করোনাকালে মাস্ক পরে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এজন্য তাদের চিহ্নিত করতে বেগ পেতে হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। তারা বলছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক থাকার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। এ কারণে তাদের খুঁজে বের করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরাতেও অপরাধীদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।
এদিকে সম্প্রতি ঢাকার পাশাপাশি দেশজুড়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, করোনার কারণে সন্ধ্যার পর অধিকাংশ সড়কই প্রায় মানবশূন্য হয়ে পড়ার সুযোগে ওঁৎ পেতে থাকা ছিনতাইকারী পথচারীদের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগসহ অন্যান্য মালামাল লুটে নিচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে পুলিশের টহল আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
অপরাধবিশ্লেষকরা বলেছেন, কভিড-১৯ মহামারী অপরাধীদের জন্য আশীর্বাদ বয়ে এনেছে। মাস্ক পরলেই কাউকে শনাক্ত করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। আর অপরাধীরা এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। মুখোশ পরার কারণে তারা অপরাধ করছে সহজেই। তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। র্যাব-পুলিশের টহলও বাড়াতে হবে। আর না হয় অপরাধ বাড়বে এবং দিনে দিনে অপরাধীরা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধীরা এখন কৌশল পাল্টেছে। পুলিশকেও কৌশল পাল্টাতে হবে। পুলিশের নজরদারি বাড়াতে হবে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এলাকায় টহল বাড়াতে হবে।’
জানা গেছে, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর করণীয় নিয়ে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। বৈঠকে মাস্ক পরা অপরাধীসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক থেকে রেঞ্জ ডিআইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার ও জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন আইজিপি। পাশাপাশি ফ্যাক্স বার্তায় রেঞ্জ ডিআইজি ও এসপিদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনাভাইরাসের সুযোগে অপরাধীরা তৎপর রয়েছে। বিশেষ করে তারা মুখে মাস্ক পরে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তাদের চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রচণ্ড বেগ পোহাতে হচ্ছে। আইজিপি স্যার নির্দেশ দিয়েছেন কঠোরভাবে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। নির্দেশনা পেয়ে পুলিশ কাজ শুরু করে দিয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। কোনো মহল যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটাতে পারে, সেজন্য পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গত কয়েক মাস দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালোই ছিল। হঠাৎ কিছুদিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে অপরাধ বেড়ে গেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণ পদ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধী প্রায়ই পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। তবে আমরাও নানা কৌশল নিয়ে অপরাধীদের ঘায়েলের চেষ্টা করছি। তবে করোনার সুযোগ নিচ্ছে তারা। মাস্ক পরার কারণে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে সামান্য সমস্যা হচ্ছে তা সত্য। তবে অপরাধীরা কিন্তু পার পাচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধীরা মুখোশ ব্যবহার করে এমন ঘটনার সংখ্যা খুব বেশি নয়। আমরা ইতিমধ্যে অপরাধীদের শনাক্ত করেছি এবং গ্রেপ্তারও করেছি। তারপরও আমরা সতর্ক আছি।’
একই কথা বলেছেন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিছু ঘটনা ঘটছে কিন্তু পুলিশ সেসব ক্ষেত্রে কাজ করছে এবং পদক্ষেপ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যা যা করা দরকার তাই করা হচ্ছে।’
কুমিল্লার এসপি নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালে মানবতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা নানাভাবে কাজ করছি। রাস্তায় যারা বের হচ্ছেন তাদের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে অপরাধীরা এই সুযোগ নিচ্ছে। তবে আমরা সতর্ক আছি।’ একই কথা বলেছেন রংপুরের এসপি বিপ্লব কুমার সরকার, কক্সবাজারের এসপি এ বি এম মাসুদুর রহমান ও পাবনার এসপি রফিকুল ইসলাম। তারা বলেন, মাস্ক পরা অপরাধীদের নিয়ে সতর্ক আছি। এলাকায় টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বুধবার রাত পৌনে ৮টার দিকে বাড়ির সামনে হেঁটে যাওয়ার সময় তিন যুবক রাজধানীর রূপনগর এলাকায় ঝুট ব্যবসায়ী আবদুল সাত্তার মাতুব্বরকে গুলি করে। তিনি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রূপনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল বাশার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। কিন্তু এখনো কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। আক্রমণকারীদের খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। কারণ তারা মুখোশ পরা ছিল।
গত ৩ মে যাত্রাবাড়ীর মীরহাজারীবাগের একটি চিকিৎসাসামগ্রীর দোকানের শাটার ভেঙ্গে ৩ লাখ টাকা মূল্যের মালামাল লুট করে দুর্বৃত্তরা। এ প্রসঙ্গে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, অপরাধীরা একটি গাড়ি ব্যবহার করেছে। কিন্তু তারা সবাই মুখোশ পরা ছিল এবং গাড়িতে কোনো নম্বর প্লেট নেই। এই কারণে আমরা ঘটনার দেড় মাস পরেও অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের পর গত তিন মাস ধরে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু যারা এসব অপকর্ম করেছে তারা মুখে মুখোশ ব্যবহার করার কারণে তাদের চিহ্নিত ও খুঁজে বের করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে আবারও আমরা অ্যানালগ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা করছি।’
এরপর ১৬ মে চকবাজারের বকশীবাজার এলাকায় রিকশাযাত্রীর কাছ থেকে ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা লুট করা হয়। এর পাঁচ দিন পর বেগমবাজারে একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের ঘটনা ঘটে। এ প্রসঙ্গে চকবাজার থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার বলেন, ‘এসব ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু অপরাধীরা মাস্ক পরে এসব অপরাধ করেছে। তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। আশা করি, অল্প সময়ে তাদের আইনের আওতায় আনতে পারব।’ এলাকায় টহল পুলিশের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের তথ্য অনুসারে, গত দেড় মাসে রাজধানীতে এক ডজন ডাকাতি ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় এখনো অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়নি। গত মার্চের শেষ দিকে সাধারণ ছুটি শুরুর পর এপ্রিল মাসে রাজধানীতে বড় ধরনের অপরাধের ঘটনা কিছুটা কমে যায়। তবে এ সময়ে বেশ কয়েকটি চুরির ঘটনা ঘটে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ২৫টি ডাকাতি, ২৭৫টি হত্যা, ৪৯০টি ধর্ষণ, ১০০৫টি নারী নির্যাতন, ২১০টি শিশু নির্যাতন, ৩৮টি অপহরণ এবং ৫৫৮টি চুরির মামলা হয়। কিন্তু এপ্রিলে মাত্র ১০টি ডাকাতি, ২৭৫টি হত্যা, ৩৩৫টি ধর্ষণ, ৪৬৫টি নারী নির্যাতন, ১২৫টি শিশু নির্যাতন, আটটি অপহরণ ও ২৯০টি চুরির মামলা হয়। আর মে মাসে ডাকাতি ১২টি, ৩৬০টি খুন, ৩৫৫টি ধর্ষণ, ৬৭০টি নারী নির্যাতন, ১৪০টি শিশু নির্যাতন এবং ৩৯০টি চুরির মামলা হয়। আর বেশিরভাগ ঘটনারই সময় অপরাধীরা মুখে মাস্ক পরা ছিল।