কুয়েতে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলের আটক এবং তার প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনার সম্পর্কে কিছুই জানে না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক তথ্য পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন এ ব্যাপারে গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশ কিছুদিন থেকে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। কুয়েতে বাংলাদেশের দূতাবাসকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। আমাদের দূতাবাসের কর্মকর্তাদেরও কিছু জানায়নি দেশটির সরকার। তিনি বলেন, কুয়েত সরকার যদি এ ব্যাপারে আমাদের কিছু জানায় সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদেশে গিয়ে কেউ দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করবে সেটা মেনে নেওয়া হবে না। তারপরও বিভিন্ন খবরের রেশ ধরে আমরা পাপুলের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছি।
এদিকে দেশটির গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে কুয়েতের ইংরেজি দৈনিক আরম টাইমস ও আরবি দৈনিক আল কাবাস শনিবার খবর প্রকাশ করেছে, কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউশন পাপুল ও তার কুয়েতিয়া মারাফিয়া নামের প্রতিষ্ঠানের ৫০ লাখ দিনারের (যা বাংলাদেশি ১৩৮ কোটি টাকা) হিসাব জব্দ করতে নির্দেশ দিয়েছে ব্যাংকগুলোকে। কুয়েতি এ দুই গণমাধ্যমর খবরে বলা হয়, কাজী শহিদের ৫০ লাখ দিনারের যে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হচ্ছে, তার মধ্যে কুয়েতিয়া মারাফিয়ার মূলধন হিসেবে একটি ব্যাংকে রয়েছে ৩০ লাখ দিনার বা প্রায় ৮২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ব্যাংক হিসাবগুলো থেকে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য নিশ্চিত করেছে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছেন। এরপর থেকে ওই ব্যাংক হিসাব থেকে যাতে কোনো রকম লেনদেন না হয়, সেজন্য ব্যাংকগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কুয়েতে সংসদ সদস্য কাজী শহিদের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীরব থাকার অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশ আগ বাড়িয়ে কিছু জানতে চায় না। সরকার চায় কুয়েতের আইনে কাজী শহিদের বিষয়টি চলুক। তাছাড়া পাপুলের কুয়েতেও স্থায়ী বসবাসের অনুমোদন রয়েছে। এসব কেলেঙ্কারির সঙ্গে কুয়েতের সরকারি লোকজনও জড়িত। তারা তদন্ত করে বাংলাদেশকে যে তথ্য দেবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, কুয়েতের বিষয়ে সরাসরি কোনো ধরনের বক্তব্য না দিলেও পাপুলের বিষয়ে সরকার খোঁজখবর নিচ্ছে। এর মধ্যে দুদক দেশে পাপুলের সম্পদ এবং তার পরিবারের সম্পদের খোঁজে নেমেছে। বিশেষ করে কুয়েতে বাংলাদেশের প্রবাসীরা কাজ করছেন। কুয়েত সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের বিবাদে জড়াতে চায় না বাংলাদেশ।
এদিকে গত শনিবার কুয়েতের দুই গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, কাজী শহিদের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তার ব্যাংকে রাখা অর্থ যেন দ্রুত উদ্ধার করতে পারে সে কারণেই ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।
কুয়েতের তদন্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে কাজী পাপুল স্বীকার করেছেন, দেশটির সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তিকে নগদ, চেক ও নানা রকমের উপহার ঘুষ হিসেবে দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। পাপুলের তথ্যের ভিত্তিতে তার সহযোগী মুর্তোজা মামুনকে আটক করে গোয়েন্দারা এবং মামুনের কাছ থেকে চার-পাঁচটি ব্যাংকের চেক জব্দ করে। এসব ব্যাংক হিসাব থেকে কাজী শহিদ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপেও টাকা পাচার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাপুল বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে কুয়েতে কর্মী নেওয়ার জন্য দেশটির সরকারের একজন আমলাসহ তিনজনকে ২১ লাখ দিনার বা ৫৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন তিনি। এ তথ্য জানার পর কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাসহ তিনজনকে আটক করা হয়। বরখাস্ত করা হয় কুয়েতের জনশক্তি কর্র্তৃপক্ষের এক আন্ডার সেক্রেটারিকে। আর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত এক কর্নেলসহ আরও চারজনকে।
মানব ও অবৈধ মুদ্রা পাচারের অভিযোগ ৬ জুন কুয়েত সিটির মারাফিয়া এলাকার বাসা থেকে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলামকে আটক করে কুয়েতের সিআইডি (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট)। পরদিন তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে সিআইডি। কাজী শহিদের বিরুদ্ধে সিআইডির করা মানব পাচার ও অবৈধ মুদ্রা পাচার নিয়ে আগামী ৬ জুলাই শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউশন।