দেশে রাজনৈতিকভাবে অনেক কিছুই ঘটেছে, যার ভেতর অভ্যুত্থান এবং যুদ্ধও বাদ নেই। এসব ঘটনার বাইরের রূপটা ছিল রাজনৈতিক, কিন্তু ভেতরের উপাদান ছিল সামাজিক। সামাজিক বিক্ষোভ রাজনৈতিকভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এবং তাতে রাষ্ট্রীয় স্তরে পরিবর্তন যে ঘটেনি তাও তো নয়। ঘটেছে, কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে ক্রমাগত তীব্র ও সুসংগঠিত হয়ে সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, এমন ঘটনা আজও ঘটেনি। খুব বড় অর্জন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের সময় মনে হয়েছিল আমরা কেবল নতুন রাষ্ট্র নয়, একটি নতুন সমাজই গঠন করতে যাচ্ছি, যে সমাজ হবে গণতান্ত্রিক, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের বৈষম্য প্রধান সত্য হয়ে উঠবে না। পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা দূর হবে এবং সব মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সবার উন্নতির ভেতর নিজের উন্নতির ব্যবস্থা করতে পারবে। এক কথায় সমাজ হবে গণতান্ত্রিক এবং সেই গণতান্ত্রিক সমাজ একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে। চূড়ান্ত লক্ষ্য সেটাই, গণতান্ত্রিক অর্জনগুলোকে ধরে রাখবে এবং রক্তপ্রবাহের মতো সমাজের সর্বত্র তাদের প্রবহমান করে দেবে। সংস্কৃতিই পারে মানুষের চিন্তার জগতে এবং তার মানসিক গঠনেও পরিবর্তন আনতে এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের ঐক্য গড়ে তোলার আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়িত করতে। আমরা শিক্ষাকে জাতির মেরুদ- বলি, জাতির আসল মেরুদ- শিক্ষা নয়, সেটা হলো সংস্কৃতি। জাতীয়তাবাদ যদি আগ্রাসী না হয়ে গণতান্ত্রিক হতে চায় তাহলে তাকেও গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদে পরিণত হতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধে আমাদের জয় হলো। আমরা একটি নতুন রাষ্ট্র পেলাম। স্বাধীন বাংলাদেশেও তো আন্দোলন কম হলো না। কিন্তু সামাজিক বিপ্লবটা ঘটল না। বরং বিপরীত ঘটনা দেখা গেল। পুরনো সমাজের ব্যাধিগুলোই আরও প্রবল ও প্রকট হয়ে দাঁড়াল। কেন ঘটল তার ব্যাখ্যাটা আমরা জানি। সমাজের ভেতরে যারা সুবিধাভোগী ছিল তারাই বাধা দিল সামাজিক বিপ্লবকে। নিজেদের সুবিধা আরও বাড়িয়ে নিতে তারা অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠল এবং সে কাজ করতে গিয়ে স্বভাবতই জনগণের শোষণ ও বঞ্চনাকে দুঃসহ করে তুলতে থাকল।
তারা এমনকি মানুষের দারিদ্র্যকেও বিক্রি করা শুরু করে দিল। জনগণের দারিদ্র্য দেখিয়ে তারা বিদেশ থেকে ঋণ ও সাহায্য সংগ্রহ করল এবং যতটা পারা যায় তা আত্মসাৎ করতে থাকল। এলো এনজিওরা। যাদের উদ্দেশ্য সমাজ-পরিবর্তন নয়, উদ্দেশ্য বরং সমাজের কিছু বেদনাকে প্রশমিত করে, বিক্ষোভ যাতে বিস্ফোরণের আকার ধারণ না করে সেটা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সমাজ বিপ্লবকে ঠেকানো।
দেশে তিন ধরনের শিক্ষা যে ঐক্য সৃষ্টি না করে উল্টো সমাজে বিদ্যমান শ্রেণি বিভাজনকেই আরও গভীর করে তুলছে, এটা আমরা বলছি; কিন্তু এই ঘটনা যে অত্যন্ত স্বাভাবিক সেটাও কিন্তু বুঝতে হবে। সুবিধাভোগীরাই বিভাজনের এই কাজটা করছে। তাদের সন্তানরা সর্বোৎকৃষ্ট ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিত হয়ে নিজেদের সুবিধাগুলোকে অধিকতর সুসংহত করবে, দরিদ্র্যরা মাদ্রাসায় গিয়ে আরও দরিদ্র হবে, আর মধ্যবিত্তরা ইংরেজি মাধ্যমের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে হা-হুতাশ করে সময় কাটাবে, এটাই তারা চাইছে এবং সেই মতোই ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিক্ষিপ্ত ও বিভ্রান্ত মানুষ এখন বিশ্বের নাগরিক হতে গিয়ে ক্রমাগত গ্রাম্য হয়ে পড়ছে। আজ তার চিন্তায় নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের বাইরে কোনো কিছু প্রবেশের পথ পায় না; ক্ষুদ্র যে বৃহত্তেরই অংশ এবং বৃহৎকে না বদলালে ক্ষুদ্র যে বদলাবে না সেটা সে বুঝতে চায় না।
প্রশ্ন হলো, সমাজ কি তাহলে এ রকমই থাকবে, বদলাবে না? না, এ রকম থাকবে না; নিশ্চয়ই বদলাবে, হয় আরও খারাপ হবে নয়তো ভালো হবে। সেটা নির্ভর করছে কাদের ওপর? অবশ্যই তাদের ওপর যারা বোঝে যে সমাজে পরিবর্তন চাই এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করতে প্রস্তুতি নেয়। এরা হচ্ছেন দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক মানুষ। কিন্তু তাদের জন্য এটা বোঝা আবশ্যক যে, সমাজ আজ যে পথে চলছে সেটা মোটেই অগ্রগতির নয়, পুরোপুরি অধোপতনের বটে। এই পথ পরিহার করে এগোতে হবে গণতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ার পথ ধরে। সমাজ রাষ্ট্রের চেয়ে বড়। সমাজ থেকেই রাষ্ট্রের উদ্ভব, উল্টোটা নয়। ভরসার জায়গাটা হচ্ছে দেশের জনমানুষ। তারা বিক্ষুব্ধ। পরিবর্তনের যথার্থ ডাক শুনতে পেলে যে সাড়া দেবে, যেমন সাড়া দিয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সমাজ-পরিবর্তনের এই ডাকটা জাতীয়তাবাদীরা দেবে না। দেবে গণতন্ত্রকামীরা। জাতীয়তাবাদীরা ইতিমধ্যে পুঁজিবাদে দীক্ষিত হয়ে গেছে, তাদের ওপর ভরসা করাটা বৃথা।
অন্ধকার যে আছে তা নিয়ে তো কোনো বিতর্ক নেই। অন্ধকার আগেও ছিল। কিন্তু আশা করা গিয়েছিল সে অন্ধকার কেটে যাবে; দেখা গেল কাটেনি। বরং কোথাও কোথাও গাঢ় হয়েছে। প্রশ্ন হলো, অন্ধকারের এই দুঃশাসন থেকে মুক্তির উপায়টা কী? অন্ধকারকে লাঠি মারলে সে পালায় না, ধমক দিলে ঘাবড়ায় না, তাকে দেখে দুঃখ প্রকাশ করলে সে আরও উৎফুল্ল হয়। অন্ধকারকে বিতাড়নের উপায় একটিই, সেটি হলো আলোর ব্যবস্থা করা। বলা যাবে যে এই আলোটা হলো জ্ঞানের। কিন্তু কোন ধরনের জ্ঞান চাই আমরা। এমনও তো জ্ঞান আছে, যা ছদ্মবেশী অন্ধকার বটে এবং তার প্রভাবে অন্ধকার কমবে কী, বরং আরও বৃদ্ধি পায়। এমনকি শুদ্ধ তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানেও অন্ধকার কমে না, যদি না তাকে প্রয়োগ করা যায়। এটা তো দেখাই যায় যে, তাত্ত্বিকরা তর্ক করেন, শ্রমিকরা শ্রম দেন এবং এই দুয়ের মধ্যে মিলন ঘটে না। মিলন না ঘটার প্রধান কারণ হচ্ছে শ্রেণিবিভাজন। এই শ্রেণিবিভাজন দূর না করলে তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রযুক্ত হবে না। শ্রেণিবিভাজন থাকার দরুন আমরা ঐক্য গড়তে পারছি না, কেবল তত্ত্বও প্রয়োগ যে দূরে থাকছে পরস্পরের তা নয়, মানুষে মানুষেও দূরত্ব রয়ে গেছে। বিচ্ছিন্নতাই প্রধান সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিছিন্নতার দরুন সমষ্টিগত শক্তি বাড়ছে না, বরং কমছে। মিলনের একটি ক্ষেত্র হতে পারে সংস্কৃতি। বস্তুত সংস্কৃতিই হচ্ছে মিলবার এবং মেলাবার জন্য সবচেয়ে প্রশস্ত ক্ষেত্র।
তার আগে ঠিক করতে হবে। আমরা কোন ধরনের সংস্কৃতি চাই সেই ব্যাপারটা। যদি খুব সহজ করে বলতে হয় তাহলে কথাটা দাঁড়াবে এ রকমের যে, আমরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চাই। আর গণতন্ত্র বলতে আমরা কেবল ভোটাভুটি ও নির্বাচন বুঝি না, বুঝি সেই রকমের একটি ব্যবস্থা যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার ও সুযোগের দিক থেকে ব্যবধান থাকবে না; ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে এবং সব পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। ব্যাপারটা কেবল যে রাজনৈতিক তা নয়, সামাজিকও এবং রাজনৈতিকও। সামাজিকভাবে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও তার বিকাশের জন্য প্রয়োজন হলো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উপাদানগুলোর দিকে একবার তাকানো যাক। প্রথম উপাদান হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকে আমরা যে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম তার কারণ ছিল সে রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিকতা, যেটি প্রকাশ পেয়েছিল ধর্মকে রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার ভেতর দিয়ে। সেই ধর্মীয় রাষ্ট্র ও তার ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে সবেগে প্রত্যাখ্যান করে আমরা একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। ধর্মনিরপেক্ষ হলেই যে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়ে যাবে তা নয়; তবে ধর্মনিরপেক্ষ না হলে রাষ্ট্রের পক্ষে গণতান্ত্রিক হওয়া একবারেই অসম্ভব। ধর্মনিরপেক্ষতা হলো প্রথম পদক্ষেপ, যেটি না নিয়ে গণতন্ত্রের পক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নেওয়া যাবে না, যায় না। বর্তমান বিশ্বে এই সত্যের ভূরি ভূরি প্রমাণ বিদ্যমান। ধর্মনিরপেক্ষতার ভেতর দুটি উপাদান রয়েছে, একটি দার্শনিক, অন্যটি রাজনৈতিক। দার্শনিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে ইহজাগতিক। এর মূল কথাটা হচ্ছে পরকালে কী ঘটবে তা নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার চেয়ে ইহলোককে গুরুত্ব দেওয়া শ্রেয়। গুরুত্ব দিলে মানুষের মুক্তি ঘটবে এবং মানুষ বড় হয়ে উঠবে। দ্বিতীয় উপাদানটি হলো এই যে, ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র এবং ধর্মকে পৃথক করতে চায়, এবং বলতে চায় যে ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচরণের ব্যাপার আর রাষ্ট্র হলো সমষ্টিগত প্রতিষ্ঠান, যার নিজস্ব কোনো ধর্ম নেই।
সংস্কৃতিকে গণতান্ত্রিক করার জন্য দরকার জীবনের সর্বক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার প্রচলন। চরিত্রগতভাবেই ভাষা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ; সে ধর্মীয় বিভাজন মানে না, যদিও সব ধর্মপুস্তক ভাষাতেই রচিত হয়েছে, সেক্ষেত্রে ভাষা ধর্মের মাধ্যম বটে; কিন্তু নিজে ধর্ম নয়। ভাষা কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাকেও ছাড়িয়ে যায়, কেননা ভাষা শ্রেণিবিভাজনকেও অতিক্রম করে চলে যায়। ভাষা কোনো শ্রেণির সম্পত্তি নয়, সে সর্বজনীন। শিক্ষাক্ষেত্রে যে তিন ধারা বিদ্যমান তার অবসান ঘটিয়ে একটি অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যে ব্যবস্থার মাধ্যম হবে মাতৃভাষা। শিক্ষার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের ভেতর বিদ্যমান শ্রেণিবিভাজনকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করতে দেওয়াটা কেবল যে অনৈক্য বৃদ্ধি করছে তা নয়, শিক্ষার নামে একটি আত্মঘাতী ও সংঘর্ষপ্রবণ ভবিষ্যতের দিকে আমাদের ঠেলে দিচ্ছে।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়