দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের সেবা দিতে পুলিশের জনবল বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি পদোন্নতি পাচ্ছেন বাহিনীর কর্মকর্তারাও। কিন্তু সেই তুলনায় পদ সংকট আছে পুলিশে। এরই মধ্যে পুলিশের সবচেয়ে বড় ইউনিট ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অর্গানোগ্রামে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাছাড়া পুলিশের অন্য ইউনিটগুলোতেও নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও জেলার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) একজন করে এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা, ডিএমপির গোয়েন্দা (ডিবি), ট্রাফিক, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশন্যাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও ডিএমপি সদর দপ্তরে নতুন পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা ও কাজে জবাবদিহি আনতে পুলিশ সদর দপ্তর বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশে জনবল ব্যাপক বৃদ্ধি করে। কিন্তু বাহিনীতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। আর এসব কারণে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ঢেলে সাজানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে ডিএমপির অর্গানোগ্রামে পরিবর্তন আনা হয়েছে। উপকমিশনার (ডিসি) পদমর্যাদার ১৫টি পদ নতুন করে সৃষ্টি করা হয়েছে এই ইউনিটে। ডিবি, ট্রাফিক, সিটিটিসি ও ডিএমপি সদর দপ্তরে এসব নতুন পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ইউনিটে পদ বাড়ানোর ফলে কাজে গতি আসবে। তারপরও পুলিশে আরও পদ সৃষ্টি করতে হবে। তারা আরও বলেন, করোনা মহামারীতে নিহতের লাশ দাফন ও আক্রান্তদের সেবা দেওয়াসহ নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছে পুলিশ। এতে জনসাধারণের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণ পদ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশে পদ বাড়ানোর ফলে কাজের গতি আরও বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। জনগণকে সেবা দিতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের নিরাপত্তা দিতে বর্তমান সরকার পুলিশের জনবল বৃদ্ধি করছে। পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এতে নতুন করে পদও তৈরি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে ঢাকায় থানা ছিল ১২টি। এখন বেড়ে হয়েছে ৫০টি। এতে কাজের পরিধি বেড়েছে, অপরাধ কমছে। পুলিশ জনগণের সেবা দিতে পারছে। জনগণও পুলিশের কাছে স্বাচ্ছন্দ্যে আসতে পারছে। সম্প্রতি ডিএমপিতে নতুন ১৫টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। সামনে হয়তো আরও করা হতে পারে। এতে পুলিশ আরও কাজের উৎসাহ পাবে। তবে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। সবাই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ২১৫টি পদ সৃজনের ফলে অতিরিক্ত ডিআইজির অন্তত ১০০ পদ সৃজন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ বর্তমানে অতিরিক্ত ডিআইজির পদ রয়েছে ১০৫টি। পদোন্নতির পিরামিড কাঠামো ঠিক রাখতে একই সঙ্গে পুলিশের ডিআইজি ও অতিরিক্ত আইজিপি পদও বাড়াতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে তা সৃষ্টির দাবি জানিয়েছেন পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে আইজিপি একজন ও অতিরিক্ত আইজিপি আছেন ১৭ জন (৬ জন গ্রেড-১ পদমর্যাদার)। এ ছাড়া সারা দেশে ডিআইজি ৫৮ জন, এডিশনাল ডিআইজি ৯৯ জন, ৬৪ জেলায় একজন করে এসপি, পুলিশ সদর দপ্তরে এআইজি (এসপি পদমর্যাদা) ১২৯ জন, উপকমিশনার ১২৯ জন, দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা ৩০১ জন, মিশনে এসপি ৫ জন ও সংযুক্ত আছেন ৬ জন এসপি। তাছাড়া ১৫ জন এসপির পদায়ন হয়নি এখনো।
ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা তাদের চাকরিকাল সন্তোষজনকভাবে অতিক্রম করার পরও পদ না থাকায় পদোন্নতি হতো না। এমন জটিলতার কারণে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের ২১৫ পদ বিলুপ্ত করে সমানসংখ্যক পুলিশ সুপারের (এসপি) পদ রাজস্ব খাতে স্থায়ীভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এসপির ২১৫ পদ সৃজনের সঙ্গে শর্ত দিয়েছে, পরবর্তী সময়ে পুলিশে অতিরিক্ত ডিআইজি বা তদূর্ধ্ব অন্য কোনো ক্যাডার পদ বিচ্ছিন্নভাবে সৃজনের প্রস্তাব করা যাবে না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ডিএমপিসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে এসপি পদমর্যাদার ২১৫ পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্যগুলো হলো পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) ৩০টি, পিবিআইয়ে ৩৯টি, পুলিশ সদর দপ্তর ও এসবিতে ১৭টি, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটে (এটিইউ) ৩টি, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) ৫টি, খুলনা মহানগর পুলিশে (কেএমপি) ২টি, রাজশাহী মহানগর পুলিশে (আরএমপি) ২টি, বরিশাল মহানগর পুলিশে (বিএমপি) ২টি, সিলেট মহানগর পুলিশে (এসএমপি) ৪টি, গাজীপুর মহানগর পুলিশে ৫টি, রংপুর মহানগর পুলিশে ৪টি এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও ময়মনসিংহ রেঞ্জে ২টি করে পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন পদগুলো পেয়েছে ঢাকার পুলিশ স্টাফ কলেজ, এপিবিএন, শিল্পাঞ্চল পুলিশসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও জেলা পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাহিনীতে সুপারনিউমারারি পদোন্নতি প্রাপ্তির পর ১৪ মাসের অধিক সময় পার হওয়ার পরও শূন্য পদ না থাকায় ওই এসপিদের নিয়মিত পদে পদায়ন করা সম্ভব হচ্ছিল না। নতুন পদ সৃজনের প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়ায় গত সপ্তাহে তাদের পদায়ন করা হয়। পুলিশে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অবসর ও পদোন্নতির কারণে ২৩০টি এসপি পদ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর আগেও নতুন পদ সৃষ্টি করা হতে পারে। আইজিপি স্যারও এসব নিয়ে কাজ করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইউনিটগুলোতে নতুন নতুন পদ সৃষ্টি হবে। ডিএমপিতে ১৫টি পদ সৃষ্টি হয়েছে। এতে পুলিশ বাহিনীর কাজ আরও গতিশীল হবে এবং মানুষ পুলিশের কাছ থেকে আরও উন্নত সেবা পাবে। ক্রাইম জোনের পাশাপাশি ডিএসবি, এসবি, ডিবি ও পিবিআইর ক্রাইম জোনগুলোর পরিধি কমে আসায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মামলার তদন্ত তদারকি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ সহজতর হবে। তবে এতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হবে না। আমরা আরও নতুন পদ সৃষ্টির জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করব।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এক সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাহিনীতে এই ঢেলে সাজানোর কারণে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। কারণ প্রত্যেকের কাজ, কাজের ধরন ও ক্ষেত্র আলাদা করা। যেমন জেলায় পিবিআইর যে পুলিশ সুপার থাকবেন তারা জেলার চাঞ্চল্যকর জটিল ও রহস্যজনক মামলাগুলোর তদন্ত করবেন। ডিএসবি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। একইভাবে থানা পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ ও অন্যান্য বিভাগ নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে।’
অপর এক এসপি বলেন, ‘সব জিনিসের ভালো দিকের পাশাপাশি কিছু নেগেটিভ দিক থাকে। জেলায় আগে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি রেঞ্জ ডিআইজির কাছে তার কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতেন। কিন্তু এখন একই পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তা। এক্ষেত্রে সিনিয়র-জুনিয়রের বিষয় থাকে।’