আগামীতে পুঁজিবাজারে কোনো মন্দ কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) যাতে আসতে না পারে, সে বিষয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। আইপিও অনুমোদনের আগে সব ডকুমেন্টস ভালোভাবে পরীক্ষা করা হবে, কোম্পানি পরিদর্শন করা হবে। কোনো কোম্পানির তিন ধরনের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগও থাকবে না। গতকাল এসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম একটি ভার্চুয়াল সেমিনারে এ কথা বলেছেন।
গতকাল সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেস লিমিটেড আয়োজিত পুঁজিবাজার, মুদ্রাবাজারসহ সংশ্লিষ্ট খাতে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য প্রভাববিষয়ক এক ওয়েবিনারে (ওয়েব সেমিনার) অংশ নেন এসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। সেমিনারে ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক মঈনউদ্দীন এবং সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এরশাদ হোসেন আলোচনায় অংশ নেন।
সেমিনারে ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক মঈনউদ্দীন বাজারে ইউনিলিভারসহ স্থানীয় ভালো ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি। ব্যাংক থেকে বর্তমানে কম সুদে ঋণ পাওয়া, তালিকাভুক্ত হলে নানা ধরনের কমপ্লায়েন্সের মধ্যে আসা ইত্যাদি কারণে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এসব সমস্যা কাটিয়ে কোম্পানিগুলোকে বাজারে নিয়ে আসা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এসইসিকে এসব কোম্পানি বাজারে আনার একটি উপায় খুঁজতেই হবে। তিনি বিগত সময়ে আইপিওতে আসা বিভিন্ন কোম্পানির মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
এ বিষয়ে এসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, আগামী দিনে কোনো মন্দ কোম্পানি আইপিও যাতে আসতে না পারে, সে জন্য ইতিমধ্যেই আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। কোনো আইপিও অনুমোদনের আগে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ভালোভাবে যাচাই করা হবে। কোম্পানি পরিদর্শন করা হবে। এ বিষয়ে আমরা এনবিআর, এফআরসিসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছি। এফআরসির কাছে ফিন্যান্সিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট থাকবে। কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন এফআরসির ওয়েবসাইটে থাকবে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক, এসইসি ও এনবিআর অনুসরণ করবে। ফলে আগামী দিনে তিন ধরনের ব্যালান্সশিট বানিয়ে তিন জায়গায় দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। কারোরই হিসাব কারসাজি করে বাজারে আসার সুযোগ থাকবে না।
এসইসি চেয়ারম্যান বলেন, গ্রামীণফোন ইস্যুতে বিটিআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে একটি সমাধান বেরিয়ে আসবে, যা সংশ্লিষ্টদের চাপ কমাতে সাহায্য করবে। রবি, ওয়ালটনের মতো কিছু ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসছে। ভালো কিছু কোম্পানিও বন্ড ইস্যু করবে। ইতিমধ্যেই আমরা বিভিন্ন ব্যাংকের ৯টি পার্পিচুয়াল বন্ডের আবেদন পেয়েছি, যা পরবর্তী কমিশন সভায় অনুমোদন দেওয়া হবে।
অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। তবে এটি শুধু এসইসির একার কাজ নয়। এখানে অনেকগুলো পক্ষ আছে, তাদেরও নিজ নিজ দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে হবে। সবাই এসইসির দিকে আঙুল তোলে। কিন্তু এসইসি শুধুই রেগুলেটর। আমাদের প্রধান কাজ আইনকানুন প্রণয়ন করা। আইনে দেওয়া এখতিয়ারের মধ্যে থেকে পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। আমরা সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের বক্তব্য শুনি, কোনো সমস্যা থাকলে সমাধানের চেষ্টা করি, বাজারের কল্যাণে আইন সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেটিও করা হয়।
এসইসি চেয়ারম্যান বিনিয়োগকারী, মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকার হাউজ ও অন্যদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এবং এসইসিসহ সবার সম্মিলিত চেষ্টায় আস্থা ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি স্টেকহোল্ডারদের এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সহায়তা করার আশ^াস দেন।
আমরা আপনাদের ব্যবসাকে সহজ করা, তথ্যপ্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়িয়ে পেপারলেস রিপোর্টিং এবং বিভিন্ন বিষয় অনুমোদন বা সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে সময়সীমা কমিয়ে আনাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে প্রস্তুত। এমনকি বিদ্যমান আইন সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেটি করতেও আপত্তি নেই। কিন্তু বাজারে লেনদেনের বিষয়ে কিছু করার সুযোগ আমাদের খুবই কম বলে জানান শিবলী রুবাইয়াত।
এসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে বলেন, বাজেটে পুঁজিবাজার সম্পর্কিত কিছু ইস্যু মিস হয়ে গেছে। পুঁজিবাজারে কালোটাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিন বছরের লক-ইন আরোপ, তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করপোরেট কর হারের ব্যবধান ১০ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা, জিরো কুপন বন্ডের কর সুবিধা তুলে নেওয়ার মতো কিছু প্রস্তাবনা আছে, যা পুঁজিবাজারের জন্য অনুকূল নয়। এ ছাড়া পুঁজিবাজারের স্বার্থে মার্চেন্ট ব্যাংকের করপোরেট কর কমানো, ব্রোকার হাউজের লেনদেনে উৎসে কর কমানোসহ আরও কিছু বিষয় বাজেটে বিবেচনা করলে ভালো হতে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে তিনি এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাকে বিষয়গুলো বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন। এনবিআর চেয়ারম্যানকে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করেছি, শুধু কয়েকটি কোম্পানির কাছ থেকে কর আদায়ের চেষ্টা না করে পরিধি বাড়াতে। চাপের মাধ্যমে করের পরিমাণ খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব নয়; বরং কর কমিয়ে ব্যবসার সহজ পরিবেশ তৈরি করে দিলে যখন ব্যবসা বাড়বে, তখন স্বয়ংক্রিভাবে সরকারের রাজস্বও বাড়বে। আর এটিই হবে সবচেয়ে টেকসই।
এনবিআরকে বন্ড লেনদেন বিকশিত করার জন্য আমরা জিরো কুপন বন্ডে দেওয়া কর সুবিধা অন্যান্য বন্ডে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাই। কিন্তু এনবিআর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির কথা বলে জিরো কুপন বন্ডে দেওয়া কর সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সুবিধা প্রত্যাহারের মাধ্যমে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির যুক্তি দেখায় তারা। বিষয়টি খুব শিগগির প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা হবে এবং আমরা আশা করছি তিনি তা বিবেচনা করবেন।