হেটক্রাইম ও বিদ্বেষ প্রসঙ্গে

সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন নিজের ধর্ম, বর্ণ, পেশা, লিঙ্গীয় পরিচয় কিংবা কোনো শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতার কারণে নিপীড়নের শিকার হন তখন সেটাকে ‘হেটক্রাইম’ বলা হয়ে থাকে। তিনি যেকোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক কিংবা আর্থিক আক্রমণের শিকার হলেও তাকে ‘বিদ্বেষপ্রসূত হামলা’ বা ‘হেটক্রাইম’ বলা যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা সারা দুনিয়ায় এমন নানা বিদ্বেষপ্রসূত হামলা বা হেটক্রাইম ঘটতে দেখছি। 

ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি যে, করোনা মহামারীর কালে বিশ্বে নতুন করে আবার বর্ণবাদ বা ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ ও বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো সামনে চলে এসেছে। কেবল কোনো একটি দেশ, মহাদেশ বা অঞ্চলেই এমন হচ্ছে তা নয়। গোটা বিশ্বেই কম-বেশি এরকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশগুলোতে বর্ণবাদ ও বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও বর্ণবাদ ও বৈষম্যের মতো সমস্যা নতুন করে সামনে আসছে। ইউরোপ-আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় জনগোষ্ঠী। অন্যদিকে এশিয়ার দেশগুলোতে বর্ণবৈষম্যের পাশাপাশি ধর্মীয় বিদ্বেষও রয়েছে। ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ভারতের মতো দেশগুলোতে লকডাউনে নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে দেশগুলোর যৌনকর্মীরা চরম বৈষম্যের শিকার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসুস নিজেই বর্ণবাদী আচরণের শিকার হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাদা-কালোর যে জাতিবিদ্বেষ দেখা দিয়েছে তা সুপ্ত বর্ণবিদ্বেষেরই প্রকাশ। রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মানুষের ভেতরে নানামুখী হতাশা তৈরি হয়। আর এ হতাশা থেকে বিভিন্ন বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তার লাভ করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাস মহামারীর জন্য শুরু থেকেই চীনকে দায়ী করে আসছেন। তিনি এই ভাইরাসকে সরাসরি ‘চীনা ভাইরাস’ নামে ডাকছেন। যা দেশটিতে থাকা চীনা বংশোদ্ভূত নাগরিকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে চীনা নাগরিক, চীনা বংশোদ্ভূত ও এশীয়রা ব্যাপকহারে জেনোফোবিয়া বা জাতিবিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন। এমনকি রাস্তায় চলতে গিয়ে হামলার শিকারও হচ্ছেন। যা ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। আমেরিকার পুলিশ বলছে, বেশিরভাগ বিদ্বেষ অপরাধই বর্ণবাদী। এ বর্ণবাদী বিদ্বেষ কিন্তু আজ প্রথম নয়, দীর্ঘকাল থেকে সেখানে চলছে। তবে ধর্মীয় কারণেও অনেকে বিদ্বেষ হামলার শিকার হয়েছেন। আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো হেটক্রাইমের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে, ধর্মান্ধদের কর্তৃক হুমকির শিকার হচ্ছে। ভারতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষটাকে সরাসরি উসকে দিচ্ছে। আর এর মাধ্যমে আমাদের সমাজ ভীতিকরভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে। তারপরও সংখ্যালঘুসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সমালোচকদের হাতে মিডিয়ায় ক্রোধের শিকার হচ্ছেন। আমরা এই অবস্থায় পৌঁছালাম কী করে? যেকোনো অনলাইন নিউজের কমেন্ট সেকশনে গেলেই দেখা যাবে লোকজন সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও বর্ণবাদী অসহিষ্ণুতা সম্পর্কিত খবর বা প্রতিবেদনের প্রতি নিজেদের মানসিক গ্লানি প্রকাশ করছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা যেন ‘বর্ণবাদী, নারীবিদ্বেষী ও অন্যান্য ধরনের ঘৃণা উদ্রেককারী ও ক্ষতিকর মন্তব্য সরিয়ে নেয়’। 

যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড এবং বাংলাদেশে নিখিল তালকুদার হত্যাকা-ের একটি আর্শ্চয মিল রয়েছে। দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রে দুজন পুলিশ অফিসার হাঁটু দিয়ে দুজনকে হত্যা করলেন। অফিসার শামীম কি মিনিয়াপোলিসের ডেরেক শওভিন কনেল্টের অপকর্মে উদ্বুদ্ধ হয়ে এমন একটি অপর্কম করতে পারলেন? নিখিল একজন সাধারণ কৃষক। তার অপরাধ তাস খেলা। ফ্লয়েডের অপরাধ ছিল তিনি একটি জাল নোট দোকানিকে দিয়েছিলেন। বিনা অপরাধ বা সামান্য অপরাধে দুজন প্রাণ হারালেন। মিনিয়াপোলিসে ফ্লয়েড হত্যার পর পুলিশ প্রধান এই হত্যাকান্ডের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। অনেক শহরে পুলিশ হাঁটু গেড়ে আন্দোলনকারীদরে প্রতি সর্মথন ব্যক্ত করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশের নির্মম নির্যাতনের ফলে প্রাণ হারানোর দায় কে নেবে?

এমন হেটক্রাইম রাষ্ট্র ও সমাজে যত বেশি ছড়াবে, তত বেশি নানামুখী অপরাধপ্রবণতা বাড়বে। অপরাধপ্রবণতা যে হারে বেড়েছে বাংলাদেশে বিভিন্ন ঘটনার ভেতর দিয়ে তা বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে শ্রেণিবৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। দেশের অর্থনীতি আজ করোনায় বিপর্যস্ত। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্র্মী ছাঁটাই চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেউ কেউ ঠিকমতো তার কাজের মজুরি পাচ্ছেন না। কেউ কেউ পাচ্ছেন অর্ধেকটা। অদূর ভবিষ্যতে ভূমিদাসরা নিষ্ঠুরভাবে শোষিত হবেন সে আশঙ্কা রয়েছে। তাতে করে শ্রেণিবৈষম্য চরম আকারে ধারণ করবে। তীব্র দ্বন্দ্বমুখর সংগ্রাম-সংঘাত সুস্পষ্ট হবে। এতে করে সমাজের ভেতরে চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, নারী নিপীড়ন-নির্যাতনসহ নানারকম সন্ত্রাসী কর্মকা- আরও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও ব্যাপক আকারে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটবে। ঘৃণা বা বিদ্বেষ সমাজে স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দেখা দেবে।

‘এক টাকায় আহার’ কর্মসূচি শুরু করে বিদ্যানন্দ বেশ সাড়া ফেলেছে সমাজে। পথশিশুদের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছে বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবীরা। এই বাজারে গরিবদের এক টাকায় খাবার তুলে দিচ্ছে তা কল্পনাই করা যায় না আমাদের দেশে। তাদের অন্যান্য কর্মসূচিও বেশ প্রশংসিত হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী কাজের কারণে বিদ্যানন্দের পরিচিতি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কিছু ব্যক্তি সামাজিক গণমাধ্যমে ‘বিদ্যানন্দ’ নাম ও তার প্রধান কিশোর কুমার দাশের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক মন্তব্য করে। ফলে কিশোর কুমার দাশ বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে যেতে চেয়েছিলেন। সামাজিক গণমাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মন্তব্য দেওয়া, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, উসকানিমূলক লেখা প্রকাশিত হয়ে থাকে। দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার অভাবে নাগরিকরা একে অপরের নামে মিথ্যাচার করছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ করছে। এসব দেখে বোঝা যায় বাংলাদেশেও জাতিগোষ্ঠীগত বিদ্বেষ, ঘৃণাবোধ গভীরভাবে বিদ্যমান। বিদ্বেষ হামলা বা হেটক্রাইম জাতীয় প্রত্যেক সন্ত্রাসী কর্মকা-ের পেছনে সুগভীরভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থসহ ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত অসহিষ্ণুতার প্রভাব থাকে। ব্যক্তি ও সমষ্টির নিজস্ব ঘৃণা ও ঘৃণ্য কৌশলকে সমষ্টির আবেগে মুড়িয়ে সন্ত্রাসী উন্মাদনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বহু উদাহরণ রয়েছে। এমন উদাহরণ যেটা এখন বাংলাদেশে ঘটছে। সমাজে ব্যাপকহারে গণপ্রহার, গণপিটুনি, আত্মহত্যা, পারিবারিক সহিংসতা ক্রমশ বাড়ছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের জবাবদিহি নির্বাসনে গেলেই এ রকম অবস্থা হয়। রাষ্ট্রের নৃশংসতা সমাজের মধ্যে পুনরুৎপাদিত হয়।

অ্যামনেস্টির রিপোর্টে বলা হয়েছে, অন্যান্য অপরাধ থেকে হেটক্রাইমকে আলাদা করে ভাবা দরকার। প্রচলিত আইনে সাধারণত হেটক্রাইমকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। গণপ্রহার, গণহিংসাকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কখনো কখনো ভুয়া খবরও অসহিষ্ণুতার জন্ম দেয়। মানুষকে হিংসায় উন্মত্ত করে তোলে। তাই সরকারকে অপরাপর সব অপরাধের মতোই সব বিদ্বেষমূলক হামলা বা হেটক্রাইম দমনের দায়িত্ব নিতে হবে।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর