পাপুল পরিবারের সব হিসাবের লেনদেন স্থগিত

কুয়েতে অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল সোমবার সিআইডির একটি দল রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস থেকে পাপুলের পাসপোর্টের ও নির্বাচন কমিশনের এনআইডি উইং থেকে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে। এছাড়া গত রবিবার দুদক পাপুল, তার স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার ব্যক্তিগত ও মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (লেনদেন স্থগিত) করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন তফসিলি  ব্যাংকে চিঠি দিয়ে পাপুল পরিবারসংশ্লিষ্ট সব ব্যাংক হিসাবে লেনদেন স্থগিত রাখতে বলেছে। তাছাড়া দুদকের চিঠি পাওয়ার পর বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কোনো ব্যাংকে পাপুল ও তার পরিবারের সদস্যদের কী পরিমাণ সম্পদ আছে, তা জানার কাজ শুরু করেছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে সব তফসিলি ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে বিএফআইইউ। দুদক, সিআইডি ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে কুয়েতের গণমাধ্যমের বরাতে দেশের গণমাধ্যমে এমপি পাপুলের অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দুদকে পাপুলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগ আমলে নিয়ে দুদক গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় ও সংস্থার উপপরিচালক সালাহ উদ্দিনকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করে।

এরপর গত ৯ জুন বিস্তারিত তথ্য চেয়ে দুদক পাপুল, তার স্ত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের স্বতন্ত্র এমপি সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম এবং শ্যালিকা জেসমিন প্রধানকে চিঠি দেয়। পরে গত ১৭ জুন পাপুলের স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখাকেও (এসবি) চিঠি দিয়েছে দুদক।

এদিকে গত ৬ জুন রাতে কুয়েতের মুশরিফ এলাকা থেকে পাপুলকে গ্রেপ্তার করে দেশটির সিআইডি কর্মকর্তারা। মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অন্যতম মালিক পাপুলের কুয়েতে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি রয়েছে। পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে মানব পাচার, অর্থ পাচার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগ এনেছে কুয়েতি প্রসিকিউশন। বর্তমানে কারাগারে থাকা পাপুলের বিরুদ্ধে সেখানে উত্থাপিত অভিযোগের শুনানি শুরু হয়েছে। আগামী ৬ জুলাই শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে। এছাড়া কুয়েতের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা নাজাহাও পাপুল ও তার সহযোগীদের দুর্নীতির তদন্তে নেমেছে।

দুদকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমপি পাপুল ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা লেনদেন স্থগিত রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিচ্ছে। একই সঙ্গে এমপি পাপুলকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুদক কুয়েতের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা নাজাহাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তদন্তসম্পর্কিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।

বিএফআইইউর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুদকের চিঠি পাওয়ার পর বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংককে পাপুল ও তার পরিবারের সদস্য এবং তাদের মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে লেনদেন স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, এমপি পাপুলের মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ২০১১ সাল থেকে মোট পাঁচবার নবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে একবার বাংলাদেশে এবং অন্য চারবার কুয়েত থেকে পাসপোর্ট নেওয়া হয়েছে। গতকাল সিআইডির একটি টিম তার পাসপোর্ট ও বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে।

কুয়েতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাপুলকে গ্রেপ্তারের পর তার দপ্তরে তল্লাশি চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও সিসিটিভির ফুটেজ জব্দ করেছেন দেশটির অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিময় করা চিঠি, চুক্তিপত্র ও সিসিটিভির ফুটেজের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তারা পাপুলের বেশ কয়েকজন সহযোগীকে শনাক্ত করেছেন। এরই ভিত্তিতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কুয়েতের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্নজনকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।

এর আগে গত রবিবার কুয়েতে পাপুল ও তার মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির হিসাব জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। এর মধ্যে মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ৫ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩৭ কোটি ৮৮ লাখ ৮৩ টাকা রয়েছে বলে কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের বরাতে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। জব্দ হওয়া হিসাবের মধ্যে পাপুলের গালফ ব্যাংক অব কুয়েতের একটি ব্যাংক হিসাবও রয়েছে।

কুয়েতের গণমাধ্যম আল আরাবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাপুলকে অর্থ ও মানব পাচারে সহযোগিতা করার অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর থেকে কুয়েতের দুই নাগরিক আত্মগোপনে আছেন। তাদের মধ্যে একজন পাপুলের কাছ থেকে ১০ লাখ দিনারের (প্রায় ২৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা) চেক নিয়েছিলেন। সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোতে লোক নিয়োগের চুক্তিতে তিনি ওই চেক নিয়েছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তারা কুয়েতের ওই নাগরিককে খুঁজছেন। কারণ বাংলাদেশের সাংসদের বিরুদ্ধে চলমান মানব ও অবৈধ মুদ্রা পাচারের তদন্তের স্বার্থে ওই লেনদেনের বিষয়ে বিস্তারিত জানাটা জরুরি।

কুয়েতের আরবি দৈনিক আল কাবাস রবিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ৬ জুন বাংলাদেশের এমপি পাপুলকে গ্রেপ্তারের কয়েক দিন পর তার প্রতিষ্ঠান কুয়েতিয়া মারাফিয়ার দপ্তরে তল্লাশি চালান তদন্ত কর্মকর্তারা। তারা সেখানকার কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদের পর তল্লাশি করে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আর সিসিটিভির ফুটেজ জব্দ করেন। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিময় করা চিঠি, চুক্তিপত্র আর সিসিটিভির ফুটেজের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তারা পাপুলের সহযোগীদের সম্পর্কে নিশ্চিত হন। ওইসব তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কুয়েতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্নজনকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। জানা গেছে, বাংলাদেশের সাংসদের দপ্তর থেকে জব্দ করা কাগজপত্রের মধ্যে কুয়েতের বিভিন্ন জায়গায় দপ্তরের বাড়িভাড়া, কর্মচারীদের আবাসনের জন্য নেওয়া ভবনের ভাড়ার রসিদসহ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের রসিদও রয়েছে।