ছাত্রজীবনে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় একটি গবেষণার কাজের সময় বেশকিছু স্থাপত্য-ঐতিহ্য নিদর্শন চিহ্নিত করি, যার একটি ছিল অসাধারণ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এক গম্বুজবিশিষ্ট সুলতানি আমলের মসজিদ। স্থানীয় মানুষের কাছে মসজিদটির কোনো তথ্যই ছিল না। কিছু নোট ও ছবি নিয়েছিলাম আমার ইয়াসিকা ফিল্ম ক্যামেরা দিয়ে; ইচ্ছে ছিল ভবিষ্যতে এ স্থাপত্য নিদর্শন বিষয়ে গবেষণা করব। সে আশাবাদ নিয়ে অধ্যাপনার শুরুর দিকে দেবহাটায় গিয়ে বড্ড আশাহত হয়েছিলাম। নামাজের স্থান সংকুলান না হওয়ায় ঐতিহ্যের সাক্ষী সেই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য-ঐতিহ্যটি ভেঙে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করেছে স্থানীয় জনগণ। এ ধরনের ঘটনা এ দেশে অহরহ ঘটছে ঐতিহ্য বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে। অথচ খানিকটা উদ্যোগ নিলে প্রাচীন মসজিদ অক্ষত রেখে নতুন মসজিদ নির্মিত হতে পারত। পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা মসজিদ ছিল মোগল আমলের একটি মসজিদ, সেটিও বেশ কয়েক বছর আগে ভেঙে ফেলা হয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ আমরা একটি বিবৃতিও দিয়েছিলাম, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় রক্ষা করা যায়নি মসজিদটি। পুরান ঢাকায় কয়েক বছর আগে এ ধরনের আরেকটি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়।
দেশের মানুষের ঐতিহ্যের প্রতি উদাসীনতার এই প্রবণতা কষ্টকর। দেশে করোনার কালো স্রোত প্রবাহের শুরুর আগে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ময়মনসিংহ গিয়েছিলাম একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কাজে। প্রত্নতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আমার বরাবরই আগ্রহ থাকে নতুন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চিহ্নিত করার বিষয়ে, যেগুলোর তালিকা কোনো সরকারি দপ্তরের নথি ঘেঁটে বের করা যাবে না। লোকমুখে প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপত্যের খবর পেয়ে এবারের জরিপ কাজে মুক্তাগাছার কয়েকটি ইউনিয়নে গিয়েছিলাম। একটি অটো ভাড়া নিলাম দূরের মসজিদটিতে যাবার জন্য।
গ্রামের মেঠো পথ ধরে ধুলোবালি মেখে হাজির হয়ে হতাশায় ভেঙে পড়লাম, কারণ কয়েক মাস আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শনটিকে। যুক্তি পুরনো মসজিদে স্থান সংকুলানের অভাব। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখলাম ভেঙে ফেলা মসজিদের ইটের টুকরো আর চুন-সুরকির অবশেষ। জিজ্ঞেস করায় একজন মুরব্বি দুটো ইট এনে দেখালেন। তা দেখে আপাত দৃষ্টিতে মনে হলো এটি সুলতানি কিংবা মোগল যুগের প্রারম্ভিক পর্বের একটি মসজিদ। ফেরার পথে অন্য একটি মসজিদের খবর পেয়ে অটোওয়ালাকে নিয়ে ছুটে গেলাম আরেকটি গ্রামে, কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। ওখান থেকে ছুটে গেলাম দাওগাঁও ইউনিয়নের খাজুলিয়া দক্ষিণপাড়ায়। এখানে মসজিদ না থাকলেও মসজিদের পাশে বিবির ঘর নামক দোচালা স্থাপত্যকর্মটি এখনো টিকে আছে কালের পরিক্রমায়। সম্ভবত এটি মোগল আমলের একটি স্থাপত্যকর্ম। সাধারণের কাছ থেকে জানলাম মসজিদটি ছিল এক গম্বুজবিশিষ্ট একটি স্থাপত্য। সেটির পাশে ছিল প্রাচীন কবরস্থান, একটি কূপ ও পুকুর। সব মিলিয়ে এটি যে একটি কমপ্লেক্স ছিল সে বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত। ‘বিবির ঘর’ নামক দোচালা রীতির অসামান্য স্থাপত্য নিদর্শনটি ছাড়া সবই আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়েছে, কবরস্থান মাটি দিয়ে ভরাট করে আর কূপটি মাটি ভরাট করে তার ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মিত হয়েছে। কেবল ইটের কূপের মুখ-রেখা কোনোক্রমে টিকে আছে কালের খেয়ায়। পুকুরটি টিকে আছে দুরুদুরু বুকে ভরাট হওয়ার শংকায়। অতি দ্রুত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও প্রশাসন সক্রিয় না হলে এ মূল্যবান সাংস্কৃতিক নিদর্শনটিও ধ্বংস হয়ে যাবে। এটিকে দ্রুত সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এ ধরনের আরও দুটো বিবির ঘরের অস্তিত্ব ছিল পাশের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নে। কিন্তু দুঃখজনক যে, ওই দুটো অমূল্য স্থাপত্য-নিদর্শন আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। ফলে চিরকালের মতো হারিয়ে গেছে ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হুমকির মুখে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের বাড়িউরা বাজার সংলগ্ন মোগল আমলের একটি সেতু। সেতুটির পাশেই রয়েছে একটি মসজিদ। এগুলো প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত। আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে মোগল জমিদার দেওয়ান শাহবাজ আলী একটি খালের ওপর এটি নির্মাণ করেছিলেন। আমাদের দেশে ঔপনিবেশিক আমলের অনেক জমিদার বাড়ি এখনো ভালোভাবে সংরক্ষিত আছে। সুলতানি কিংবা মোগল আমলের স্থাপত্য নিদর্শন সময়ের করাল গ্রাস, সংরক্ষণ ও জনসচেতনতার অভাবে ঐতিহ্যের দৃশ্যপট থেকে ক্রমান্বয়ে মুছে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অন্ধকারে ঢাকা পড়ছে।
সরাইলের এ স্থাপনাটি পত্রিকার শিরোনাম হওয়ার কারণ হলো পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প। বিষয়টি হয়তো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরে এসেছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় অবশ্যই সাংস্কৃতিক সম্পদের রক্ষাকবচ থাকতে হবে, না হলে সেটি টেকসই উন্নয়ন হবে না। এখানে দ্রুত ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। কেবল সেই পুরানো আমলের প্রত্ন-নিদর্শনের তালিকা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না, বরং প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করতে হবে মনুমেন্ট লিস্ট। বিভিন্ন অংশীজন যেমন জনপ্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বসহ সবার ভূমিকা নির্দিষ্ট করে সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে কাজে লাগাতে হবে। এছাড়া স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্কুল-কলেজের ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। আসলে সচেতনতার কাজটি আমাদের স্কুল পর্যায়েই শুরু করতে হবে। স্কুলের কারিকুলাম প্রণয়নের সময়ে সিলেবাসে সাংস্কৃতিক-ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব বিষয় সংযোজন করতে হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন ও সংশ্লিষ্ট না করে কোনোক্রমেই ঐতিহ্য কিংবা জনস্বাস্থ্য সফলভাবে রক্ষা করা সম্ভব নয়, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এ করোনাকাল।
লেখক : অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ঃঁঃঁষসয@মসধরষ.পড়স