বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসার অভাবে নার্সের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। ডাক্তারদের দেখা মেলে না বললেই চলে। অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকা সত্ত্বেও প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টের রোগীকে তা সরবরাহ না করার অভিযোগ রয়েছে। আর সরবরাহ না থাকায় করোনা রোগীরা হাসপাতালের বাইরে গিয়ে ওষুধ ও খাদ্য কিনছেন। এতে করোনা সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে জানা গেছে, বরিশাল জেলায় গত সোমবার রাত পর্যন্ত মোট ১২৭৫ জন করোনাভাইরাসজনিত কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন। এতে মৃত্যু হয়েছে ২৬ জনের। তবে আরও ৪৫ জন করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন বলে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরিশালে করোনা উপসর্গ দেখা দিলেও রোগীরা বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে অক্সিজেন ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সেবার জন্য প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টের রোগীরা হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি হচ্ছেন। অনেকের অভিযোগ, হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে রোগী সেবার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা নেই। চিকিৎসকরা রোগীর কাছে আসেন না। পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই। সিলিন্ডার যেগুলো আছে তার অনেকগুলোতে মিটার নেই। শ্বাসকষ্টের রোগীকে সময় মতো অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে না। চিকিৎসার জন্য নার্সের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। আর ওষুধ সরবরাহ না থাকায় করোনা রোগীরা হাসপাতালের বাইরে ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ কিনছেন। এ অবস্থায় করোনা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, করোনা ওয়ার্ডের অনেক রোগী ওষুধ ও খাবার কিনতে বিভিন্ন দোকানে যাচ্ছেন।
গৌরনদী এলাকার এক পরিবারের ৪ সদস্য করোনায় আক্রান্ত। ওই পরিবারের একজন জানান, গত রবিবার ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে করোনা পরীক্ষার পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই রাতে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি হন স্বামী-স্ত্রী ও এক ছেলে। একমাত্র কন্যার করোনা পজিটিভ হলেও কোনো উপসর্গ না থাকায় তাকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে এসে পড়েছেন চরম সমস্যায়। প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হচ্ছে না। হাসপাতালের এমন কোনো লোক নেই যাদের বাইরে পাঠিয়ে খাবার-ওষুধ আনাবেন। বাধ্য হয়ে করোনা আক্রান্ত ছেলেকে বাইরে পাঠিয়ে খাবার এবং ওষুধ আনিয়েছেন।
শের-ই-বাংলা মেডিকেলের চিকিৎসা নেওয়া রোগীর স্বজন হাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, গত ২১ জুন হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আল মামুন নামে মাত্র ১৩ বছর বয়সের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট থাকার পরও তাকে অক্সিজেন দেওয়া যায়নি। বাড়িতে থাকলেও হয়তো এমন অবস্থা নাও হতে পারত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্বরত একাধিক নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী জানান, করোনা ওয়ার্ডের চিকিৎসা সাধারণ ওয়ার্ডের মতো দেওয়া হচ্ছে। জনবল সংকটের কারণে ওয়ার্ডের পরিবেশ নোংরা। ১৩ বছরের শিশু মারা গেছে। তার প্রচ- শ্বাসকষ্ট হওয়ার পর ডাক্তারকে বললেও কেউ এসে দেখেননি। জিংক খাইয়ে দিতে বলে কিংবা অক্সিজেন লাগিয়ে দিতে বলে তাদের দায়িত্ব শেষ করেন। বয়স্ক একজন মারা গেছেন, তাকে আইসিইউতে শিফট করা লাগবে বলার পরও ডাক্তার বলেছেন, একটা কটসন দেন ঠিক হয়ে যাবে। ৩৬ বছরের এক নারী মারা গেছেন। তারও আইসিইউ দরকার ছিল। কেবল আইসিইউ সাপোর্ট না দেওয়ার কারণে অনেক রোগী আশঙ্কাজনক অবস্থার দিকে যাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, করোনা ওয়ার্ডই নয়, পুরো হাসপাতালের জনবল সংকট রয়েছ। করোনা ওয়ার্ডের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। সেখানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে তো এক ধরনের শঙ্কা রয়েছে। জীবন-মরণ শঙ্কা যেখানে বেশি সেখানে চিকিৎসকরা সব নির্দেশনা অনুসরণ করতেও পারেন না। আর সবাই তো ডেডিকেটেড হতেও পারেন না। তবে সব ক্ষেত্রে ডাক্তারদের দরকার নেই। নার্সরাই অনেক কিছু করতে পারেন। তিনি বলেন, যেসব ওষুধ হাসপাতালে সরবরাহ নেই, সেই ওষুধ বাহির থেকে কিনতে হয়। ওইসব ওষুধ কিনতে রোগীর স্বজনরা বাইরে থেকে কিনে আনেন। কোনো রোগী গিয়ে ওষুধ কেনার কথা নয়। ডাক্তারদের পক্ষে তো রোগীদের পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়।