রামচাঁদ গোয়ালার চিরপ্রয়াণ

চলে গেলেন রামচাঁদ গোয়ালা। যাকে নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যতটা চর্চা হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়তো কখনো হয়নি। যখন বাংলাদেশ হয়নি তখন থেকে এই স্বাধীন ভূমিতে ১৯৯৩ পর্যন্ত ঢাকা লিগে খেলার কীর্তি তার। ৫৩ বছর বয়স পর্যন্ত খেলেছেন। রামচাঁদ গোয়ালাকে এই মাটিতে জন্মানো অন্যতম সেরা বাঁহাতি স্পিনার বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হয় না। সেই মানুষটি খুব নীরবে নিভৃতে গতকাল পাড়ি জমালেন চির অজানায়।

তার স্মৃতি অনেক মানুষের হৃদয়ে ভাস্বর। ময়মনসিংহের ব্রাহ্মপল্লীতে পৈতৃক ভিটায় জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে তার। গতকাল সকালে ৭৯ বছর বয়সে তার মহাপ্রয়াণের খবর পেয়ে বাংলাদেশের সাবেক কোচ ও দেশের ক্রিকেটের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব জালাল আহমেদ চৌধুরী স্বজন হারানোর তীব্র শোকে মুহ্যমান হয়েছেন। ‘এক দিন ঝড়ে উৎপাটিত এক প্রাচীন অশোককে দেখে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল ওর শরীরে মাখা ইতিহাস হারানোর শোকে। আজ গোয়ালা দা’র প্রয়াণ সংবাদ জেনে সে রকম এক ঐতিহাসিক মহীরুহ হারানোর বেদনা বোধ হচ্ছে’ তার বেদনাটা প্রকাশিত হয়েছে এভাবে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে আসলে রামচাঁদ গোয়ালার অমরত্ব নিশ্চিত হয়েছে সেই বহুকাল আগে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড শোক জানিয়েছে। দেশের ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবও শোকবার্তা প্রকাশ করেছে। রামচাঁদ গোয়ালার কীর্তির কথা যাদের জানা তারা কোনো না কোনোভাবে প্রিয়জন হারানোর শোক প্রকাশ করছেন। ময়মনসিংহের ছেলে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের কাছে তিনি ‘আমাদের ময়মনসিংহের গর্ব’। নিজের ফেইসবুক পেজে মাহমুদউল্লাহর শোক, ‘এই সকালে চলে গেলেন বাংলাদেশের সাবেক বাঁহাতি স্পিনার রামচাঁদ গোয়ালা। তাকে হারানোর বেদনায় আমরা কাতর।’

১৯৪১ থেকে ২০০০, দীর্ঘদেহী রামচাঁদ গোয়ালার দুনিয়ায় দীর্ঘ ভ্রমণকাল এটা। ১৯৬০-এর দশকের গোড়ায় ঢাকা লিগে অভিষেক গোয়ালার। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে বড় বড় ক্লাবে খেলেই ক্যারিয়ার কেটেছে তার। উইকেট পেয়েছেন অনেক। ১৫টি বছর কাটিয়েছেনে আবাহনী ক্রীড়া চক্রের তাঁবুতে। ক্রিকেটের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মানুষটি লিগে আরও খেলেছেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ক্রিকেট ক্লাব, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, লালমাটিয়া ক্লাব, শান্তিনগর ক্লাবে। বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখেছে তখন গোয়ালার বয়স ৪৫ পেরিয়ে গেছে। দেশের পতাকায় তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার নাম নেই। তবে তার আছে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে ১৯৮৩-৮৪ সালে সফরে আসা পশ্চিম বাংলা দল ও ১৯৮৫ সালে সফর করা শ্রীলঙ্কা দলের বিপক্ষে খেলার স্মৃতি। আছে লঙ্কানদের বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গাকে আউট করার অভিজ্ঞতাও।

শুনেছি ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠ দেয়ালঘেরা হচ্ছে। আজ মনে হচ্ছে হয়তো এই ক্রিকেট তীর্থে রামচাঁদ গোয়ালা আর আসবেন না বলেই নিয়তির এ ব্যবস্থাপনা। একদিন ঝড়ে উৎপাটিত এক প্রাচীন অশোককে দেখে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল ওর শরীরে মাখা ইতিহাস হারানোর শোকে। আজ গোয়ালা দা’র প্রয়াণ সংবাদ জেনে সে রকম এক ঐতিহাসিক মহীরুহ হারানোর বেদনা বোধ হচ্ছে। একসঙ্গে পথ চলা পথিকদের পক্ষে থেকে গোয়ালা দা’কে বিদায়ী অভিবাদন।

গোয়ালার সাবেক সতীর্থ বিসিবির পরিচালক ও মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস স্মৃতির পথে হেঁটে জানিয়েছেন, ‘রামচাঁদ গোয়ালা প্রথমবারের মতো জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিলেন যখন ৪০ বছর বয়স পেরিয়ে গেছে তার। ক্লাব পর্যায়ে তিনি খেলেছেন ৫৩ বছর বয়স পর্যন্ত। মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতাসহ খেলাটির জন্য টান ও শৃঙ্খলার দিক দিয়ে এক স্বকীয় উদাহরণ ছিলেন তিনি।’

বেশ কয়েক বছর আগে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ইন্টারভিউয়ে গোয়ালা বলেছিলেন, ‘খুবই ভালো লাগে সাকিব আল হাসানের বোলিং। মনে হয় যেন রামচাঁদ গোয়ালাই বোলিং করতেছে।’

ক্রিকেটের সঙ্গে ঘর বেঁধেছিলেন আসলে। তাই কখনো বিয়ে করা হয়নি রামচাঁদ গোয়ালার। এই প্রসঙ্গে একবার নিজেই বলেছিলেন, ‘এই খেলার পেছনে লেগেই আর বিয়ের সময় হয়নি আমার।’

যে আবাহনীর ভালোবাসায় দীর্ঘ সময় কেটেছে সেই ক্লাব ও বাংলাদেশের অন্যতম ক্রিকেট সংগঠক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি প্রিয় মানুষটির বিদায়ের খবরে খুব কষ্ট নিয়ে জানিয়েছেন, ‘এই দেশের ইতিহাসের সেরা বাঁহাতি স্পিনার ছিলেন তিনি। অসাধারণ এক টিমম্যান। একটি প্রেরণা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘জেন্টেল জায়ান্ট’ চলে গেলেন। এর সঙ্গে আক্ষেপ, ‘একটি যুগের অবসান। রামচাঁদ গোয়ালা। ১৯৪১-২০২০।’