হয়েছে। তালিকার ৫৮২ নম্বরে থাকা নাম আ. আহাদ, বাবার নাম দেওয়া হয়েছে গিরিজা সরকার। ৫৮৬ নম্বরের সুবিধাভোগীর নাম মহেশ সরকার, যার বাবার নাম দেওয়া হয়েছে সুনুজ উল্লা। ৫৯২ নম্বরের সুবিধাভোগীর নাম স্বরসতী সরকার, যার স্বামীর নাম দেওয়া হয়েছে আকবর মিয়া। অর্থাৎ একই পরিবারের দুই ধর্মাবলম্বী দেখানো হয়েছে। যা বাস্তবে নেই।
গজনাইপুর ইউনিয়নের কয়েকজন ইউপি সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা ইউপি চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুলের নির্দেশে তালিকায় ৫০টি করে নাম দিয়েছেন। বাকি নামের বিষয়ে কোনো কিছুই তাদের জানা নেই। তারা নাম দেননি অথচ নিজ এলাকার তালিকা ভুয়া নামে ভরা দেখে নিজেরাই বোকা বনে গেছেন।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুল অনিয়মের বিষয়টি স্বীকারও করে নেন। তবে তার দাবি, সব ইউপি সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই করা হয়েছে সুবিধাভোগীদের তালিকা।
তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তালিকা ও ইউনিয়নের সব মেম্বারদের নিয়ে বসেছি। তালিকা সংশোধনের চেষ্টা চলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর নিজ গ্রামের জায়গায় অন্য গ্রামের নাম হয়েছে।’
তবে তালিকা তৈরির পর ৪ বছর পার হয়ে গেলেও কেন তা এখনো সংশোধন করা হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি চেয়ারম্যান মুকুল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গজনাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুল ওই ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কমিটির সভাপতি। তালিকা প্রণয়নে যদি চেয়ারম্যান কোনো অনিয়ম করে থাকেন তাহলে সেটা তদন্তে উঠে আসবে। ইতিমধ্যে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আজিজুর রহমান, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাদেক হোসেন ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নুসরাত ফেরদৌসীকে তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’