আজ আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

আজ ২৩ জুন। দেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালে পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে এই দলের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও পরে শুধু আওয়ামী লীগ নাম নিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে বিকাশ লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করে এলেও এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে তা সীমিত আকারে সাদামাটাভাবে করবে আওয়ামী লীগ।

দলটির নেতারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে এক বছর দেশে মুজিববর্ষ পালিত হবে। এ বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী হওয়ায় আওয়ামী লীগের জন্য দিবসটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এ বছর বৈশি^ক মহামারী করোনার কারণে সৃষ্ট সংকটে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে সব ধরনের জনসমাগমপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিহার করছেন তারা। এ বছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সাজসজ্জা ও অন্যান্য কর্মসূচির খরচ বাঁচিয়ে তা দুরবস্থাগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

ক্ষমতাসীন দলটির নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রতি বছরই ২২ জুন রাত ১২টা ১ মিনিটে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে কেক কেটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুরু করত আওয়ামী লীগ। এরপর সূর্যোদয়ের ক্ষণে সব দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হতো। আর সকালে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে দলীয় সভাপতিসহ অন্যরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতেন। এ ছাড়া আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হতো। কিন্তু এবার করোনাভাইরাসের মহামারীর কারণে দলের সব কর্মসূচিই স্থগিত করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ‘আমরা দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যেভাবে ঘটা করে উদযাপন করি এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সেভাবে সম্ভব নয়। এটাই বাস্তবতা। তারপরও আমাদের দলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মনে রাখার জন্য, মানুষকে স্মরণ করিয়ে রাখার জন্য বাস্তবতার নিরিখে করোনাভাইরাসের মহামারীর সব স্বাস্থ্যবিধি মেনেই আমাদের যতটুকু সীমিত পরিসরে উদযাপন করা সম্ভব, তা আমরা করব।’

দলটির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমান বিশ^ ও দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে, সাধারণ মানুষের রোগব্যাধির কথা চিন্তা করে সীমিত আকারে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে গণমানুষের দল আওয়ামী লীগ। আমাদের অন্য প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তুলনায় এটি একটি ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, আওয়ামী লীগের জন্মের পর ১৯৫৬ সালে যেমনভাবে তৎকালীন আবু হোসেন সরকার দুর্ভিক্ষজনিত কারণে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। ভুখা মিছিলে গুলিবর্ষণ করে মানুষ হত্যা করে তার সরকারের পতন ঘটেছিল। তারপর সেদিন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে একদিকে যেভাবে মহামারী, আরেকদিকে যেভাবে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করেছিল, আজকে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম হব।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠার শুরুতে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুল হক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ দলটি প্রতিটি গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গণমানুষের সংগঠনে পরিণত হয়।

পাকিস্তানি সামরিক শাসন, জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন ও শোষণের বিরুদ্ধে সব আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে দলটি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, চৌষট্টির দাঙ্গার পর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পথ বেয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৪ বছরের আপসহীন সংগ্রাম-লড়াই এবং ১৯৭১ সালের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ তথা সশস্ত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্নের ফসল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে যখন অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখনই স্বাধীনতাবিরোধীচক্র আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। তারপর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মাধ্যমে সংগঠনটিকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নবোদ্যমে সংগঠিত হয়।

একুশ বছর লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জয়ী হয়ে ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০১ ও ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর আরেক দফা বিপর্যয় কাটিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী হয়ে আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় দলটি। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুযারি এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। যে লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আজকে যদি আমরা মূল্যায়ন করি, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে।