‘আমি আমার কালো ছেলেকে মিথ্যে বলেছি’

ক্রিস্টিনা হেইল-এলিয়ট আমেরিকান কালো নারী, তিন সন্তানের জননী, হার্ভার্ডের এমএ স্কুলে পড়ান, সমাজসেবা দপ্তরে কাজ করেন এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখেন। সাদা পুলিশ ডেরেক কাভিন ২৫ মে ২০২০ কালো মানুষ জর্জ ফ্লয়েডকে জনসমক্ষে মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় ফেলে ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে তার গলায় হাঁটু চেপে ধরে রেখে মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। ফ্লয়েড বারবার বলছিলেন ‘আমি শ^াস নিতে পারছি না।’ কিন্তু তাতে সাদা পুলিশের কী এসে যায়?

এই দৃশ্য ভাইরাল হয়ে যায়, ইন্টারনেটে সারা দুনিয়াতেই ছড়িয়ে পড়ে। দৃশ্যটি দেখে ক্রিস্টিনা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কেঁদেছেন। প্রশ্ন করেছেন নিজেকে, কালোমানুষের জীবনের কি দাম নেই?

বর্বরতার চরমে পৌঁছেছে পুলিশ। আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব, আমেরিকার গণতন্ত্র আমেরিকার মানবাধিকার সবই মিথ্যে, ভয়ংকর মিথ্যে, যে আস্তরণে মিথ্যেগুলো ঢাকা তাও মিথ্যে। সাদা মানুষের হাতে সম্প্রতি নিহত ক’জন হতভাগ্য কালোকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ক্রিস্টিনা যখন বাসায় ফিরলেন, দেখলেন তার নয় বছর বয়সী ছেলে বিছানায় শুয়ে কেঁদে চলেছে। ফ্লয়েড হত্যার ক্লিপটিও তার দেখা হয়ে গেছে। এমনভাবে সাদা মানুষের হাতে নিহত আরও কিছু নাম তাদের ঘরের সামনে সাইডওয়াকের দেয়ালে সে লিখে রেখেছে। সঙ্গে পাঠানো আছে কিছু বার্তাÑ ‘কালো জীবনেরও মূল্য আছে’, ‘আমাদের শ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে।’

তিনি দেখলেন তার ছেলে কেবল কষ্ট পাচ্ছে তা-ই নয়, সে আতঙ্কিতও। আতঙ্কটাই বড়। সাদাদের হাতে খুন হওয়া আহমদ আরবেরি, ব্রেয়োন্না টেয়লর কিংবা জর্জ ফ্লয়েডের কাজের পাশাপাশি নয় বছর বয়সী ছেলেটি এটাও জানে তার সুন্দর উজ্জ্বল কালো রং যাতে তার পূর্বপুরুষের শক্তির প্রতিফলন ঘটেছে, যে কালো ত্বকে লিখিত হয়েছে মানব সভ্যতার ইতিহাস, সেই রংই আজ তাকে ভয়ংকর ও নির্মম মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। তিনি লিখলেন, কিন্তু আমি তখন কী করতে পারতাম? বাইরে যাওয়ার কথায় ছেলেটি আতঙ্কিত হয়ে ওঠে, যদি তার ব্ল্যাক প্যান্থার শরীরটা দেখে প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে গুলি করে?

‘আমি মিথ্যে কথা বললাম।’ আমি তাকে বললাম, দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। মা আছে বাবা আছেÑ আমরা তোমাকে রক্ষা করব। আগে যেমন করেছি তেমনি আবার মনে করিয়ে দিই পুলিশ এবং স্থানীয় নিরাপত্তারক্ষকের মোকাবিলা হয়ে গেলে কী করতে হবে, বাড়িতে জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা তো বাড়াতে হবে। আমি তাকে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করি; আসলে আমি নিজেকেই বোঝাতেই চেষ্টা করি তাদের হাত থেকে আমার ছেলেকে নিরাপদে রাখতে পারব তো?

ছেলেমেয়েরা অন্ধকারকে ভয় পায়, ঘন ছায়াতে হামাগুড়ি দিয়ে দানব এসে তাদের আক্রমণ করবে কিন্তু আমার ছেলের ভয় ভিন্ন এক দানবকে তার অন্ধকার গায়ের রঙের জন্য সে দানব এসে তাকে আক্রমণ করবে। তার বয়স যখন দু’বছর তখন থেকেই আমি সত্যটা জানি যখন ট্রেভন মার্টিনের হত্যাকারীর রায় ঘোষণা করা হয় (অন্যায়ভাবে যে খুনিকে আদালত ছেড়ে দিয়েছে তার নাম না নিয়ে অন্যায়ভাবে যাকে খুন করা হয়েছে তার নামই নিচ্ছি। আমি জানি আসলে আমি তাদের জীবনের নিরাপত্তার গ্যারান্টি তো দিতেই পারব না, এমনকি খুন হলে বিচার পাওয়ার গ্যারান্টিও না)। সত্য হচ্ছে আতঙ্কের মুষ্টিতে কেবল আমার পুত্রই আবদ্ধ নয়, এমন আরও অনেকেই আছে। সেই জীবনগুলোকে কেমন করে এবং কেন হরণ করা হয়েছে এ ধরনের প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে আমি আঁতকে উঠতাম, এখনো আঁতকে উঠি এই ভেবে যে শৈশবের পুরো আনন্দ সে কখনো পাবে না।

তিনি তার নয় বছরের ছেলের সঙ্গে মিথ্যে বলেছেন, কিন্তু না বলে উপায় কী? তিনি জানেন বড় জোর কোনো ঘাতকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলা হবে এ হচ্ছে আসল দোষী। কিন্তু কষ্ট করে কেউ ঢাকনাটি উঠিয়ে দেখবে না রন্ধনপ্রক্রিয়া কী বিষক্রিয়া তৈরি করছে যার নাম সাদা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ববাদ যা আসলে বর্ণবাদ। পৃথিবী এখন করোনাভাইরাস নামের বিশ্বব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, বর্ণবাদের আতঙ্কে কাঁপছে সাদা আধিপত্যের আমেরিকার কালোমানুষ।

ক্রিস্টিনা যে ট্রেভনের কথা বলেছেন, ১৭ বছর বয়সী মাথায় হুড তোলা ফ্লোরিডার মায়ামি গার্ডেনের সেই বালকের জন্ম ১৯৯৫-র ফেব্রুয়ারিতে, ট্রেভন বেঞ্জামিন মার্টিন স্কুল ছুটির দিনে বাবার সঙ্গে বাবার নতুন গার্লফ্রেন্ডের বাড়িতে এসেছে। বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়েছে যখন তার বয়স চার বছর। ট্রেভন ও বান্ধবীর ছোট ছেলেকে বাড়িতে রেখে দুজন সিনেমা দেখতে যান। ছোট বাবুটির জন্য চকলেট কিনে আনতে ট্রেভন কাছাকাছি একটি গ্রোসারিতে যান। ট্রেভন কার ওয়াশ ও বেবি সিটিং করে এবং কখনো ঘাস কেটেও নিজের হাত খরচের টাকাটা জমিয়ে থাকে। ডক্টর মাইকেল এসক্রপ হাই স্কুলের সুবোধ ছাত্রদের একজন ট্রেভন। খেলাধুলায় ফুটবল ও বাস্কেটবলে সেরা খেলোয়াড়দের অন্যতম। তার গর্ভদাত্রী মা সাব্রিনা ফুটবল হাউসিং অথোরিটিতে চাকরি করতেন, বাবা ট্রাক ড্রাইভার, পরিবারে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলেও সাব্রিনা ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ট্রেভন ফ্লোরিডা কিংবা মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের এভিয়েশন স্কুলে পড়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। উড়োজাহাজ নিয়ে পড়ালেখা করবে। চকলেট নিয়ে ফেরার সময় এলাকার স্বেচ্ছাসেবী পাহারাদার জর্জ জিমারম্যান হুডিতে মাথা ঢাকা ছেলেটিকে আটকায় এবং তাকে সন্দেহজনক বলে পুলিশকে ফোন করে। এনিয়ে জিমারম্যান এবং ট্রেভনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়, এক পর্যায়ে জিমারম্যান তাকে গুলি করলে কিশোর ট্রেভন লুটিয়ে পড়ে। প্রতিবাদে আমেরিকা উত্তাল হয়ে ওঠে। তার মা-বাবা খুনের মামলাই করতে যান। শেষ পর্যন্ত সেকেন্ড ডিগ্রি খুনের মামলায় সাদা বিচারক তার রায়ে জিমারম্যানকে মোটেও দোষী সাব্যস্ত করেননি, বেকসুর খালাস দিয়ে দেন এবং মন্তব্য করেন, কেবল আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে তাকে বন্দুক চালাতে হয়েছে এবং জিমারম্যান সম্পূর্ণ নির্দোষ!

ক্রিস্টিনা এই কথাটিই বলতে চেয়েছেন বিচারের সান্ত¡না যে পাবেন সে আস্থাও তার নেই। পুলিশ অভিযোগ প্রথমেই খারিজ করে দিয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হলে মামলা রুজু করে। চর্চাটা অনেকটা আমাদের মতোই ক্ষমতাসীনদের কেউ হলে আবার মামলা কীসের! কালোর বিরুদ্ধে সাদাদের এই সহিংসতার প্রাতিষ্ঠানিক চিত্রটি পুলিশের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। ক্রিস্টিনা কাঁদেন এবং ভাবেন কখন তার ছেলে সবচেয়ে নিরাপদ ছিল?

‘সাদা কর্তৃত্ব ও ঘৃণা থেকে এবং পৃথিবীর কাছ থেকে কখনই বা নিরাপদে রাখতে পেরেছিলাম।’ কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো জরায়ু অন্তত কালো শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। কালো নারী ও শিশুর গর্ভকালীন মৃত্যুর হিসাব নিলেই বেরিয়ে আসে বৈষম্যের চিত্র। আরও ভয়াবহ ঘটনা আছে। ক্যালিফোর্নিয়াতে পুলিশের গুলি এমারেল্ড ব্ল্যাক নামের যে কালো নারীর পেট ফুঁড়ে জরায়ুতে ঢুকে, তা কেবল বেড়ে উঠতে থাকা শিশুটিকেও বিদ্ধ করে। গুলিবিদ্ধ এমারেল্ড প্রাণে বেঁচে গেলেও গর্ভপাতে মৃত্যু হয় না জন্মানো শিশুটির। টেক্সাসে ২৮ বছর বয়সী অ্যাটাটিয়ানা জেফারসন নামের কালো নারীকে দুপুর আড়াইটায় তার বাড়ির জানালা দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। সে সময় তিনি বাড়িতে তার ভাইয়ের ছেলের সঙ্গে ভিডিও গেম খেলছিলেন। পুলিশকে কেন গুলি করতে হলো? কারণ পুলিশ এই নারীকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করেছে। টেক্সাসে ৪৪ বছর বয়সী আরও একজন কালো নারী পামেলা স্ট্যানলি টার্নারকে তারই অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের পার্কিং লটে সাদা পুলিশ যখন গুলি করতে যাচ্ছে তখন তিনি চিৎকার করে বলেন, আমি প্রেগন্যান্ট। তাকেও মরতে হয়েছে টহল পুলিশের গুলিতে, গর্ভের সন্তান সঙ্গে নিয়ে, ঠিক গায়ের রংটা পাল্টে সেই ট্রেভন যদি সাদা আর খুনি জিমারম্যান যদি কালো হয়ে যেত, তাহলে হতো ঠিক উল্টো, জিমারম্যানকে বাকি জীবন অন্তত জেলে কাটাতে হতো।

জেরিকা মেগগি নামের ২১ বছর বয়সী গুলিবিদ্ধ কালো নারীকে পুলিশ যখন উদ্ধার করে তখনই মৃত, ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হলে প্রতিবেদন দেওয়া হয় জেরিকা গর্ভবতী ছিল। ইন্ডিয়ানাপোলিসে পুলিশের গাড়ি উঠে পড়েছে ফুটপাতে গর্ভবতী নারীর ওপর। মৃত্যু উভয়েরই। নারীর সঙ্গে সন্তানেরও।

ক্রিস্টিনা এখন জেনে গেছেন জরায়ু আর নিরাপদ কোনো স্থান নয়। তাহলে নিরাপত্তা কোথায়? কালোশিশুর নিরাপত্তা কে দেবে? ক্রিস্টিনা লিখলেন, ‘যখন তুই আমার স্বপ্নে ছিলি তখনই ছিলি সবচেয়ে নিরাপদ’।

তিনি এখন প্রার্থনা করেন ছেলেকে যে মিথ্যে কথা বলেছেন তা যেন কখনো অসত্য প্রমাণিত না হয়। মিথ্যেটাই যেন সত্যি হয়ে থাকে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক