দ্রুত রায় চায় রিফাত-মিন্নি পরিবার

বরগুনার আলোচিত শাহনেওয়াজ রিফাত (রিফাত শরীফ) হত্যার এক বছর পূর্ণ হলো আজ শুক্রবার। এক বছর আগে আজকের এই দিনে বরগুনার কলেজ রোড এলাকায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। দেশব্যাপী আলোড়ন তোলা এ হত্যাকাণ্ডের পর প্রথমদিকে মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ দ্রুতগতিতে এগোলেও বর্তমানে তা করোনা পরিস্থিতির কারণে থমকে গেছে। এ পরিস্থিতিতে হতাশায় দিন কাটছে নিহত রিফাত শরীফ এবং মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়া আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির পরিবারের সদস্যদের। দুপক্ষেরই চাওয়া দ্রুত বিচারকাজ শেষ করে মামলার রায় ঘোষণার।

রিফাতের হৃদরোগাক্রান্ত বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বলছেন, তিনি শুধু মৃত্যুর আগে তার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চান। অন্যদিকে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের বিশ্বাস, মামলার বিচারকাজ শেষ হলে তার মেয়ে নিরপরাধ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পাবে। আর আইনজীবীরা বলছেন, করোনার ক্রান্তিকাল কাটিয়ে উঠলেই দ্রুত শেষ হবে আলোচিত এ মামলার বিচার কার্যক্রম।

বরগুনার কলেজ রোড এলাকায় ২০১৯ সালের ২৬ জুন সকাল সোয়া ১০টার দিকে স্ত্রী মিন্নি ও শত শত মানুষের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাতকে। এ ঘটনায় পরদিন ১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ। এক এক করে যখন আসামিরা গ্রেপ্তার হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে ২ জুলাই ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড। ঘটনা নতুন মোড় নেয় ১৬ জুলাই। সেদিন সকালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী মিন্নিকে পুলিশ লাইনে নিয়ে রাতে রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর ২৮ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান তিনি।

পরে গত ১ সেপ্টেম্বর মিন্নিকে অভিযুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ জনকে আসামি করে দুই ভাগে বিভক্ত মামলার চার্জশিট দেয় পুলিশ। বর্তমানে মামলাটি বরগুনা জেলা দায়রা জজ আদালত ও শিশু আদালতে বিচারাধীন। দায়রা ও জজ আদালতে ৭৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। বর্তমানে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। আর শিশু আদালতে মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ এখনো হয়নি। করোনার ক্রান্তিকাল কেটে গেলে আদালতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া শুরু হলে আবারও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। এ মামলায় প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের মধ্যে মিন্নি ও অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের মধ্যে সাতজন আসামি জামিনে রয়েছে। বাকিরা কারাগার ও যশোর শিশু কিশোর সংশোধনাগারে রয়েছে। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক আসামি মুসা এখনো পলাতক।

নিহত রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলের মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারের সদস্যদের দিনগুলো খুবই দুর্বিষহ কেটেছে। একমাত্র আল্লাহপাকই জানেন কীভাবে আমরা দিনগুলো পার করেছি। সরকারের প্রতি আমার আকুল আবেদন যাতে এ মামলাটির বিচারকাজ শেষ করে দ্রুত রায় দেওয়া হয়। আমি নিজেই হৃদরোগাক্রান্ত, তাই আমি যেন আমার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে পারি।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে মারা গেছে, কিন্তু আমার পাশে আমি কাউকে পাইনি। দেশে এত দাতা সংস্থা, এত মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে কিন্তু তারা কেউ আমার পাশে দাঁড়ায়নি।’

অন্যদিকে মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়া মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশের মানুষ দেখেছে আমার মেয়ে রিফাতকে বাঁচাতে অস্ত্রের মুখে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কীভাবে লড়েছে। মামলার বিচারকাজ শেষ হলে আমার মেয়ে নিশ্চয়ই নিরপরাধ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পাবে।’

রিফাত হত্যা মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে শিশু আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশু আদালতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছাড়া সব সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে আদালতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। করোনার ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে আদালত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শুরু হলে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বিচারকাজ শেষ হবে।’

অন্যদিকে বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) ভুবন চন্দ্র হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের বিরুদ্ধে ৭৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। মামলাটি এখন আত্মপক্ষ সমর্থনের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু না হলে এতদিনে হয়তো মামলাটিতে আদালত রায় দিতেন। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি পরিচালনা করেছি। আদালতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া শুরু হলে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এ মামলার রায় হবে বলে আমরা আশাবাদী।’