হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা মেলেনি বৃদ্ধ আদম আলীর

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ভর্তি করানো সম্ভব হলো না আদম আলী নামে ৭৫ বছর বয়সের সাবেক গ্রাম পুলিশকে। মুন্সীগঞ্জ থেকে চিকিৎসকের পরামর্শেই ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে নিরুপায় হয়ে ফিরতে হলো আবার গজারিয়ায়। সেখানেই ভর্তি করা হলো তাকে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা এরকম অসংখ্য রোগীকেই ভর্তি হতে না পেরে ফিরে যেতে হচ্ছে এলাকায় কিংবা অন্য কোনো হাসপাতালে।

মুন্সীগঞ্জ গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা আদম আলী। গত রোজার ঈদের পর থেকেই শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় তার। ঠিকমতো কিছুই খেতে পারছিলেন না দেখে ভরেরচরে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে আবার নিয়ে যাওয়া হয় গজারিয়ায় একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসক তার অবস্থা ভালো না জানিয়ে তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঢাকায় নিয়ে আসতে বলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েক দিন আগে তাকে নিয়ে আসা হয় রাজধানীর পান্থপথের গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে। সেখানে সাড়ে ৮ হাজার টাকা খরচ করে তার রক্তের ১১টি পরীক্ষা করা হয়। তবে সেই রিপোর্টেও কোনো রোগ ধরতে পারেননি সেখানকার চিকিৎসকরা। তখন তার করোনা টেস্ট ও আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করাতে বলা হয়।

আদম আলীর ছেলে গাড়িচালক মো. নুর উদ্দিন বলেন, ‘আমার বাবার কোনো জ্বরটর কিছু নাই, করোনা পরীক্ষাই যদি করতে হবে তাহলে এত টাকার রক্ত পরীক্ষা করা হলো কেন, আগেই করোনা পরীক্ষার কথা বলত আমাদের।’

এরপর শুক্রবার সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আবার গজারিয়ায় সেই প্রাইভেট ক্লিনিকে। সেখানকার ডাক্তার সবকিছু শুনে রোগীকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসতে বলেন।

নুর উদ্দিন বলেন, ‘আজ শনিবার (গতকাল) সকাল ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি আমার বাবাকে। এখানে একটি হুইলচেয়ারে উঠিয়ে ১০ টাকার টিকিট ২০ টাকা দিয়ে কিনে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাই। সেখান থেকে আবার হাসপাতালের নতুন বিল্ডিংয়ে পাঠিয়ে দেয়। তবে নতুন ভবনেও চিকিৎসকরা তাকে না দেখে আবার হাসপাতালের আউটডোরে পাঠিয়ে দেয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আউটডোরে। সেখানে সিরিয়াল দিয়ে ৭ নম্বর রুমে দেখানোর পর চিকিৎসকরা আবার তাকে নতুন বিল্ডিংয়ে নিয়ে যেতে বলে। তাদের কথামতো আবার রোগীকে নতুন বিল্ডিংয়ে নিয়ে যাই। তবে নতুন বিল্ডিংয়ে রোগীকে দেখে ডাক্তাররা আবার রেগে যায়। বলে এর চিকিৎসা এখানে নেই, তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান।’

এরপরই হাসপাতাল থেকে নিরুপায় হয়ে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন ছেলে। হাসপাতালের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে থাকেন বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে এখন কোথায় যাবেন, কী করবেন তিনি।

বিকেল ৪টার দিকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে আদম আলীর ছেলে নুর উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এলাকায় চলে এসেছি। আমার বাবাই বিরক্ত হয়ে গেছেন। তিনি বলছেন আমার এই দৌড়াদৌড়ি ভালো লাগে না। আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাও। পরে এলাকায় এসে ভবেরচর সরকারি হাসপাতালেই ভর্তি করিয়েছি বাবাকে।

এই কয়দিনে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল করতে করতেই আমাদের ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ৫-৬টি হাসপাতালে  ঘোরাঘুরি করলাম। যে যেখানে নিয়ে যেতে বলে সেখানেই নিয়ে যাই। কোথাও সঠিক চিকিৎসা মিলছে না। মনেরে তো বুঝাইতে পারি না। টাকার বস্তাও তো নাই যে কাউরে দিয়ে বলব তুই আমার আব্বারে দেখবি।’

হাসপাতালে সঙ্গে থাকা আদম আলীর স্ত্রী ষাটোর্ধ্ব মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আসার পর থেকে কত জয়গায় গেলাম, কোথাও দেখল না, একেকজন একেক জায়গায় যাইতে বলে। এখন আমরা কোন জায়গায় যাব কিছুই বুঝতেছি না।’

হাসপাতালের নতুন বিল্ডিংয়ের সামনে নাজমা বেগম নামের পঞ্চাশোর্ধ্ব এক রোগীর স্বজনরা জানান তারাও একই ধরনের সমস্যায় আছেন। কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছেন তারা। হার্টের রোগী নাজমাকে প্রথমে বারডেম হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ভর্তি করতে না পেরে নাজমা বেগমকে নিয়ে এসেছেন ঢাকা মেডিকেলে।

ঢাকা মেডিকেলে এনে টিকিট কেটে নতুন ভবনে দেখানোর পর চিকিৎসকরা সেখানে করোনার রোগী দিয়ে ভরে গেছে জানিয়ে তাকে ভর্তি নেননি। সেজন্য নাজমাকে নিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালের উদ্দেশে চলে যেতে হয় স্বজনদের। তবে হৃদরোগেও তাকে ভর্তি করাতে পারবেন কি না এ নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন জানান, হাসপাতালের নতুন বিল্ডিংটি ছিল আগে মেডিসিন বিভাগ। এখানে হার্ট, লিভারসহ সকল মেডিসিন বিভাগের রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে ওই ভবনটি পুরোটাই করোনা রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এজন্য হার্ট কিংবা লিভারের যে রোগীগুলো আছেন যারা করোনায় আক্রান্ত নন, তাদেরকে ওখানে ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। তাদের জন্য মিটফোর্ড কিংবা সোহরাওয়ার্দী বা অন্যান্য নন-কভিড হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে করোনা আক্রান্ত সব রোগীকেই ভর্তি নেওয়া হচ্ছে।