১৭ দিনের রিমান্ড শেষে কুয়েতের কারাগারে পাপুল

১৭ দিনের রিমান্ড শেষে মানব ও অর্থ পাচার এবং ভিসা বাণিজ্যের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুরের সংসদ সদস্য মো. শহীদ ইসলাম ওরফে কাজী পাপুলকে দেশটির কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে রিমান্ডে টানা ১৭ দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত মঙ্গলবার এমপি পাপুলকে ২১ দিনের জন্য কুয়েতের কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর আদেশ হয়েছে বলে আরব টাইমসের খবরে বলা হয়েছে। আরবি দৈনিক আল-কাবাস বলেছে, পাপুলের সঙ্গে তার মালিকাধীন মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপের কর্মকর্তা মুর্তজা মামুনকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এদিকে গ্রেপ্তার, রিমান্ড এতকিছুর পরও কুয়েত সরকার বাংলাদেশকে পাপুলের বিষয়ে কিছুই জানায়নি। এমনকি কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসকেও কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য দেয়নি দেশটির সরকার। কুয়েতের গণমাধ্যমগুলোর বরাতে দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পাপুলের সম্পর্কে তথ্য পাচ্ছেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এম এ মোমেন।

দেশের বাইরে মানব ও অর্থ পাচারের অভিযোগে একজন সংসদ সদস্যের কারাগার এবং পরিণাম নিয়ে কী ভাবছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমন প্রশ্নে ড. মোমেন বলেন, কুয়েত থেকে আমাদের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য যদি সঠিক হয় তা অবশ্যই আমাদের জন্য ভাবমূর্তি ক্ষুণেœর কারণ। আমরা বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে দেখছি। আর অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানি না। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ৭ জুন পাপুল কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই আমরা সজাগ। কুয়েত মিশনকে এ বিষয়টি খেয়াল রাখার জন্য বলা হয়েছে। তবে সরকার আগ বাড়িয়ে কিছু করতে চায় না। কারণ দেশটিতে বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার। তাছাড়া তাদের প্রচলিত আইনেই সবকিছু হচ্ছে। তিনি বলেন, কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চাপ না এলেও, বাংলাদেশ সরকার পাপুল ও তার স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাবে নেমেছে। গত ১৭ জুন দুর্নীতি দমন কমিশন এ সাংসদ দম্পতির ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। বিদেশ যাওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

গত ৭ জুন কুয়েতের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট-সিআইডির হাতে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সাংসদ পাপুলের গ্রেপ্তারের খবর আসে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। প্রথমদিকে সে খবর নিশ্চিত হওয়া না গেলেও দুদিন পরে জানা যায় গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডেও নেওয়া হয় তাকে। মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অন্যতম মালিক পাপুলের কুয়েতে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি রয়েছে। এমপি পাপুল রিমান্ডে যা বলেছেন, তা কুয়েতের প্রসিকিউটরদের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করছে। দেশটির কর্মকর্তাদের তিনি কীভাবে কত টাকা ঘুষ দেন সেসব কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসছে। কুয়েত টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, কুয়েতের তদন্তকারীরা পাপুলের মদদদাতা হিসেবে ইতিমধ্যে সাতজনকে চিহ্নিত করেছেন। এদের মধ্যে কুয়েতের দুজন বর্তমান এবং একজন সাবেক এমপি রয়েছেন। তবে বর্তমান দুই এমপি তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

জিজ্ঞাসাবাদে পাপুল তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জানান, তার মালিকানাধীন মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানিতে প্রায় নয় হাজার কর্মী রয়েছে। এদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। লোক নিয়োগে ৩৪টি সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠানের চুক্তি রয়েছে বলেও তথ্য দিয়েছিলেন তিনি। এদিকে পাপুল ও তার কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রায় ১৩৮ কোটি টাকা জব্দ করা হয়েছে বলে দেশটির পাবলিক প্রসিকিউশনের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। কুয়েতের যেসব কর্মকর্তাকে পাপুল ঘুষ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে দেশটির দুর্নীতি দমন সংস্থা ‘নাজাহা’।

অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে সাংসদ কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল, তার স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দুদকের চিঠিতে যাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে পাপুল ছাড়া অন্যরা হলেন তার স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও সেলিনার বোন জেসমিন। দেশে এমপি পাপুলের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তার এবং স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সব হিসাবের লেনদেনও স্থগিত করেছে দুদক।